মু খো মু খি

মিউজিকের অবক্ষয়ের জন্য প্রযুক্তিকে দায়ী করে কোনো লাভ নেই

আপডেট : ১০ জুন ২০১৩, ১৯:৫৭
মেলো রক গানের ক্ষেত্রে অবসকিউর সবসময় অনবদ্য। নিজের ব্যান্ড ক্যারিয়ারের বাইরে সলো ক্যারিয়ারেও দারুণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন ব্যান্ড দলনেতা, কণ্ঠশিল্পী, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার সাঈদ হাসান টিপু। এ ছাড়া তিনি একাধারে হোম স্টুডিওভিত্তিক আধুনিক সাউন্ড তৈরি ও এর সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে অন্যতম পথিকৃত্। অবসকিউর ভক্তদের জন্য সুংসবাদ হলো দীর্ঘদিন পর আবারও তাদের নতুন অ্যালবাম তৈরি হচ্ছে। রিলিজ হতে যাচ্ছে নতুন গান। সেই খবরের ফিরিস্তিসহ তার সাথে আড্ডা দিয়েছেন তারিফ সৈয়দ কেমন আছেন? শ্রোতা বা আমাদের মনেও এক ধরনের প্রশ্ন ছিল যে, আপনি কোন অভিমানে হঠাত্ করে গান থেকে দূরে। সেই অভিমান কী ছিল? আবার এই ফেরা কী মনে করে? না, অভিমান সেই অর্থে নয়। আসলে সকলেরই একই অবস্থা। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা যে পরিমান নাজুক হয়েছিল, তাতে তো কারোরই কাজের কোনো অবস্থা ছিল না। কিন্তু এখন কি ফিরছে মনে করেন? ফিরবে। সেই আশাবাদ আছে। অনেক কাজ হচ্ছে। অধিকাংশই মানহীন কাজ হচ্ছে। কিন্তু এর মাঝে ভালো কাজও হচ্ছে। নতুন অবসকিউরে একেবারে প্রায় নতুন লাইন আপে কাজ করছেন দুয়েকজন ছাড়া। তাদের ভেতরে কাজের আগ্রহটা কেমন দেখছেন? প্রচণ্ড। বিশেষ করে আমি বলব একেবারে তরুণ যে তিনজনকে আমরা নিয়েছি, ওরা মিউজিকের প্রতি দারুণ আগ্রহী। সেকেন্ড গিটারিস্ট হিসেবে যেমন আছে শান্তনু নামের এক ছেলে। সদ্য তরুণ এই ছেলেটিকে একদিন প্র্যাকটিসে আসতে বলি। ও ঠিক সময়মতো এসে বলে প্র্যাকটিসে আসার টাকা ছিল না, তাই সে পায়ে হেঁটে এসেছে। এটা মিউজিকের প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা ছাড়া সম্ভব না। অন্যরাও খুব আন্তরিক। এর প্রতিফলনটা আমাদের সামনের অ্যালবামে পাওয়া যাবে। কী টাইপের গান থাকছে ? আমরা যে টাইপের করি। তবে গানের ধরন ভাগ করলে দুইটি গানের প্যাটার্ন একেবারেই আলাদা মনে হবে। একটা ছোট এক্সপেরিমেন্ট করেছি। সেটা কী রকম? যেমন কিছুদিন আগে আমি সাউন্ডক্লাউডে (মিউজিক ওয়েবসাইট) একটি অন্য প্যাটার্নের গান আপলোড করেছিলাম। তা শুনে ফেসবুকে আমায় অনেকে কমেন্ট করেছে, এই সাউন্ড শুনলে মনে হয় অন্য অবসকিউর শুনছি। এ ছাড়া আসামের ভাষায় একটি ফোক গান আছে। কারণ আসামের ভাষা আর আমাদের ভাষা তো প্রায় একই রকম। যেহেতু আপনিও রিলিজের আগেই আপলোড করেছেন, নিজের গানের মন্তব্য শোনার জন্য। তো এই যে তরুণদল অনবরত নিজেদের গান আপলোড করছে। আপনার কি মনে হয় প্রযুক্তিই দায়ী এই অবক্ষয়ের কারণে? না, টোটাল সিস্টেমটা দায়ী। মিউজিকের অবক্ষয়ের জন্য প্রযুক্তিকে দায়ী করে কোনো লাভ নেই। এটা আমাদের মানসিকতা। দেখুন আমরা আজ লুপবেজড সাউন্ড তৈরি করছি। বাইরের দেশে কি করছে না, বিশ্বের প্রত্যেকটা দেশে করছে। কিন্তু তাই বলে ওরা কি অ্যাকুস্টিক বাদ্য ছেড়ে দিয়েছে। এখনও তো লন্ডনে ফিলহারমনিক অর্কেস্ট্রাতে রেকর্ড হচ্ছে। সাথে প্রযুক্তির সুবিধাটাও তারা যোগ করছে। অতদূরের কথা