ধীবর জীবন

জীবনভর একই আবর্তে

আপডেট : ০৯ জুন ২০১৩, ২০:৩৬
উপকূলভাগের ইলিশ শিকারের সাথে যুক্ত পরিবারের মানুষগুলো জন্মের পরই সাগরের সাথে নিবিড় সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। সাগর এদের বাঁচায় আবার সাগরই এদের জীবন কেড়ে নেয়। এদের কাছে জলই জীবন। জলই মরণ। ঝড়-বাদল উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কনকনে শীতরাত কিংবা গ্রীষ্মের প্রখর রোদ আর সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে সংগ্রাম করে এদের জীবন চলে। যে জলে ইলিশ আহরণ করে তারা জীবন ধারণ করে সে জলেই তারা প্রাণ হারায়। প্রিয়জনরা তার লাশটি পর্যন্ত খুঁজে পায় না। যে মাছ শিকার করে তাদের জীবন চলে সে মাছের পেটেই চলে যায় তাদের লাশ। জেলেদের জীবন সাগরে ঢেউয়ের সাথে ঘুরপাক খেলেও এদের নাটাই থাকে মতিঝিলের এসি রুমে। সেখানেই জেলেদের নিয়ে নীতিমালা তৈরি হয়। যার বাস্তবতা এসে পৌঁছায় না সাগর পাড়ের মানুষের কাছে। মহাজনের কাছে এরা অসহায়-জিম্মি-পরাধীন। এদের ভাগ্যের চাকা বদলায় না। ভোজনরসিক মানুষের রসনা তৃপ্তির বাসনা পূরণের জন্য মাছের সংস্থান করতে গিয়ে একদিন নিজেরাই মাছের পেটে চলে যায়। চাল-ডাল সঙ্গে নিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকা কিংবা ট্রলারে চেপে এরা হারিয়ে যায় গভীর বঙ্গোপসাগরে। বেতারবার্তায় যখন ঝড়ের আভাস পায় তখন আর কূলে ফেরার সুযোগ পায় না। লাশ হতে হয় তাদের। দাফনের ভাগ্যও জোটে না। সাগরের মত্স্যরাজি সেই লাশ ছিন্নভিন্ন করে খায়। তাদের স্ত্রী-সন্তান ও পরিবার-পরিজন তীরে বসে অধীর প্রতীক্ষায় দিন কাটায়। সাগরের বিশাল ঢেউয়ের শব্দে চাপা পড়ে যায় তাদের কান্না। প্রিয়জন হারানোর সুখ ভুলে পরবর্তী প্রজন্ম আবার নিজেরাই এ পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয় অভাবের তাড়নায়। পেশার পরিবর্তন হয় না। ভাগ্যও বদলায় না। মরে গেলে সাগর বা নদীর তীরে তাদের সমাধি হয়। নদীভাঙ্গনে হারিয়ে যায় সেই সমাধি। বাপ-দাদার কবর জিয়ারতের সুযোগটি পর্যন্ত পায় না জেলেরা। স্বাধীনতার পর দক্ষিণাঞ্চলের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। অনেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু অসহায় জেলেদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। জেলেদের আহরণ করা মাছ বিদেশে রপ্তানি করে যেসব ব্যবসায়ী কোটিপতি হয়েছেন তারাও এদের ব্যাপারে উদাসীন। ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ কিংবা বরিশাল থেকে পাথরঘাটায় গিয়ে দাদনের ব্যবসা করেন এ রকম ব্যবসায়ী রয়েছেন অনেক। তারা একের পর এক বরফকল তৈরি করে ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন। কিন্তু জেলেপল্লীর বাসিন্দাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরছে উল্টো পথে। সচ্ছল হওয়ার পরিবর্তে বাড়ছে দারিদ্র্য। পুলিশ ও বনকর্মীদের হয়রানি সমুদ্র থেকে মাছ ধরে বরিশালের মোকামে নিয়ে আসার পথে নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ, বন বিভাগের কর্মী ও চাঁদাবাজদের হয়রানির শিকার