জালিয়াতি করে কোটি কোটি টাকার নিম্নমানের ওষুধ সামগ্রী আমদানি

আপডেট : ১২ জুন ২০১৩, ২২:৫৬
ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর ও কয়েকটি ওষুধ কোম্পানির কিছু কর্মকর্তা অধিদফতরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে বিদেশ থেকে নিম্নমানের কোটি কোটি টাকার ভ্যাকসিন ও ওষুধ সামগ্রী আমদানি করছে। এই চক্রটিকে এর আগেও শনাক্ত করা হয়েছিল; কিন্তু তাদের এতোই ক্ষমতা যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনি। সর্বশেষ গত এপ্রিলে অধিদফতরের মহাপরিচালকের স্বাক্ষর জাল করে কলেরা ভ্যাকসিন আমদানির সময় শাহজালাল বিমানবন্দরে একটি চালান ধরা পড়ে। পরে চক্রটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে ফের নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। চক্রটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারার কারণ সম্পর্কে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, জাল-জালিয়াতি করে অর্জিত টাকার একটি বড় ভাগ যায় ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর ও মন্ত্রণালয়ের কিছু দায়িত্বশীল কর্মকর্তার পকেটে। কিছু মন্ত্রী ও এমপিকেও টাকা দিয়ে চক্রটি প্রশাসনকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরসূত্রে জানা গেছে, গত এপ্রিলে হেল্থ কেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আলো মাল্টিপারপাস কোম্পানি ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালকের স্বাক্ষর জাল করে কলেরার ভ্যাকসিন আমদানি করে। তিন হাজার ডোজ কলেরা ভ্যাকসিনের মূল্য ২২ হাজার ৯৫০ ইউরো (২২ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা)। সুইডেন থেকে এ ভ্যাকসিন জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে অংশ নিতে যাওয়া সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর জন্য আমদানি করা হয় বলে জানা যায়। ভ্যাকসিনের চালানটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে খালাস করতে গেলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হয়,মহাপরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার স্বাক্ষরটি জাল। পরে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে ওষুধ প্রশাসন নিশ্চিত হয়, পুরো চালানটি আমদানি করা হয় স্বাক্ষর জালিয়াতি করে। ওষুধ প্রশাসন ওই ভ্যাকসিন বাজেয়াপ্ত করতে অনুরোধ করেছে। ভ্যাকসিন আমদানিকারী ওই মাল্টিপারপাস কোম্পানির বিরুদ্ধে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো. সালাহ উদ্দিন বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় মামলা দায়ের করেছে। হেলথ কেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হালিমুজ্জামান স্বাক্ষর জাল করে ভ্যাকসিন আমদানির বিষয়টি স্বীকার করে গত মঙ্গলবার ইত্তেফাককে বলেন, দ্রুত ভ্যাকসিন আনতে তার প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তা ও ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের কিছু কর্মকর্তা একসঙ্গে এ কাজটি করেছে। আমি বিষয়টি জানতাম না। পরে জেনেছি। তবে তিনি বলেন, ওই ভ্যাকসিনের গুণগতমানে কোন সমস্যা নেই। বিষয়টি জনস্বার্থে বিবেচনা করা উচিত বলে তিনি দাবি করেন। এর আগে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল কালাম আজাদ এবং পরিচালক ডা. জহিরুল হক ও পরিচালক প্রফেসর ড. আব্দুল গনির স্বাক্ষর জাল করে কোটি কোটি টাকার ওষুধ সামগ্রী আমদানি করা হয়েছিল। তখনও কোন ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের দুই কর্মকর্তা বলেন, এর আগেও বেশ কয়েকটি নামিদামি ওষুধ কোম্পানি কয়েকশ কোটি টাকার ওষুধ সামগ্রী ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক ও পরিচালকের স্বাক্ষর জাল করে আমদানি করেছে। তখন ওই কোম্পানি ও চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু চক্রটির ক্ষমতার দাপটে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়নি। কর্মকর্তারা চাকরি বাঁচাতে চুপ থাকেন। আর ধামাচাপা পড়ে যায় বিষয়গুলো। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত ৪ জুন ওই ভ্যাকসিন আমদানির সঙ্গে জড়িত কোম্পানি ও চক্রটির বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। নিম্নমানের ওষুধসামগ্রী এনে উচ্চমূল্যে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছে স্বাক্ষর জালকারী কোম্পানি। এ রকম একটি কোম্পানির তৈরি নিম্নমানের ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লেখার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের ২৫টি দামি প্রাইভেটকার উপহার দিয়েছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর হোসেন মল্লিক বলেন, ওই জাল স্বাক্ষরকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কোন অবস্থায়ই তাদের ছাড় দেয়া হবে না।