সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের যোগ্য নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে নূর ই ফরিদ নাসরিন একাডেমী। অনাথ ও দুস্থ ছেলেদের লালন-পালনের দায়িত্ব নেয়ার মহত্ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রয়াত নাসরিন করিম এর একটি স্বপ্ন হিসাবে কুমিল্লার দারোগা বাড়িতে এই স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়। তার মৃত্যুর পর ছেলে মিশাল করিম এবং স্বামী ইফতেখার করিম এর প্রচেষ্টায় ২০১১ সালে এটি পুরুজ্জীবিত করা হয়। সুবিধাবঞ্চিত এবং চরম দারিদ্র্যের জীবন থেকে উদ্ধার করে ২০ জন ছেলে শিশুকে পূর্ণ তত্ত্বাবধায়নের দায়িত্ব নেয় একাডেমী। দুই থেকে চার বছর বয়সের সেসব শিশু বর্তমানে হয়েছে চার থেকে ছয় বছরের। একাডেমীর প্রধান লক্ষ্য এসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুর শিক্ষার মান ও ব্যয়ভারের দিক নিশ্চিত করা যতদিন না তারা স্নাতক শেষ করে নিজেরা যোগ্য হয়ে ওঠে। যোগ্যতার মানের ক্ষেত্রে তাদের দুটি জিনিসের প্রতি বেশি খেয়াল রাখা হয় বলেই নূর ই ফরিদ নাসরিন একাডেমীর শিশুরা বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে চলছে। এর একটি হলো ইংরেজি ভাষায় শিশুদের দক্ষতা বাড়ানো এবং শারীরিক যত্ন ও পরিচর্যা যা একজন শিশুর জন্মগত অধিকার।
একাডেমীর সেক্রেটারি জেনারেল মিশাল করিম বলেন, প্রতিটি কাজেরই সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা আছে। যেহেতু আমি এটিকে আমার মায়ের স্বপ্ন হিসাবে লালন করছি তাই ভবিষ্যতে এর পরিধি বাড়াতে অভিজ্ঞতা অর্জনের ব্যাপারটাও কিন্তু এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বাবা এবং আমি মিলে একদিন এই একাডেমীকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারবো বলে বিশ্বাস করি।
তাদের সকল প্রচেষ্টা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এখন থেকেই ছেলেদের মাঝে ব্যাপক আন্তরিকতার ছাপ দেখা যাচ্ছে বলে জানান মিশাল করিম। একাডেমীর বড় ছেলেরা ছোট ছেলেদের দেখাশুনা নিজের ছোট ভাইয়ের মতই করছে। তাদের মাঝে পড়াশুনার প্রতি প্রবল আগ্রহ তাদের অনেক দূর নিয়ে যাবে। তাদের সকলেই স্কুলে ভর্তি হয়েছে এবং তাদের নিয়মিত পড়াশুনা ও খেলাধুলার দিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে।
প্রসঙ্গক্রমে মিশাল করিম তাদের এ লক্ষ্যের নতুন সংযোজন হিসাবে একটি বিশাল শিক্ষণীয় যাত্রা আয়োজনের কথা জানালেন। আর সেটা হলো, টম এবং লুক নামের দুই ব্যক্তি কিছুদিনের মধ্যে লন্ডনের বাংলা টাউন খ্যাত ব্রিকলেন থেকে তাদের সাইকেল যাত্রা শুরু করবেন। এই সাইকেল যাত্রার সর্বশেষ গন্তব্যস্থল হবে ঢাকা। ঢাকা থেকে তারা মূলত কুমিল্লার দারোগা বাড়ির নূর ই ফরিদ নাসরিন একাডেমীতে তাদের বিশাল পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে আসবেন।
টম এবং লুক তাদের একটি মাস সুবিধাবঞ্চিত এই ২০ শিশুর সঙ্গে কাটাবেন। তাদের ইংরেজি ভাষার দক্ষতা বাড়াতে ও খেলাধুলা শেখাতে সময় ব্যয় করবেন। সাইক্লিং উদ্যোগের এই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে মিশাল করিম বলেন, ‘আমরা ভেবেছি তাদের এই সাইক্লিং যাত্রা একটি সাহসী অভিযান যা অনেকটাই ভিন্ন এবং আলোড়ন তৈরি করবে। এই ভিন্ন ধারার যাত্রার সঙ্গে আমি বেশ মতাদর্শগত মিল খুঁজে পেয়েছি। তাই তত্ক্ষণাত্ এই বিশাল ভ্রমণের গন্তব্য হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই।’
মিশালের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, টম ও লুক তাদের সাইকেলে বিশ্বভ্রমণের সময় দক্ষিণ আফ্রিকা, কঙ্গো, ইরাক, উগান্ডা, আফগানিস্তান, লেবানন ও সিরিয়ার উদ্বাস্তু ও বঞ্চিত শিশুদের জন্যও দাতা হিসাবে ভূমিকা পালন করবে। এই ঐতিহাসিক সাইকেল যাত্রার পথ হবে ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং পরিশেষে ভারত হয়ে বাংলাদেশ। ‘ব্রিকলেন টু বাংলাদেশ’ নামের এই সাইকেল যাত্রাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে দেশি-বিদেশি অনেক বিখ্যাত কোম্পানি। তাদের মাঝে বাংলাদেশ থেকে প্রথম সারির ব্রান্ড ফিউশন, বেক্সিমকো, রেনেটা এবং সামিট গ্রুপ সহায়তা করছে যা সরাসরি নূর ই ফরিদ নাসরিন একাডেমী পরিচালনার জন্য সহায়ক হবে।
এ ব্যাপারে মিশাল করিম বলেন, আমরা যদিও বেশকিছু সংস্থার কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি তবুও আমার ধারণা, দেশে বহু মানুষ আছেন যারা এসব সুবিধা বঞ্চিতদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে আগ্রহী। তিনি টম ও লুকের এই সাহসী ও ভিন্ন উদ্যোগী সাইক্লিং যাত্রাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, তাদের এই প্রচেষ্টা মানুষকে আরও উদার হয়ে আশপাশের দিকে তাকিয়ে পথশিশু বা সুবিধাবঞ্চিতদের সাহায্যে নিজের ভূমিকা সম্পর্কে সজাগ করবে বলে আমি মনে করি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশে আসার পর লুক ও টমকে ঢাকা ক্লাব এবং ইন্টারন্যাশনাল ক্লাব এর পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানানো হবে। এই সম্পূর্ণ যাত্রার সার্বক্ষণিক বর্ণনা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিবে দ্যা ডেইলি স্টার এবং দৈনিক ইত্তেফাক। এছাড়া রেডিও স্বাধীন জানাবে দেশে-বিদেশে টম আর লুকের দুঃসাহসিক অভিযানের পুরো খবর। জি এন্ড আর দেখবে ওয়েব বিপণনের দিকগুলো। গুলশান-২ এ সাইনেজ কর্তৃক মুদ্রিত, আর কে গ্রুপ-এর বিলবোর্ড বাণিজ্যিকীকরণে সাহায্য করবে। ক্লিক ইত্তেফাক এ সম্পর্কিত খবর নিয়মিতভাবে প্রকাশ করবে তাদের www.clickittefaq.com-এ। এছাড়া এই মহত্ অভিযানের সব খবর জানা যাবে www.bricklanetobangladesh.com ঠিকানায়। নূর ই ফরিদ নাসরিন একাডেমী সম্পর্কে আরো জানতে www.the-40.com ওয়েব সাইট ঘুরে আসতে পারেন।—ইফফাত নওরিন মল্লিক