হয় জেলেরা। মোড়লগঞ্জ, মংলা, নলি, শরণখোলা, পাথরঘাটা, নেয়ামতি, চর মোন্তাজ , রায়ন্দাসহ ঢালচর, পাতিলা ও কুকুরী-মুকুরীসহ বেশকিছু পয়েন্টে বণরক্ষী অথবা পুলিশকে প্রতি ট্রিপে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিতে হয়। যে অঞ্চলে জেলেরা মাছ ধরতে যায় সে অঞ্চলের বন বিভাগ থেকে পাস সংগ্রহ করার নিয়ম রয়েছে। সরকারি নিয়মানুসারে এক সপ্তাহ মাছ ধরা বাবদ বন বিভাগের সীমানায় মাছ ধরতে ২৫০ টাকা ও প্রতি মণ মাছের জন্য একশ টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু এর বাইরেও উেকাচ দেয়া এবং কখনো কখনো পুলিশ কিংবা বন কর্মকর্তার পছন্দের মাছটি তাদের হাতে তুলে দিতে হয়। সব হারালেও কুসংস্কার হারায়নি বরিশাল অঞ্চলের জেলেদের অতীত ঐতিহ্য ইলিশ, জাল ও নৌকা বলতে গেলে সব হারিয়ে গেছে। কিন্তু কুসংস্কার হারায়নি। তারা এখনো বিশ্বাস করে জালে কিংবা নৌকায় জুতা নিয়ে পাড়ালে সে সাবারে (জালে) মাছ ধরা পড়ে না। ভরা মৌসুমে মাছ ধরা না পড়লে তারা মিলাদ দেয়, সাগরে দুধ ছিটায়। কখনো বা সোনা-রূপার পানি ঢেলে দেয়া হয় জলে। সাগর সঙ্গমে দুর্গম নির্বাসন ১০ বছরের শিশু শাহীন নিয়মিত গভীর সমুদ্রে যায় ইলিশ শিকারে। ছিঁড়ে যাওয়া শাইন জাল জোড়াতালি দেয়া, সাগরে জাল ফেলা, জাল টানা সবকিছুতে তামিল নিচ্ছে সে। কোন শখের বসে নয়, অভাব-অনটন তাকে উথাল-পাথাল ঢেউর মধ্যে অন্য জেলেদের সাথে সাগরে যেতে বাধ্য করছে। শাহীনের বাবা আলাউদ্দিন এক সময় গভীর সমুদ্রে ইলিশ শিকারে যেত। তিন বছর পূর্বে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে সে মারা যায়। পরিবারে মা তাসলিমাসহ ৫ ভাই ও ১ বোন রয়েছে। তাসলিমা বেগম অন্যের বাড়িতে কাজ করে। একেবারেই নিঃস্ব তারা। স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বলতে জেলেপাড়ার বাধের ঢালে একটি ছোট্ট ঝুপড়ি ঘর। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবা মারা যাওয়ার পর মা পরিবার চালাতে হিমশিম খায়। দু’মুঠো ভাতের জন্য শাহীন ট্রলারে ওঠে। কোন মজুরি নয়। পেটেভাতে কাজ করছে সে। আর শিক্ষা নিচ্ছে ইলিশ ধরা, জাল ফেলা, জাল তোলা ও জোড়াতালি দেয়ার কলাকৌশল। শাইন, চাপিলা, চান্দি, টানবেড়, জগেবড়সহ সকল জালের নাম তার মুখস্থ। যে বয়সে তার স্কুলে যাওয়ার জন্য বইখাতা হাতে থাকার কথা সে বয়সে তার হাতে তুলে দেয়া হয়েছে মাছ ধরার জাল আর জাল সারার কলাকৌশলের বিভিন্ন যন্ত্র। সাঁতার জানে কিনা জানতে চাইলে রমিজের চটপটে উত্তর ‘মুই হাতরাইতে পাড়ি’। মাত্র তিন বছরে সে এখন পাকা মত্স্য শিকারী। অপর জেলেদের সাথে পাল্লা দিয়েই বৈঠা বাওয়া, জাল ফেলাসহ সকল কাজই রপ্ত করে ফেলেছে। কয়েক মাস আগে একবার সে ট্রলার থেকে সাগরে পড়ে গিয়েছিল। সে অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে জানায়, সাঁতরে অনেকক্ষণ ভেসে থাকার পর সহকর্মী জেলেরা তাকে উদ্ধার করে। শাহীন বললো ‘পয়লা-পয়লা ডর হরতো’ ‘ এহন আর ডর হরে না’। শুধু শাহীন একা নয়, উপকূলের জেলেপল্লীতে শত শত শাহীন এভাবে প্রতিদিন জাল সেলাই করে সাগরে ছুটে চলে। সেখানেই যেন তাদের আবাসস্থল। উপার্জনের উত্তম স্থান।