দাদন নামের অভিশাপ অথবা করণার যাঁতাকলে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে জেলেদের জীবন। নয়া কাবুলিওয়ালা নামে পরিচিত এ দাদন ব্যবসায়ীরা জেলেদের কাছে ভয়ংকর। মেঘনার হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ থেকে শুরু করে সাগরের তীরবর্তী পদ্মা স্লুইচ পর্যন্ত উপকূলের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে দাদন ব্যবসায়ীদের অসংখ্য আড়ত বা মোকাম। জেলেদের কাছে আড়তগুলো ফিশিংঘাট হিসেবে পরিচিত। বিদ্যুিবহীন দুর্গম চরে এ মত্স্য ঘাঁটিগুলোতে সন্ধ্যার পর জেনারেটর দিয়ে আলোকসজ্জা করা হয়। দূর থেকে মনে হবে একটি সাজানো ছোট্ট শহর। ঢাকা-বরিশাল নৌপথে রাত্রিকালীন লঞ্চে ভ্রমণের সময় হিজলা, মুলাদী, মেহেন্দীগঞ্জ এলাকা অতিক্রমকালে দেখা মেলে মেঘনার দুই তীরে দূরের এ বর্ণিল আলো। এই আলোর নিচেই অন্ধকার জগত্ এর বাসিন্দা হিসাবে নিরক্ষর মানুষগুলো খেটে মরছে। আলো-আঁঁধারীর দাদন নামের এ জুয়া খেলায় মেতে আছে কিছু বিত্তবান অর্থপিপাসু। গরীব দুঃখী জেলেরা অনন্তকাল ধরে তাদের দাদনদারদের লিপ্সা মিটাচ্ছে।
নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সাগর কিংবা নদীতে ইলিশ থাকে না। সাগরে কিছু রূপচাদা ধরা পড়লেও নদী থাকে একেবারেই ফাঁকা। তখন জেলেপাড়াগুলোতে চলে দুর্দিন। এ সুযোগটি বেছে নেয় দাদন ব্যবসায়ী মহাজনরা। চড়া সুদের ঋণের করুণার কাছে জেলেরা হেরে যায়। অনেক সময় মাছের দরটি তখনই বেঁধে দেয়া হয়। স্ত্রী-কন্যার মুখে দু’মুঠো অন্ন তুলে দিতে নিরুপায় জেলেরা এ ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে অপেক্ষা করে মৌসুমের। জুন মাসের শুরুতে বর্ষা ও জোয়ারের পানি দেখে আশায় বুক বাঁধে জেলে পরিবারগুলো। অনেকের ৮/১০ বছরের শিশু পুত্র দিন-রাত, ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে শামিল হয়। জালের ফাঁকে ইলিশ আটকালেও ভাগ্যের ফাঁক দিয়ে সেই ইলিশ চলে যায় মহাজনের মোকামে। ইলিশ ভর্তি জেলেনৌকা ঘাটে ভিড়ানোর সাথে সাথে বাজপাখির মত ছোঁ মারে মহাজনের লোকেরা। দরদাম ঠিক হয় মহাজনের ইচ্ছানুযায়ী। প্রতিবাদের শক্তি নেই জেলেদের। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখে। দাদনের হিসাব চেয়ে কোন জেলে প্রতিবাদ করলে মহাজনরা শহরের কর্তাব্যক্তিদের নিয়ে এসে অবৈধ কারেন্ট জাল ব্যবহারের অভিযোগে জেলেদের শেষ সম্বল মাছ ধরার জালটাও পুড়িয়ে দেয়। প্রভাবশালী দাদন ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট মোকাম থেকে জেলেদের দাদন নিতে বাধ্য করে। এদের অবাধ্য হলে টিকতে পারে না জেলেরা। জাল পোড়ানো থেকে শুরু করে জাল ফেলা পর্যন্ত বাঁধ সাধেন এরা। মহাজনের পোষ্য অস্ত্রধারী ক্যাডাররা পাহারা বসায় সমুদ্র সীমানা থেকে শুরু করে মেঘনা-তেঁতুলিয়া অতিক্রম করে কালাবদর নদী পর্যন্ত। কে কোথায় জাল ফেলবে তা নির্ধারণ করে ঐ জল সন্ত্রাসীরা। রাতের আঁঁধারে ডাকাত সেজে মাছ, জাল, ইঞ্জিন লুট করার রেকর্ড এদের অনেক। মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কালাবদর, আড়িয়াল খা নদী থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত দাদন ব্যবসার পসরা বসিয়েছেন চাঁদপুর ও মুন্সীগঞ্জের ব্যবসায়ীরা। মুন্সীগঞ্জের দাদন ব্যবসায়ী সাধু কর্মকার এবার দাদন দিয়েছেন ২৫ লাখ টাকা। ৩০ লাখ টাকা দাদন দিয়েছেন চাঁদপুরের জহির খান। মৌসুম শুরুর আগেই তারা ছুটছেন মেঘনার তীরবর্তী জেলেপল্লীকে ঘিরে গড়ে উঠা পাইকার-আড়ত্দারদের কাছে। গত কয়েক বছর ধরে তেমন মাছ ধরা পড়ছে না। তাই জেলেরা দেনা পরিশোধে প্রতি বছরই ছলচাতুরি করে বলে দু’ দাদন ব্যবসায়ী একই বক্তব্য দিয়ে বলেন তবু আশায় থাকি। তবে ঝড়ের কবলে পড়ে জেলেদের প্রাণহানি, নৌকা-ট্রলারসহ জাল ডুবে যাওয়া কিংবা জলদস্যুদের কবলে পড়ার মত বড় দুর্ঘটনা ঘটলে লগ্নিকৃত টাকার আশা ছেড়ে দেন। মুন্সীগঞ্জ বা চাঁদপুরের এ সব দাদন ব্যবসায়ীর এ জেলায় নিজস্ব কোন আড়ত নেই। হিজলা -মেহেন্দীগঞ্জ থেকে শুরু করে ভোলার বঙ্গেরচর ও ঢালচর হয়ে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে তিনি দাদন দেন। দাদনের বিনিময়ে সরাসরি মাছ চলে যায় তাদের চাঁদপুর অথবা মুন্সীগঞ্জের আড়তে।
