রশীদ হায়দার
১৯৪১ সালে ১৫ জুলাই পাবনা জেলার ছোট্ট সবুজ গ্রাম দোহারপাড়ায় আমার জন্ম। বাবার নাম মোহাম্মদ হাকিম উদ্দিন শেখ। মায়ের নাম রহিমা খাতুন। আমাদের গ্রামের দক্ষিণ পাশ দিয়ে প্রবাহিত ইছামতী নদী, যে নদী পদ্মা নদীর শাখা হিসেবে পরিচিত। পাবনা শহরের মাঝখানে প্রবাহিত নদীটি এখন মরে গেছে। এই ইছামতী নদীকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি কবিতা লিখেছেন। ইছামতী নদীর জলে ডুবসাঁতার কেটে কেটে কেটেছে আমার দুরন্ত কৈশোর। আমার গ্রামটি যেন শিল্পীর রঙ-তুলিতে আঁকা ছবি। দিগন্তবিস্তৃত সবুজের মাঠ, দূর দিগন্তে নুয়ে পড়া নীলাকাশ, আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, উত্তাল তরঙ্গে নেচে ওঠা ইচ্ছামতী- সবকিছু মিলিয়ে মনোমুগ্ধকর এক মায়াবী পরিবেশে কেটেছে আমার শৈশব-কৈশোর। কৈশোরের হারানো দিনগুলো ফিরে পেতে ইচ্ছে করে। স্বর্গের মতো সুন্দর একটি সংসারে মা-বাবার আদর-স্নেহ আর সীমাহীন ভালোবাসার মাঝে আমাদের বেড়ে ওঠা। মা-বাবা, ভাইবোন সবার সাথে ছিলো আন্তরিক সম্পর্ক। মনে পড়ে, মাকে আমি একদিন হঠাত্ জিজ্ঞেস করেছিলাম, আচ্ছা মা বলুনতো আমার সঠিক জন্ম তারিখ কবে? জবাবে মা আমাকে বলেছিলেন, ফজলী আমের দিনে। আমি তখন বিরাট একটা ধাঁধায় পড়ে গিয়েছিলাম। বাবা আমাকে স্কুলে ভর্তি করেছিলেন নিজের বানানো জন্মতারিখ দিয়ে। তারিখটি ১৯৪২ সালের ১৩ মে। প্রায় ত্রিশ বছর পরে বাবার হাতের লেখা একটা চিকন খাতা পেলাম। সে খাতায় আমার জন্মতারিখ লেখা ছিলো ১৫ জুলাই ১৯৪১ সাল।
আমার গ্রামের নাম দোহারপাড়া। ছেলে বেলায় গ্রামের আবহেই বেড়ে ওঠা, কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করা, লেখাপড়া সবই ছিলো শহরে। একেবারে পাবনা শহরের উপকণ্ঠেই ছিলো আমাদের বাড়ি।
সে কারণে শৈশব থেকেই গ্রাম এবং শহরের অভিজ্ঞতা আমার আছে।
আমি ছেলেবেলা থেকেই দেখে আসছি আমার বড় ভাই কবি জিয়া হায়দার লেখালেখি করতেন। তিনি কবিতা লিখতে খুব পছন্দ করতেন। তাঁর পড়ার টেবিলে সাজানো থাকতো গল্প, কবিতা, উপন্যাসসহ বিভিন্ন রকমের বই। সেখান থেকে নিয়ে আমি অনেক বই পড়তাম। এছাড়া ঠাকুর মার ঝুলি, ঠাকুর দাদার ঝুলি, বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী এসব পড়েছি। যে উপন্যাসটি পড়ে আমার মনের ভেতর প্রচন্ডভাবে দাগ কেটে ছিলো সেটি পথের পাঁচালী। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের প্রায় সব বই শৈশবে পড়েছি।
