বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকারা সরকারি নিয়মানুযায়ী মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস পান না। প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো ছুটি দিয়ে থাকে। আর ছুটিকালীন বেতন-ভাতাও সময়মতো পরিশোধ করতে গড়িমসি করে প্রতিষ্ঠানগুলো। নিয়মমাফিক ছুটি না পওয়ায় নারী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে বিরাজ করছে ক্ষোভ ও হতাশা। শিক্ষিকারা বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করার পরও আমরা মাতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছি। সরকারি সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের খেয়াল-খুশি মতো বেতন-ভাতা ছাড়াই নারীদের দায়সারা গোছের ছুটি দিচ্ছে।
শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাককে বলেন, শুরুতে মাতৃত্বকালীন ছুটি শুধু সরকারি পর্যায়ে ছয় মাস ছিল। আমরা গত নভেম্বরে সেটা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করেছি। যে সব প্রতিষ্ঠান তা মানছে না প্রয়োজনে মনিটরিংয়ের মাধ্যমে শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীসহ দেশের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে কর্তৃপক্ষ নিজেদের ইচ্ছামতো বিধিমালা তৈরি করে। কোন প্রতিবাদ না করেই সেই নিয়ম মেনে চলেন নারী শিক্ষকরা। ঢাকায় বেশকিছু স্বনামধন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে মাতৃত্বকালীন ছুটি মাত্র দেড় থেকে দুই মাস। অনেক ক্ষেত্রে তা বেতন ছাড়া। অথচ প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে— সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নারী শিক্ষকরাও মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস ভোগ করবে। একজন মহিলা শিক্ষক/কর্মচারী গর্ভবতী হওয়ার পর যে তারিখ হতে ছুটিতে যাওয়ার আবেদন করবেন, ওই তারিখ হতে ছয় মাসের ছুটি মঞ্জুর করতে হবে। এই ঘোষণার পর বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারী, বিশেষ করে যারা মা হতে ইচ্ছুক কিংবা মা হতে চলেছেন, তাদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর-এর মহাপরিচালক ফাতিমা খাতুন এ প্রসঙ্গে বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান সরকারি এই নির্দেশনা মানছে না অভিযোগ পেলে আমরা অবশ্যই সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হলে গভর্নিং বডির উপর চাপ সৃস্টি করতে পারবো। সেক্ষেত্রে স্কুলের অনুমোদনও বাতিল হতে পারে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় একেক প্রতিষ্ঠানে একেক নিয়মনীতি। জানা গেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেমিস্টার ভিত্তিতে কার্যক্রম চালায়। কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিস্টার চার মাসের এবং ক্ষেত্রবিশেষে কোথাও ছয় মাস। বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাতৃত্বকালীন ছুটি সাধারণত এক সেমিস্টারের অর্থাত্ চার মাসের। অনেক প্রতিষ্ঠানে একটি সেমিস্টারের মাঝামাঝিতে কর্তৃপক্ষ ছুটি মঞ্জুরে অনীহা দেখায় নানা যুক্তিতে। ফলে, সন্তান প্রসবের দিন যা-ই হোক সেমিস্টারের শুরুতে ওই নারীকে ছুটি নিতে হয়। সে ক্ষেত্রে সন্তান জন্মদানের এক-দুই মাসের মধ্যেই তাকে রেখে কাজে যোগদান করতে হয় মাকে। এ ধরনের ছুটি মায়ের বা নবজাতকের ক্ষেত্রে কোন কাজেই আসে না। আবার একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সব নারী শিক্ষক সমানভাবে মূল্যায়িত না হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক, ডিপার্টমেন্টে ব্যক্তিগত অবস্থান ও প্রভাব অনেক কিছুই নির্ভর করে ছুটি পাওয়ার ক্ষেত্রে। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগের সময় নারী শিক্ষকরা বেতনের পুরো টাকা এক সঙ্গে পান না। ছুটির সময় বেতনের অর্ধেক, আর বাকি অর্ধেক ছুটি ভোগ করে কাজে যোগদানের পর দেয়া হয়।
বিশ্বববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সচিব মো. খালেদ বলেন, আমরা এ বিষয়ে এখনো কোন ধরনের অভিযোগ পাইনি। তবে কোন কোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এই নিয়ম মানছে না, তা জানতে পারলে কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেইসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাবে।
