চলতি অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের মাত্রা বেড়ে গেছে। দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম এগার মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকার ২৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণের যে সাত হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে সেই টাকাও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে নিয়েছে সরকার।
গ্যাস-বিদ্যুত্ সঙ্কটের সঙ্গে নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেশের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কারণে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া বন্ধ রাখায় ব্যাংকিং ব্যবসায় অনেকটা সঙ্কটকাল চলছে। আর এ অবস্থা হওয়া সত্ত্বেও সরকারকে ঋণ দিতে বাধ্য হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। সরকারের অব্যাহত ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর উপর চাপ বাড়ছে। এতে ঋণের সুদের হার না কমায় ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
ব্যাংক কম সুদে আমানত সংগ্রহ করে তা তুলনামূলক বেশি সুদে বিনিয়োগ করবে এমনটাই নিয়ম। এতে আমানত ও ঋণের মধ্যে যে ব্যবধান হয় সেটাই ব্যাংকের মুনাফা। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করলেই এটা সম্ভব। কিন্তু সরকারকে আমানতের সুদের চেয়ে কম সুদে ঋণ দিতে হয় বলে ব্যাংক লোকসানে পড়ে। এ লোকসান সত্ত্বেও সরকার যখন ঋণ চায় তখন ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে বাধ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুলাই থেকে ৯ জুন পর্যন্ত সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নীট ১৫ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। এ সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে সরকারের নীট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ সাত হাজার ৬২২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ২৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরে সংশোধিত বাজেটে তার পরিমাণ বাড়িয়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়।
এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও বেসরকারি খাতের পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, সরকারের ব্যাংক ঋণের কারণে ঋণের সুদহার কমছে না। আর ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেশি হওয়ায় শিল্পোদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও এতে উত্পাদন খরচ অনেক বেড়ে যায়। তবে ব্যাংকগুলোতে যথেষ্ট পরিমাণে তারল্য রয়েছে বলে জানান তিনি। হাতে গোনা দুয়েকটি ব্যাংকের তারল্য সঙ্কট রয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, এটা তাদের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাবে। এর ফলে দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা ব্যাংক থেকে ঋণ পাবে না। এতে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণায় ব্যাংক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার কথা বললেও ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেয়ায় ব্যাংকিং খাতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রসঙ্গত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে সরাসরি এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে থাকে। আগের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে পিডি (প্রাইমারি ডিলার) ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে শুধুমাত্র সরকার ঋণ নিতে পারত। সম্প্রতি ২৫টি নন-পিডি ব্যাংকও এ তালিকায় সংযুক্ত করা হয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ খানিকটা কমেছে। সরকারের চাহিদা মাফিক ঋণের ৬০ শতাংশ পিডি ব্যাংক পূরণ করার পর বাকি ৪০ শতাংশ নন-পিডিদের ঋণ দিতে হয়। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর সরকারের ঋণের অধিকাংশ চাপানোর এ সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
