কে স্মরণের প্রান্তরে

আপডেট : ১২ জুন ২০১৩, ১৯:০৮
আমাদের গানের ভুবনকে শোক-সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী আঞ্জুমান আরা এমনভাবে চলে যাবেন, এটা ভাবাই যায় না। নিওমোনিয়ায় আক্রান্ত আঞ্জুমান আরা ২৯ মে ইন্তেতাল করেন (ইন্নালিল্লাহে...রাজেউন)। খবরটা প্রথম আমাকে টেলিফোনে জানালেন বিশিষ্ট আরেক শিল্পী খোরশেদ আলাম। আমি তো হতবাক। আজকাল নিওমোনিয়া, ব্রংকাইটিস ইত্যাদি আর তেমন মরণব্যাধি নয় বলে জানি। কিন্তু যে যাবার সে বুঝি এমনি করে চলে যায়। বাংলাদেশের সংগীত-আকাশের অন্যতম তারকা আঞ্জুমান আরা। চলচ্চিত্র, রেডিও, টিভিতে প্রচারিত তাঁর অসংখ্য জনপ্রিয় গান বছরের পর বছর শ্রোতাদের আলোড়িত ও আপ্লুত করে রেখেছে। আঞ্জুমান আরার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায়। সময় ১৯৫৯-৬০ সাল। সম্ভবত তিনি আমার ২/১ বছরের জুনিয়র ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সময়টা ছিল সাহিত্য-সংগীতের স্বর্ণযুগ। বর্তমানে আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের দিকপাল যারা তাদের অধিকাংশই ওই সময়কার ছাত্র। যেমন সংগীতে আসফ উদ্দৌলা, আনোয়ার উদ্দিন খান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ফেরদৌসী বেগম (রহমান), মোস্তফা জামান আব্বাসী, আঞ্জুমান আরা, কাজী আনোয়ার হোসেন, সৈয়দ আবদুল হাদী, খন্দকার নূরুল আলম, খন্দকার ফারুক, নাজমুল হুদা বাচ্চা প্রমুখ। ১৯৬০ সালে ‘রাজধানীর বুকে’ ছায়াছবিতে গান লেখার সুবাদে বিশেষ করে তালাত মাহমুদের গাওয়া ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো’ গানটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে আমার পরিচিতি বাড়িয়ে দিল। সেই সময় রেডিও ছিল কণ্ঠশিল্পীদের একমাত্র প্রচার মাধ্যম। টেলিভিশন তখনও চালু হয়নি। বাংলা চলচ্চিত্রের হাঁটিহাঁটি পা-পা অবস্থা। উর্দু ছবির ডামাডোলে বাংলা ছবি নির্মিত হতো বছরে মাত্র ২-১টা। আবদুল আলীম, আসফ উদ্দৌলা ও ফেরদৌসী বেগম ছিল সুরকারদের কাছে নির্ভরযোগ্য প্লে-ব্যাক সিংগার। এমতাবস্থায় ‘নতুন সুর’ ছায়াছবিতে গান লেখার জন্য আমার ডাক পড়ল। সুরকার রবীন ঘোষ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সম্ভবত ‘নতুন সুর’ রবীন ঘোষের চতুর্থ সিনেমা ছিল। ইতোমধ্যে তিনি বাংলা ও উর্দু মিলিয়ে প্রায় ৫০টি ছায়াছবির সংগীত পরিচালক এবং শ্রেষ্ঠ সুরকার হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। তিনি বর্তমানে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুরকার ও সংগীত পরিচালক। ‘নতুন সুর’ ছবিতে মোট ৫টি গান। প্রথম গানটি ছিল দ্বৈত কণ্ঠে ‘তুমি আছ পাশে, তুমি আছ কাছে’; শিল্পী ফেরদৌসী বেগম ও আবদুল জব্বার। সম্ভবত এটি ছিল আবদুল জব্বারের প্রথম প্লে-ব্যাক। দ্বিতীয় গানটির কথা—‘কে স্মরণের প্রান্তরে চুপি চুপি ছোঁয়া দিয়ে যায়’। এ গানটি কাকে দিয়ে গাওয়ানো যায় সেই চিন্তাভাবনা চলছিল। গানটির কথা ও সুরে যে ট্র্যাজিক আবেদন তাতে আমার মনে হলো আঞ্জুুমান আরার কণ্ঠেই