টাকা উড়ছে খুলনায়

আপডেট : ১২ জুন ২০১৩, ২২:৫৮
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দুইদিন বাকি। টাকার ছড়াছড়ি শুরু হয়ে গেছে। শিল্পনগরীর নগরপিতার আসনে অধিষ্ঠিত হতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন মেয়র প্রার্থীরা। মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে নগরীর ৬৫১টি বস্তি। এসব বস্তির প্রায় দেড় লাখ ভোটারকে কেন্দ করে শেষ মুহূর্তে চলছে জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ। ১৫ জুন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে সামনে রেখে নগরীর বস্তিগুলোর দরিদ্র ভোটারই প্রধান দুই প্রার্থীর মূল টার্গেট। প্রতিদিনই প্রতিদ্বন্দ্বী দুই মেয়র প্রার্থীর পাশাপাশি অন্য মেয়র প্রার্থী জাতীয় পার্টি সমর্থিত শফিকুল ইসলাম মধু, সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা ছুটে যাচ্ছেন বস্তি থেকে বস্তিতে। কদর বেড়েছে বস্তির ভোটারদের। তাদের বাগে আনতে উড়াচ্ছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। ইতিমধ্যে একজন মেয়র প্রার্থী ও একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থী নির্বাচনে কালো টাকা ছড়ানোর সুর্নিদিষ্ট অভিযোগ এনেছেন। টাকা বিলির বিষয়টি ওপেন সিক্রেট হলেও রিটার্নিং অফিসার এবং প্রশাসনের এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেই। ৬৫১ বস্তিতে বসবাসকারী দরিদ্র অতিদরিদ্র ভোটারদের নগদ অর্থে প্রভাবিত করে ভোট আদায়ের পরিকল্পনা ও ছক আঁকা হয়েছে। অতীতের প্রতিটি নির্বাচনে কালো টাকায় বস্তিবাসীর ভোট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। ভোট কিনে শপথ করানো হয় তাদের। এবারের নির্বাচনেও এ ধরনের কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। মঙ্গলবার রাতভর ছড়ানো হয়েছে টাকা আর টাকা। শুধু তাই নয়, এক মেয়র প্রার্থী শত শত বস্তিবাসীকে কর্মী বানিয়ে প্রতিদিন হাজিরা বাবদ বিপুল অংকের টাকা ব্যয় করছেন। ভোটগ্রহণের আগের দুই রাতে টাকা বিলির পরিকল্পনা রয়েছে প্রার্থীদের। নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, নির্বাচনে কালো টাকা ছড়ানো হলে তাত্ক্ষণিক প্রতিরোধ করা হবে। এ জন্য মাঠে রয়েছে ১৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ৫ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও কমিশনের নিজস্ব টিম। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এ বিষয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। এ বিষয়ে খুলনা সিটি নির্বাচনে দায়িত্বরত নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচনে কালো টাকা ছড়ানোর সঙ্গে যাদেরই সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে তাদেরই বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এমন নজির নেই। ইসির হালনাগাদসহ খুলনা সিটি করপোরেশনের মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৮ জন। ওয়ার্ড সংখ্যা ৩১, কেন্দ্র ২৮৮, ভোটকক্ষ ১ হাজার ৪২৮। এর মধ্যে নতুন ভোটার ৪১ হাজার। ২৮৮টি কেন্দ্রের মধ্যে আবার ২১৫টি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের অনেকগুলো বস্তি এলাকায়। এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে ভোটার প্রায় দেড় লাখ। যা মোট ভোটারের প্রায় ৩৫ শতাংশ। সরেজমিন জানা গেছে, প্রতি নির্বাচনে মূলত বস্তির বাসিন্দারাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রার্থীর প্রচারণায় আর পেশীশক্তি হিসাবে তাদের ব্যবহার করা হয় নির্বাচনে। তাই ভোটের বিবেচনায় এবারে খুলনার নির্বাচনে এসব মানুষের ভোট বদলে দিতে পারে সব নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ। ফলে ভোট ব্যাংকের ভোট পেতে প্রার্থীরা বৈধ অবৈধ যে কোন উপায়ে তাদের কাছে টানতে প্রচার-প্রচারণা ও কৌশল অবলম্বন করছেন। খালিশপুর, বয়রা এলাকার বস্তিগুলোতে তালুকদার খালেকের অবস্থান অনেকটা শক্ত। পক্ষান্তরে রূপসা, চানমারি, কয়লাঘাট এলাকার বস্তিগুলো সুদৃঢ় অবস্থানে আছেন মনিরুজ্জামান মনি। দুই পক্ষের মধ্যে রূপসা, চানমারি ও কয়লাহাটে ভোট বেশি বলে জানিয়েছেন ভোটাররা। চানমারির বস্তির বাসিন্দা মোমেনা পারভীন বলেন, ‘আমারা দিন আনি দিন খাই। একটু বৃষ্টি হলি ঘর-বাড়ি ডুবে যায়। মালিকও ঠিক করে না। আর কাউকে উপকার করতে আসতে দেখি না। এহন সবাই ভোট চায়। কি আর করমু টাকা যে দিবি তাকে ভোট দেব।’ তাসরিক, তাওফিক ও মেরিনা নামে তিন ভোটার ইত্তেফাককে জানান, ‘এখন প্রাকাশ্য ভোট কেনা-বেচা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কিছু করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।’ নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা অভিযোগ করেছেন বস্তির ভোটারদের মাঝে টাকা ছড়ানো হচ্ছে। বস্তি এলাকার ভোটারদের টার্গেট করে একজন প্রার্থী প্রভাবও বিস্তার করছেন। আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক বলেন, বিএনপির অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমার জয় নিশ্চিত জেনে তারা উলট-পালট কথা বলছেন। শহরের দিনমজুর, খেটে খাওয়া মানুষ আমার পক্ষে। তাই তারা আমাকে ভোট দিতে ভুল করবেন না। এ ব্যাপারে মেয়র প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র হচ্ছে। বস্তিবাসীর ভোট কেনা-বেচার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। গতকাল ১৫ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ও ওই ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সাবেক আহবায়ক কাজী শফিকুল ইসলাম মিঠু প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে সরকার সমর্থিত প্রার্থী আমিনুল ইসলাম মুন্নার বিরুদ্ধে ভোটারদের মধ্যে টাকা ছড়ানোর অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, পুলিশের উপস্থিতিতে সে সহ আরো কয়েকজন ঘটনাস্থলে পৌঁছে এর প্রতিকার চাইলে ওই প্রার্থী ও সমর্থকরা তাকে হত্যার হুমকি দেয়। একই অভিযোগ করেছেন আরেকজন কাউন্সিলর প্রার্থীও। সংরক্ষিত আসন ২-এর কাউন্সিলর প্রার্থী শাহিদা বেগম তার প্রচার-প্রচারণায় বাধা দেয়ার অভিযোগ করেছেন।