ডলারের বিপরীতে টাকার দাম বাড়ছে

আপডেট : ১২ জুন ২০১৩, ২২:৫৫
মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকা ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডলারের বিপরীতে টাকার মান ৮ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত অর্থ (রেমিট্যান্স) এবং রপ্তানি আয় বেড়ে যাবার সাথে সাথে আমদানি কমে যাওয়ায় মুদ্রাবাজারে টাকার এই তেজীভাব। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি এক মার্কিন ডলার পেতে ব্যয় হতো ৮৪ টাকা ৪৭ পয়সা। গত সোমবার ব্যাংকগুলো প্রতি ডলার কিনেছে ৭৭ টাকা ৭৫ পয়সা দরে। ডলারের বিপরীতে টাকার এই তেজীভাবের কারণে আমদানিকারকরা লাভবান হলেও কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন রপ্তানিকারকরা। রপ্তানি মূল্য দেশে আসলে তার বিপরীতে তারা আগের চেয়ে কম টাকা পাচ্ছেন। যেমন আগে একশ ডলারের পণ্য রপ্তানি করলে একজন উদ্যোক্তা আট হাজার চারশ’ টাকার বেশি পেতেন। এখন তিনি পাচ্ছেন ৭ হাজার ৭৭০ টাকার কিছুটা বেশি। তবে, আমদানিকারকরা কম মূল্যে ডলার কিনে পণ্য আমদানি করলেও স্থানীয় বাজারে জিনিসপত্রের দামে তার তেমন প্রভাব পড়ে না। ৮৪ টাকার বেশি দিয়ে ডলার কিনে পণ্য আমদানি করলে সে পণ্য যে দামে বিক্রি হয়েছে বর্তমানে সে পণ্যের দাম কমেনি। উল্লেখ্য, ২০০৩ সালের মে মাসের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের বিনিময় মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও এখন আর তা করা হয় না। ওই সময় থেকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার ভাসমান বিনিময় হার চালু করে। সে সময় থেকে বাজারে চাহিদা এবং যোগানের ভিত্তিতে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারিত হয়ে থাকে। তবে বাজারে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময়হার যাতে স্থিতিশীল থাকে সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সময়ে সময়ে বাজার থেকে ডলার কিনে থাকে। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক ও বিজিএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি এবিএম সামছুদ্দিন এ বিষয়ে ইত্তেফাককে বলেছেন, গতবছর আমরা ডলারের যে বিনিময়মূল্য পেয়েছি তা থেকে এবার প্রতি ডলারে ৬ টাকারও বেশি অর্থ কম পাচ্ছি। এর একটি চাপ পড়ছে আমাদের ওপর। তিনি বলেন, রপ্তানিকারকরা পুরো বছরের জন্য তাদের পরিকল্পনা ঠিক করেন। তাতে ডলারের বিনিময়মূল্যও বিবেচনায় ধরা হয়। একদিকে উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়া আর অপরদিকে ডলারের দাম কমে যাওয়ায় রপ্তানিকারকরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। তাঁর মতে, ভারতে রপ্তানিকারকদের জন্য ডলারের আলাদা এক্সচেঞ্জ রেট আছে। বাংলাদেশও রপ্তানি সুরক্ষায় একাজটি করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, টাকার বিনিময় মূল্য ও বাজারে তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য ব্যাংকটি নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বাজার থেকে ডলার কিনে নেয়া। চলতি অর্থবছরের (২০১২-১৩) অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ৩৫৭ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার কিনে নিয়েছে। তবে, রেমিট্যান্স এবং রপ্তানি আয় বাড়ার সাথে সাথে আমদানি কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক হস্তক্ষেপ করেও টাকা এবং ডলারের দামে ভারসাম্য রাখতে পারছে না। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৩১৫ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানির জন্য উদ্যোক্তারা এলসি খুলেছেন। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সাড়ে ৪ শতাংশ কম। অপরদিকে, ২০১২-১৩ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত মোট এক হাজার ৯৭০ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশেরও বেশি। এছাড়া ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বাংলাদেশে মোট ৮২ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকার রেমিট্যন্স পাঠিয়েছেন। এর পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ এক হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরেও রেমিট্যান্সে এ প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত আছে। টাকা-মার্কিন ডলারের বিনিময় হার স্বাধীনতার পর অর্থাত্ ১৯৭২-৭৩ সালে এক মার্কিন ডলারে পাওয়া যেতো ৭ টাকা ৩০ পয়সা। ৭৫-৭৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ টাকা ৫ পয়সায়। ৮০-৮১ সালে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ছিলো ১৬ টাকা ২৫ পয়সা। ৮৫-৮৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৯ টাকা ৮৮ পয়সা। ৯০-৯১ সালে প্রতি মার্কিন ডলারের মূল্য ছিলো ৩৫ টাকা ৬৭ পয়সা। ৯৫-৯৬ সালে তা দাঁড়ায় ৪০ টাকা ৮৩ পয়সা। ২০০০-২০০১ সালে টাকার সাথে ডলারের বিনিময়মূল্য দাঁড়ায় ৫৩ টাকা ৯৫ পয়সা। ২০০৫-০৬ সালে তা আরো বেড়ে ৬৭ টাকা ৭ পয়সায় উঠে যায়। ২০১১-১২ সালে মার্কিন ডলার ৭৯ টাকা ৯ পয়সায় বিক্রি হয়েছে। টাকার সাথে ডলারের সবচেয়ে বড় বিনিময়মূল্য ছিলো ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি। এদিন ব্যাংকগুলো ৮৪ টাকা ৪৭ পয়সায় প্রতি মার্কিন ডলার বিক্রি করেছে। তবে এরপর থেকে ডলারের দাম কমতে কমতে ৭৭ টাকা ৭৫ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।