বড় ভাই কবি জিয়া হায়াদারের কাছের বন্ধু ছিলেন কবি আবু হেনা মোস্তফা কামাল। তাঁর লেখা পড়ে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হতাম। আমি যখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ি তখন থেকেই আমি কচি-কাঁচার আসরের সদস্য হই। আমি যখন নবম শ্রেণীতে পড়ি তখন আজাদ পত্রিকায় ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস বিশেষ সংখ্যায় বড়দের জন্য লেখা আমার একটি গল্প প্রকাশিত হয়। এভাবেই আমার লেখালেখি শুরু। আমি কখনও কবিতা লিখিনি। আমি ছাড়া আমার পাঁচ ভাই জিয়া হায়দার, মাকিদ হায়দার, দাউদ হায়দার, জাহিদ হায়দার, তারা সবাই কবিতা লেখে এবং লিখছেন। মূলত আমি পথের পাচালী পড়েই লেখালেখিতে অনুপ্রাণিত হয়ে উঠি। আমার প্রথম লেখা ছাপা হয়েছিলো দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকায়। লেখাটির শিরোনাম আজ আর মনে পড়ছে না। কিন্তু কিছু স্মৃতি আজো ভুলিনি। স্পষ্ট মনে আছে লেখাটি প্রকাশ হওয়ার পর পত্রিকাটি সংগ্রহ করেই বহুবার আমি শুধু আমার লেখাটি পড়েছিলাম। পত্রিকাটি নিয়ে পাড়ার যতো বন্ধু স্বজন সবাইকে আমার লেখাটি দেখিয়েছিলাম। রাতে বালিশের নিচে লুকিয়ে রেখে শেষে ঘুমাতাম। হঠাত্ ঘুম ভেঙে একাকী জেগে জেগে বারবার শুধু নিজের লেখাটি পড়তাম। লেখাটি পড়তে পড়তে ভাবতাম সত্যি এ লেখাটি কি আমি লিখেছি? প্রথম লেখা ছাপা হওয়ার কী যে অনুভূতি তা আর বলে বোঝানো যাবে না।
সত্যি করে স্বীকার করছি এখনও কোনো পত্র-পত্রিকায় আমার কোনো লেখা প্রকাশ হলে নিজের লেখাটি বারবার পড়ি। তারপর অন্যদের লেখা পড়ি।
ছেলেবেলা আমার দু’চোখ ভরা মজার মজার স্বপ্ন ছিলো। একা একা বসে বসে ভাবতাম বড় হয়ে আমি সিনেমা হলের গেটকিপার হবো। এরপরে যে স্বপ্নটা আমাকে খুব বেশি তাড়িয়ে ফেরতো তা হলো বড় হয়ে আমি রেলগাড়ির চেকার হবো। রেলগাড়িতে চড়ে খালাবাড়ি ঈশ্বরদী যেতে যেতে আমার মনের মাঝে এ সব স্বপ্ন জাগ্রত হতো। অবশেষে হলাম লেখক। ১৯৬২ সালে আমি একটি সিদ্ধান্ত নিই, যতদিন আমার হাত, চোখ, সর্বশরীর সুস্থ থাকবে ততদিন শুধু লিখেই যাবো। ১৯৬৭ সালে আমার প্রথম গল্পের বই প্রকাশিত হয়। গল্পগ্রন্থটির নাম নানকুর বোধি। বইটি প্রকাশের পরেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।
১৯৭২ সালে আমি বাংলা একাডেমীতে চাকরি নিই। জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের পরিচালক ছিলাম এক সময়। বর্তমানে নজরুল ইনস্টিউটের নির্বাহী পরিচালক।
ছোটদের জন্য আমি কম লিখি নাই। ১৯৭৭ সালে আমার শিশুতোষ প্রথম গ্রন্থ গোলাপের জন্ম প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য আমার অন্য বইগুলো হলো— গোলাপ গোলাপ, যদি দেখা দাও, পুনর্জন্ম, জসীমের নকশী কাঁথা ও শোভনের স্বাধীনতা।
সাহিত্যচর্চার জন্য অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছি। এর মধ্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কার, হুমায়ূন কাদির পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার, পাবনা জেলা সমিতি স্বর্ণপদক এবং রাজশাহী সাহিত্য পরিষদ সম্মাননা বিশেষভাবে উল্লেখ্য।