মানানসই। ইতোপূর্বে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর গান শুনেছি। তাঁর কণ্ঠ মাধুর্যে আপ্লুত হয়েছি। পরিচালক এহতেশাম ও সুরকার রবীন ঘোষ কিন্তু দ্বিধান্বিত। অনভিজ্ঞ নতুন শিল্পী দিয়ে প্লে-ব্যাক করাবার ঝুঁকি নিতে রাজি নন তাঁরা। কিন্তু আমার পীড়াপীড়িতে অবশেষে সম্মত হলেন এবং আঞ্জুমান আরার সঙ্গে যোগাযোগ করার দায়িত্ব দিলেন আমাকেই। আঞ্জুমান আরার সাথে তখনও আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল না। একজন নবীন গীতিকার হিসেবে হয়তো তিনি আমাকে জানতেন। আমিও তাঁকে প্রতিশ্রুতিশীল একজন কণ্ঠশিল্পী হিসেবে চিনতাম। তখনকার দিনে ছাত্র-ছাত্রীদের মেলামেশা তেমন খোলামেলা ছিল না। আমি মেয়েদের কমন রুমে গিয়ে আঞ্জুমান আরার খোঁজ করলাম। দারোয়ান তাকে ডেকে আনল। আঞ্জুমান আরা আমার আসার উদ্দেশ্য শুনে অভিভূত। হয়তো ভাবতে পারেননি, এত শীঘ্রই তিনি প্লে-ব্যাক করার সুযোগ পাবেন। আমি তাঁকে রবীন ঘোষের বাসার ঠিকানা দিলাম। নির্দিষ্ট সময় আমিও উপস্থিত থাকব বলে জানালাম। রবীন ঘোষদের ওয়ারীর সেই লাল রঙের দোতলা বাড়িটি কত গুণীজনের আনাগোনায় মুখর ছিল। আজ সেটির পড়োপড়ো অবস্থা। যাই হোক, আঞ্জুমান আরা যথাসময়ে উপস্থিত হলেন। রবীন ঘোষ আন্তরিকভাবে তাঁকে গানটি তুলে দিলেন। সিনেমার সিক্যুয়েন্স এবং কথার মর্ম বুঝিয়ে দিলেন। যন্ত্রীদের সহ রিহার্সেল চলল কয়েকদিন। অবশেষে নির্দিষ্ট দিনে এফডিসিতে গানটির রেকর্ডিং হলো। আঞ্জুমান আরা প্রাণমন ঢেলে নিবেদিত চিত্তে গাইলেন। সুরকার, পরিচালক, যন্ত্রী সবাই খুশি হলেন, উচ্চ প্রশংসা করলেন। রবীন ঘোষ আমাকে বললেন, ‘তোমার চয়েস সঠিক। এ গানটি দিয়ে আঞ্জুমান আরা প্লে-ব্যাকে যাত্রা শুরু।’ এরপর আঞ্জুমান আরাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক অসংখ্য প্লেব্যাকে কণ্ঠ দিয়েছেন এবং সর্বস্তরের শ্রোতাদের হূদয়মন জয় করেছেন। পরবর্তীকালে রেডিও-টিভিতে তিনি আমার অনেক গানই গেয়েছেন। বিশেষ করে কাদের জামেরী, খোন্দকার নুরুল আলম ও আনোয়ার উদ্দীন খানের সুরে। চিত্ত ভুঞা নামে সেই সময়কার এক তরুণ সুরকারের সুরে আমার লেখা গান ‘গোধূলির রঙে রঙে আঁকা বহুদূর, আলোর বাঁশিতে বাজে বিদায়ের সুর’—আঞ্জুমান আরার মেজাজী কণ্ঠে বহুবার রেডিওতে প্রচারিত হয়েছিল। গানটির সুর ছিল ‘সাহানা’ রাগে, বেশ শ্রুতিমধুর। যে গাছ যত বেশি ফলবান সে গাছ তত বেশি অবনত হয়। বহু প্রচলিত এ প্রবাদটির মূর্তিমান দৃষ্টান্ত ছিল আঞ্জুমান আরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী, ভদ্র, বিনয়ী আঞ্জুমান আরার মতো নিষ্ঠাবান শিল্পী আজকের দিনে মেলা ভার। যারাই তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন তাঁর অভিজাত আচার-আচরণ, বিনয়ী আলাপনে মুগ্ধ হতেন। প্রসঙ্গত একটি কথা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর সাক্ষাত্কারে আঞ্জুমান আরা প্রায় আমার নামটি কৃতজ্ঞচিত্তে উল্লেখ করতেন। কতকাল আগের আমাদের প্রথম সাক্ষাতের ছোট ঘটনাটি হয়তো তিনি ভুলে যেতে পারেননি। এমন হূদয়বান শিল্পী বর্তমানকালে খুঁজে পাওয়া যাবে কি? লেখক :গীতিকার, কবি, সাংবাদিক।