মোস্তাফিজকে ধরতে লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা

আপডেট : ১০ জুন ২০১৩, ২৩:০৩
শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত এক সন্দেহভাজনকে ধরতে লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে সরকার। সন্দেহভাজন ওই ব্যক্তির নাম মোস্তাফিজুর রহমান। তাকেই প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে মনে করছে তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি ও সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গতকাল এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার মাহফুজুল হকের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কেউ যদি তার সন্ধান বা তার সম্পর্কে কোনো তথ্য পান তাহলে নিকটস্থ থানা বা পুলিশকে জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে। সঠিক সন্ধানদাতাকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেয়া হবে এবং তার পরিচয় গোপন রাখা হবে। মোস্তাফিজের বাড়ি মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের কাদিরপাড়া গ্রামে। তার বাবা মো. শমসের বিশ্বাস। বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটি (বিসিডব্লিউএস) এর সংগঠক এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন আমিনুল ইসলাম। গত বছরের ৪ এপ্রিল বাইপাইল থেকে তিনি নিখোঁজ হন। পরে ৬ এপ্রিল টাঙ্গাইলের ঘাটাইল থানা পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির লাশ টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কের পাশ থেকে উদ্ধার করে। পরদিন পত্রিকায় ছাপা হওয়া লাশের ছবি দেখে পরিবারের সদস্যরা আমিনুলকে সনাক্ত করেন। তার আগেই ঘাটাইল থানা পুলিশ কোনো দাবিদার না পেয়ে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশটি দাফন করে। পরে ম্যাজিষ্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে ৯ এপ্রিল লাশটি তুলে কালিয়াকৈর থানার হিজলহাটির মৃধাপাড়া এলাকার বাড়িতে বাবার কবরের পাশে পুনরায় তাকে দাফন করা হয়। আমিনুল হত্যা মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা- সিআইডি। এর আগে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান তার মেয়ে সায়েমা আখতার আঁখি। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, এর আগে মোস্তাফিজুর রহমান নামক এক ব্যক্তি তার বাবাকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দিয়েছিল। পুলিশের সোর্স পরিচয়দানকারী মোস্তাফিজুরের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযোগ করেও কোন লাভ হয়নি। পাশাপাশি আমিনুল নিখোঁজের আগে এই মোস্তাফিজুর রহমানই তাকে ডেকে নিয়ে যায় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে। এদিকে আমিনুল হত্যাকাণ্ডের খবরে সারাবিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেন। ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে যারা শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ায়, শ্রমিকদের বেতন-ভাতাসহ ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন করে তাদের পরিণতি শুভ হয় না। গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা আমিনুল হত্যার পাঁচ মাস পার হলেও এখনো পর্যন্ত জড়িতদের কেউ আটক হয়নি। আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা বলছেন, তদন্তে সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশের কাছে আমিনুল হত্যার বিষয়টি গুরুত্বহীন মনে হয়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানিকারক দেশগুলোর কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আমিনুল হত্যার বিচারে সরকার আর পুলিশের ভূমিকা পোশাক আমদানিকারকদের উদ্বেগের কারণ। আমিনুল হত্যাকাণ্ডকে বাংলাদেশের অন্য সাধারণ হত্যাগুলোর মতোই মনে করা হচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি এভাবে দেখলে চলবে না। এছাড়া আমিনুল হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি ইউরোপীয় ও মার্কিন কূটনীতিকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তত্কালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনসহ ওবামা প্রশাসন এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত, বিচার ও চূড়ান্ত সুরাহা করতে বাংলাদেশ সরকারের উপর এক বছরেরও বেশী সময় ধরে চাপ দিয়ে আসছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনাসহ এই সময়ে সফরকারী যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকরা এ বিষয়ে বারবার বাংলাদেশ সরকারকে তাগিদ দেয়। শ্রমিক নেতা আমিনুলের সংগঠন বিসিডব্লিউএস যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন এএফএল-সিআইও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। সবার কাছে আমিনুল বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের প্রতীক। নিউইয়র্ক টাইমসের ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, আমিনুল শ্রমিকদের জন্য লড়েছিলেন বলেই তাকে কেউ হত্যা করেছে। বাংলাদেশে নিম্ন মজুরির জন্যও প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এশিয়ার উপ-পরিচালক ফিল রবার্টসন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া চিঠিতে লিখেন, নৃশংস হত্যাকাণ্ডের এক বছর পরও এর তদন্ত নিশ্চিত করতে সরকারের পদক্ষেপ সামান্যই। এছাড়া দায়ীদের শাস্তি দেয়ার জন্যও তেমন কিছু করা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।