বাজেটের পর পুঁজিবাজারে ধস লেনদেন কমেছে ৩২ শতাংশ

আপডেট : ০৯ জুন ২০১৩, ২২:৫৯
আগামী ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে প্রত্যাশিত পদক্ষেপ না থাকায় বাজেট ঘোষণার পর গতকাল রবিবার (প্রথম কার্যদিবস) দেশের দুই শেয়ারবাজারেই বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। লেনদেন কমেছে প্রায় ৩২ শতাংশ। গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)-এর ব্রড ইনডেক্স (ডিএসইএক্স) আগের কার্যদিবসের তুলনায় ১৪৫ পয়েন্ট কমে ৩ হাজার ৮৮২ পয়েন্টে নেমে এসেছে। সাধারণ মূল্যসূচক ১৬৭ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১৩৩ পয়েন্টে। অর্থাত্ বাজেটের পর প্রথমদিনের লেনদেনেই সূচক কমেছে ৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ। গতকাল ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ৪৩১ কোটি ৭৪ লাখ ২৬ হাজার টাকার শেয়ার। যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় প্রায় ২০০ কোটি টাকা কম। লেনদেনকৃত ২৮১টি কোম্পানির মধ্যে দাম বেড়েছে ১৯টির, কমেছে ২৫৬টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৬টির। সিএসই’র তথ্যে দেখা গেছে, গতকাল সিএসই’র সার্বিক মূল্যসূচক কমেছে ৪৪৩ পয়েন্ট। বড় ধরনের দরপতনের প্রতিবাদে ডিএসই কার্যালয়ের সামনে বিনিয়োগকারীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। বিকাল তিনটার দিকে বিক্ষোভকারীরা বাজার উন্নয়নের দাবিতে বিভিন্ন শ্লোগান দেয়। আইডিএলসি’র দৈনন্দিন বাজার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাজেটে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী পদক্ষেপ না থাকায় তারা শেয়ার ধরে রাখতে চাইছে না। ফলে লেনদেন শুরু হওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যেই সূচক ৯০ পয়েন্ট কমে যায়। তবে গত কয়েকদিন ধরে সূচক বাড়ায় মুনাফা নেয়ার প্রবণতাও রয়েছে। বাজেটের পর শেয়ারবাজারে বড় দরপতনের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে সম্পদ ব্যবস্থাপনামূলক একটি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এবারের বাজেট নিয়ে বিশেষজ্ঞরা অনেক সমালোচনা করছেন। বিনিয়োগকারীদের অনেকেই একে ফানুসের মতো মনে করছেন। ফলে বাজেটের যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা বিনিয়োগকারীদেরকে আশ্বস্ত করতে পারছে না। তিনি আরো বলেন, চলতি অর্থবছরে পুঁজিবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগের যে সুযোগ ছিল আগামী অর্থবছরে তা অব্যাহত না রেখে শুধু আবাসন খাতে এ সুযোগ দেয়া হয়েছে। শেয়ারবাজার স্থিতিশীলতায় ৫ হাজার কোটি টাকার দাবির ব্যাপারেও অর্থমন্ত্রী কোনো আশাবাদ ব্যক্ত করেননি। অথচ ডিমিউচুয়ালাইজেশন (স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনাকে মালিকানা থেকে পৃথকীকরণ) হলে বাজার স্থিতিশীল হবে বলে অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন। যা পুরোপুরি সঠিক নয়। তাছাড়া গত আড়াই বছর ধরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে আস্থার সঙ্কট রয়েছে তা নিরসনে অর্থমন্ত্রী তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিদ্যমান অনাস্থা বেড়েছে। ফলে শেয়ারবাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ডিমিউচুয়ালাইজেশন হলেও বাজার স্থিতিশীল না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ডিমিউচুয়ালাইজেশনের মাধ্যমে স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা ও মালিকানা পৃথক হবে। তখন এটি একটি কোম্পানিতে পরিণত হবে। এর মাধ্যমে স্টক এক্সচেঞ্জের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং তা আন্তর্জাতিক মানের হবে। কিন্তু শেয়ারবাজারের কারসাজি বন্ধ ও স্থিতিশীলতা এবং লেনদেন ও সূচকের উপর এর তেমন কোনো প্রভাব নেই। এ কারণে বিশ্বব্যাপী ডিমিউচুয়ালাইজেশন হওয়ার পরও ধস হচ্ছে। বাজেট পুঁজিবাজার বান্ধব:ডিএসই সভাপতি এদিকে গতকাল ডিএসই কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএসই সভাপতি রকিবুর রহমান বলেন, বাজেট পুঁজিবাজার বান্ধব। তাই বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। বাজেটের পর প্রথম কার্যদিবসেই বড় ধরনের দরপতনের হলেও রাজনৈতিক কারণে বাজেটকে পুঁজিবাজার বান্ধব বলা হচ্ছে কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে রকিবুর বলেন, রাজনৈতিক কারণে কিছু বলা হয়নি। তবে কোনো একটি বিষয়ের কারণে বাজার বড় ধরনের প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়। তাই শুধু বাজেট নয়, পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতায় মুদ্রানীতিকেও পুঁজিবাজার বান্ধব করতে হবে। তিনি বলেন, দেশের পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও গতিশীলতার জন্য বাজেটে পুঁজিবাজারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী পুঁজিবাজারের জন্য যেসব প্রণোদনা দিয়েছেন, তা বাজার স্থিতিশীল করতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে। ডিএসই’র সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সময় রকিবুর রহমান বলেন, সরকার এ বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছে। যা পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে লভ্যাংশের (ডিভিডেন্ড) করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ সীমা অন্তত ২৫ হাজার টাকায় উন্নীত করার দাবি জানিয়ে ব্যাক্তিশ্রেণীর শেয়ার লেনদেন হতে অর্জিত আয় করমুক্ত রাখার বিধান অব্যাহত রাখার প্রস্তাবকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন ডিএসই সভাপতি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসারত বিদেশি কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে নিয়ে আসতে সরকারের পদক্ষেপ নেয়া দরকার। তাছাড়া টেলিকমিউনিকেশন খাতের কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনতে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর করের পার্থক্য বিদ্যমান ১০ শতাংশ অব্যাহত রাখা হলে কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে উত্সাহ পাবে। বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকের উপর চাপ কমাতে শেয়ারবাজার থেকে টাকা তোলার পরামর্শ দিয়ে রকিবুর রহমান বলেন, সরকার পদ্মা সেতু, উড়াল সেতু এবং বিভিন্ন অবকাঠামোসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছেড়ে টাকা তুলতে পারে। তবে এজন্য আগে বাজার স্থিতিশীল করতে হবে। প্রসঙ্গত, গত শনিবার সিএসই এক সংবাদ সম্মেলনে তাদের বাজেট প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। বাজেট মূল্যায়নে সিএসই জানিয়েছে, ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলেও সার্বিক বিচারে বাজেট গতানুগতিক। তাই পুঁজিবাজারে এর খুব বেশি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে না।