গৌরনদীতে গড়ে উঠতে পারে পর্যটন কেন্দ্র

আপডেট : ০৯ জুন ২০১৩, ২০:৩৪
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার নলচিড়া গ্রামের সৈয়দ আলাউদ্দিন ওরফে মনু মিয়ার বাড়ীতে এখনো কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে ইংরেজ বিরোধী পলাশীর যুদ্ধের কামান ও দুর্গের ধ্বংসলীলা। তেমনি কালের সাক্ষী হয়ে আধুনা গ্রামে দাঁড়িয়ে রয়েছে সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলের কৃতিমান পুরুষ ছবি খাঁর হুজরা ও আগৈলঝাড়ার উত্তর শিহিপাশা গ্রামের শতীদাহ মঠ। যুগ যুগ পেরিয়ে গেলেও এসব ঐতিহাসিক নির্দশন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এখনো নেয়া হয়নি কোন উদ্যোগ। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্রমেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে কালের সাক্ষী এসব প্রাচীন ঐতিহাসিক নির্দশনগুলো। রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এসব ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো হতে পারে একটি পর্যটন কেন্দ্র। ইতিহাস-ঐতিহ্যসমৃদ্ধ গৌরনদীকে নিয়ে কবি সিকদার রেজাউল করিম “বৃহতি গৌরনদী” নামে একটি বই লিখেছেন। কবি সিকদার রেজাউল করিমের দেয়া তথ্য ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ১৬’শ খ্রীষ্টাব্দে সম্রাট আকবরের সাশনামল থেকে পরবর্তী প্রায় ৬৬ বছর তত্কালীন বাকলার (বর্তমান বরিশাল)’এ মগ সমপ্রদায় যুদ্ধ করেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। কথিত মতে তত্কালীন সময়ে মগের জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতনসহ ত্রাসের রাজত্বে বাকলার আকাশে কোন পাখি পর্যন্ত উড়েনি। মোঘল সেনারাও অসংখ্যবার মগের সাথে যুদ্ধ করে পরাজিত হয়। সম্রাট আকবরের পরবর্তী সময় সম্রাট জাহাঙ্গীরের সাশনামলে কিংকর ভূঁইয়ার পুত্র মদন মোহন ও ছবি খাঁকে বাকলার ফৌজদার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ছবি খাঁ বাকলার ফৌজদার হিসেবে নিযুক্ত হবার পর নিজের নেতৃত্বে নিজেই গড়ে তোলেন বিশাল সেনা দল। এক পর্যায়ে তিনি (ছবি খাঁ) মগের বিরুদ্ধে শেষবারের মতো যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ছবি খাঁর সেই যুদ্ধে বাকলার থেকে মগদের বিতাড়িত হতে হয়। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে কৃতিমান পুরুষ বাকলায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করেন। যার প্রেক্ষিতে ছবি খাঁর নামানুসারে অসংখ্য রাস্তা, জাঙ্গাল, পুল, দিঘীসহ ঐতিহাসিক নির্দশ আজো রয়েছে বিদ্যমান। জানা গেছে, ছবি খাঁ শেষ বয়সে আধ্যাত্মিক সাধনা করার জন্য তত্কালীন জনমানবশূন্য বর্তমান আধুনা গ্রামে হুজরা (ইবাদতখানা) নির্মাণ করে সৃষ্টিকর্তার অপার ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। বর্তমানে হুজরাকে সামনে রেখে স্থানীয়রা একটি জামে মসজিদ নির্মাণ করেছেন। ওই মসজিদের ইমাম স্থানীয় আদেল উদ্দিন তালুকদার বলেন, কৃতিমান পুরুষ ছবি খাঁর হুজরাকে সামনে রেখে আমি মহান সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করছি। পলাশীর যুদ্ধের কামানের ধ্বংসলীলা : ১৭৫৭ সালে ইংরেজ বিরোধী পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা শহীদ হবার পর তার পরাজিত সৈন্যরা জমিদার সৈয়দ ইমাম উদ্দিনের পরিচালনাধীন সরিকলের দুর্গে আশ্রয় নেন। অন্য জমিদাররা ইংরেজদের সাথে আঁতাত করলেও তত্কালীন নাজিরপুর পরগনার (বর্তমান নলচিড়া) জমিদার সৈয়দ ইমাম উদ্দিন ইংরেজদের সাথে আঁতাত না করে তাদের (ইংরেজদের) বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এক পর্যায়ে সরিকল নদীতে ইমাম উদ্দিনের সৈন্যদের সাথে ইংরেজ সৈন্যদের যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে অনেক ইংরেজ সৈন্য নিহত হয়। পলাশীর যুদ্ধের পরেও মোগল নৌ-সেনাপতি উলফত্ গাজীর বংশধর জমিদার ইমাম উদ্দিন দীর্ঘ ২২ বছর নাজিরপুর পরগনার স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হন। ১৭৭৯ সালে সরিকল নদীতে ইংরেজ সৈন্যদের সাথে জমিদারের সৈন্যদের ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে সরিকল দুর্গের পতনের পর ইংরেজ সৈন্যরা নলচিড়া মিয়াবাড়িতে আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। জমিদার সৈয়দ ইমাম উদ্দিনও পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। এক পর্যায়ে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেষ্টিং সৈয়দ ইমাম উদ্দিনকে বন্দী করতে সক্ষম হন। সৈয়দ ইমাম উদ্দিনের সেই যুদ্ধের কামানের ধ্বংসলীলা নলচিড়া মিয়া বাড়ীর সম্মুখে আজো কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। সতীদাহ মঠ : হিন্দু ধর্মের বেদ অনুসারে হাজার-হাজার বছর ধরে সতীদাহ প্রথা (স্বামী মারা গেলে তার সাথে জিবিত স্ত্রীকে শ্মশানে পুড়িয়ে দেয়া) বিধান প্রচলিত ছিলো। এ প্রথার অবসান ঘটে ১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসনামলে রাজা রাম মোহন রায় ও ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধান বলে। সতীদাহ ঘটনার ঐতিহাসিক নিদর্শন আজো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বর্তমান আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের উত্তর শিহিপাশা গ্রামে। কবে কখন কোন সতী স্ত্রীকে স্বামীর সাথে ওই শ্মশানে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, তার কোন সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও স্থানীয় সোহরাব হোসেন মল্লিক জানান, ওই সম্পত্তির পূর্ব দলিল ও কাগজপত্র পর্যালোচনা করে এই বাড়িতে রুহিনী ঠাকুর নামের একজন বসবাস করতেন বলে পাওয়া যায়। তিনি আরো জানান, রুহিনী ঠাকুর অথবা তার পূর্ব পুরুষের কেউবা হয়তো সতীদাহ শ্মশানে কারুকার্য খচিত মঠটি নির্মাণ করেছেন। বর্তমানে সতীদাহ মঠসহ পুরো বাড়িটি সরদার সিদ্দিকুর রহমান নামের এক অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক দখল করে রেখেছেন। কারুকার্য খচিত মঠটি অযত্ন-অবহেলায় আজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, প্রায়ই দেশের দূর-দূরন্তসহ সুদূর ভারত থেকেও সতীদাহ মঠটি দেখার জন্য লোকজন যাওয়া-আসা করছেন। তারা আরো জানান, অতিসমপ্রতি দখলদার সতীদাহ মঠের আংশিক অংশ ভেঙ্গে ফেলেছেন। ইতিহাস-ঐতিহ্যসমৃদ্ধ বৃহতি গৌরনদীবাসী এসব ঐতিহাসিক নির্দশন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।