বাদ দিলাম। পাশের দেশ ভারতে দেখুন, এখনও যেকোনো গানে অর্কেস্ট্রা ব্যবহার হচ্ছে। আসলে এই বিষয়ে বলতে গেলে অনেক বড় একটা প্রসঙ্গ চলে আসবে। শুধু এটুকু বলি, আমরা তো এখন পর্যন্ত কোনো ইনস্টিটিউটের মুখ দেখলাম না। এটা এত সংগীতসমৃদ্ধ জাতি হিসেবে আমাদের সকলের ব্যর্থতা। যা করছি... নিজে নিজে দেখে... ইন্টারনেট টিউটরিয়াল দেখে। এতেই আমরা যে সাউন্ড বের করছি তা অবাক করার মতো। তাহলে বলছেন সাউন্ডের উন্নয়ন হয়েছে। আমি বলছি তরুণেরা কোনো রকম প্রশিক্ষণ ছাড়া যা ডেলিভার দিচ্ছে তা অবাক করার মতো। কিন্তু এটা পরিমিত না। দেখুন একসময় আমরা এসপি টু সাউন্ডে পুরো মাঠে শো করে এসেছি। সবাই মুগ্ধ হয়েছে। এখন ফ্লায়িং সাউন্ড, লাইনার ইত্যাদি নিয়ে মাঠে কনসার্টে বসলেও আমরা সন্তুষ্ট হতে পারছি না। কারণ প্রযুক্তি চলে এসেছে ঠিকই। কিন্তু যে সাউন্ডটা অপারেট করবে, সে তো টেকনিক্যালি দক্ষ হতে পারেনি। এর সাথে সাথে অডিয়েন্সের কানটাও আরও বেশি গতিতে ম্যাচিউরড হয়েছে। ফলে আমরা এগোতে পারছি না। এবার একটু ইন্ডাস্ট্রির দিকে চোখ ফেরানো যাক। এই যে অবক্ষয়, এর মূল কারণ কী বলে মনে করেন। অথবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমরা কবে বাংলা গানের রেভিনিউ পাওয়া শুরু করব? আবারও ওই মানসিকতার কথাই বলতে হবে। প্রথমত আমাদের কপিরাইটের আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। আপনি বলছেন আই টিউনস থেকে আপনি পয়সা পেতে চান। আমি নিজেও আমাদের বেশ কিছু গান আই টিউনসের জন্য দিয়েছি। তারা স্বাগ্রহেই নিয়ে গেছে। কিন্তু একই গান যখন পাইরেটেড আপনি পাবেন। তখন কেউই আর কিনবে না। প্রশ্ন আসে একটা সিডির দাম কত। দশটা গান আমরা ৫০ টাকাই দিচ্ছি। এই টাকা বিকেলের এক প্লেট চটপটির দাম। তারপরও আমরা নিজেরাই দেশের শিল্পীদের গান আপলোড করছি। এটা আমাদের মানসিকতার অবক্ষয়। সরকারিভাবেও বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না। আর এই যে প্রকাশকের কাছ থেকে শিল্পীরা এত দূরে সরে এসেছে একদিনে তো নয়। আমরা ঠকতে ঠকতে বিরক্ত হয়ে দূরে সরে এসেছি। আজ আমরা শ্রোতাদের স্রেফ ভালো গান দেওয়ার তাগিদে অ্যালবাম বের করছি। দীর্ঘদিন ধরে জি-সিরিজের সাথে সখ্য তাই তারা অ্যালবামটির যত্ন নেবে বলেছে। এ ছাড়া ব্যান্ড লাইনআপে লাইভ করব... দর্শকদের সামনে থাকব। কারণ টিভি লাইভ হলো দর্শকদের প্রধান যাচাইয়ের জায়গা। এখানে তো বেসুরো শিল্পীরা পাত্তা পাবে না। শেষ প্রশ্ন করি, এখনকার একটি প্রবণতা নিয়ে। ইদানীং ফিচারিংয়ের কোনো অভাব নেই। গতকালের শিল্পীরাও ফিচার করা শুরু করেছে। এ ছাড়া এখনকার অডিও বা ফিল্মের গানে নতুন প্রবণতা শুরু হয়েছে তা হলো এক গাদা মিউজিক ডিরেক্টর একসাথে বিভিন্ন টাইপের গান করানো একই অ্যালবামে বা একই ফিল্মে। এই প্রবণতা কেন, কী লাভ হচ্ছে এই নতুন কনসেপ্টে একটু বলবেন? এটা আসলে পয়সা বাঁচানোর জন্য। সস্তায় আমার জিনিসটা বের করার জন্য। কেউ হয়তো খুব বেশি পারিশ্রমিক নিচ্ছে, তাকে একটি গান করতে বলছে। আর যে ১০ হাজার বা তারও কমে কম্পোজিশন করছে এই দরের প্রত্যেককে বাকি গান দিয়ে দায় সারছে। এখন ভালো গানের ক্ষেত্রে এই কম্প্রোমাইজ করলে কী করে ভালো কাজ হবে বলুন!