জামায়াতের ডাকা আজ সোমবারের হরতালের আগে গতকাল রবিবার রাজধানীর দারুস সালামে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বাড়িতে পর পর কয়েকটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তিনটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটলেও কেউ আহত হননি। তবে তথ্যমন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মীর আকরাম উদ্দীন আহম্মদ জানিয়েছেন, মন্ত্রীর বাসায় কমপক্ষে ৪টি শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। এগুলো বিস্ফোরিত হয়েছে। বোমা হামলায় তার বাসভবনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হননি। ঘটনার সময় মন্ত্রী বাসায় না থাকলেও তার স্ত্রীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা বাসায় ছিলেন।
বোমা হামলার খবর শুনে দ্রুত বাসায় ছুটে যান তথ্যমন্ত্রী। সবকিছু দেখার পর উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্যই জামায়াত-শিবির ও সামপ্রদায়িক জঙ্গিগোষ্ঠী এই বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবে আমার কোনো শত্রু নেই। আর তাই রাজনৈতিক বিষয়গুলো রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করা উচিত।
দারুস সালাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খলিলুর রহমান জানান, রবিবার দুপুর দেড়টার দিকে এই হামলার ঘটনা ঘটে। মন্ত্রীর বাসা লক্ষ্য করেই বোমাগুলো নিক্ষেপ করা হয়। তবে বিস্ফোরণে কেউ হতাহত হননি। কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে ওসি জানান। প্রসঙ্গত, এর আগে ১৮ দলীয় জোটের ডাকা হরতালের আগের দিন গত ২৮ মে রমনা এলাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির বাড়ির ভেতরে তিন’টি হাতবোমা বিস্ফোরিত হয়। তার কিছুদিন আগে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের বাসায়ও হাতবোমা নিক্ষেপ করা হয়। তবে সেখানে হাতবোমাগুলো বিস্ফোরিত হয়নি। সেখানে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর স্ত্রী আফরোজা হক রীনা জানিয়েছেন, তাদের বাসায় কমপক্ষে চারটি শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তথ্যমন্ত্রীর দারুস সালাম রোডের ইস্টার্ন হাউজিং-১ এর হাসনা হেনা নামক বাসায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী এই বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী আল আমিন জানান, দারুস সালাম টাওয়ার সংলগ্ন তথ্যমন্ত্রীর বাসার সামনে দিয়ে দুই মোটরসাইকেল আরোহী কিছু দূর যাওয়ার পর আবার ঘুরে মেইন রোডের দিকে আসতে থাকেন। তারা দারুস সালাম রোডের ইস্টার্ন হাউজিং-১ এ তথ্যমন্ত্রীর বাসার সামনে এসে থামেন। এরপর মোটরসাইকেল আরোহীরা মন্ত্রীর বাসায় পর পর ৩টি শক্তিশালী হাতবোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দ্রুত পালিয়ে যান। বাসার দেয়ালে লেগে ২টি বিস্ফোরিত হয়। অন্যটি বাসার সামনে বিস্ফোরণ ঘটে।
ঘটনার পর গোয়েন্দা পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয় দল উপস্থিত হয়ে আলামত সংগ্রহ করে। ঘটনার পর দারুস সালাম থানা পুলিশ ওই এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করেছে। তবে এই ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, দুর্বৃত্তরা ৩টি হাতবোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। বাসার আশপাশের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি হাতবোমা বিস্ফোরণকারীদের খুঁজে বের করতে সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, আদালত অবমাননার দায়ে গতকাল জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান আযাদ ও ঢাকা মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল সেলিম উদ্দিনকে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর কয়েক ঘণ্টা পর সোমবার সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকে দলটি।
এদিকে হাসানুল হক ইনুর বাসায় বোমা হামলার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদ ও বাংলাদেশ যুব মৈত্রী। বিবৃতিতে এই সংগঠনের নেতারা বলেন, এই হামলা নিশ্চিতভাবে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিগোষ্ঠীর পরিকল্পিত আক্রমণ। হামলাকারীদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা।
তথ্যমন্ত্রীর বাসভবনে বোমা নিক্ষেপে ১৪ দলের নিন্দা ও প্রতিবাদ
ইত্তেফাক রিপোর্ট
জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বাসভবনে বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় ১৪ দল।
গতকাল রবিবার রাতে এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম এ নিন্দা জানিয়ে অনতিবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানান। নাসিম বলেন, মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যৌক্তিক পরিণতির দিকে অগ্রসর হওয়ায় বিএনপি-জামায়াত অপশক্তি মিলিতভাবে দেশ ও গণতন্ত্রকে বিপন্ন করার জন্য একের পর এক ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের কাপুরুষোচিত আক্রমণে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ১৪ দলের দপ্তর সমন্বয়ক মৃণাল কান্তি দাস স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে মোহাম্মদ নাসিম আরো বলেন, তারা যতই সন্ত্রাসী-নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করুক না কেন জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করতে আমাদের সুমহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী নরপিশাচদের বিচার সম্পন্ন ও রায় কার্যকর করতে সমগ্র বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
আরেক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বর্তমান মহাজোট সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর থেকেই বিএনপি-জামায়াত অশুভ জোট ধারাবাহিকভাবে দূরভিসন্ধিমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। অতি সমপ্রতিকালে তাদের উগ্র নাশকতামূলক তাণ্ডব মাত্রাতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই চিহ্নিত অপশক্তির নৃসংশতা থেকে সমাজের কোন শ্রেণী-পেশার মানুষই বাদ যাচ্ছে না। মূলত তারা দেশ, রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি সুপরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাস চালাচ্ছে। বিবৃতিতে তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, বিএনপি-জামায়াত অশুভ জোট রক্তের হোলিখেলায় যতই উগ্র নাশকতামূলক ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ড চালাক না কেন যুদ্ধাপরাধী ও দুর্নীতিবাজদের শাস্তি থেকে তারা বাঁচাতে পারবে না।
রংপুরে বিক্ষোভ সমাবেশ
রংপুর প্রতিনিধি জানান, তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপির বাসভবন লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল সন্ধ্যায় রংপুরে জাসদ-ছাত্রলীগের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়। রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে জাসদ কার্যালয় থেকে বের হয়ে বিক্ষোভ মিছিল নগরী প্রদক্ষিণ করে। পরে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জাসদ কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত রাঙ্গা, কেন্দ্রীয় নেতা এডিশনাল পিপি রফিকুল ইসলাম মুকুল, জাবিদ হোসেন স্বপন, সাহিদুল ইসলাম, সাব্বির আহমেদ, ফারুক আহমেদ, মাসুদ-উন-নবী মুন্না, ইউপি চেয়ারম্যান কুমারেশ রায়, ওসমান গনি শুভ্র, শফিকুল ইসলাম রাহেল, সঞ্জিত মোহন্ত প্রমুখ। হামলার জন্য জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করে জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানান।
