জাতীয়তাবাদী নাগরিক পরিষদের প্রার্থী আহসান হাবিব কামালের সঙ্গে বচসার সময় পুলিশের গুলিবর্ষণ ও দেহরক্ষী হারুন অর রশিদ গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছে। ঘটনাস্থল থেকে লিফলেটসহ গ্রেফতারকৃত কামালের ছয় নারী কর্মীসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে পুলিশ মামলা দায়ের করেছে। ঐ মামলায় জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিনকে আসামি করা হলেও মেয়র প্রার্থী আহসান হাবিব কামালকে আসামি করা হয়নি। তবে মামলায় অজ্ঞাত ১শ’ থেকে ১২০ জনকে আসামি দেখানো হয়েছে। অজ্ঞাত আসামিদের মধ্যে আহসান হাবিব কামালকে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন বিএনপি নেতৃবৃন্দ।
ঘটনার পরপরই বিএনপির পক্ষ থেকে স্থানীয় একটি হোটেলে সাংবাদিক সম্মেলন করে কোতোয়ালী মডেল থানার ওসি সাখাওয়াত হোসেনকে বদলির দাবি জানানো হয়। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, বেগম সেলিমা রহমান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মজিবর রহমান সরোয়ার এমপি, প্রার্থী আহসান হাবিব কামাল ও সাবেক এমপি হাফিজ ইব্রাহিম সাংবাদিক সম্মেলনে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, ওসি সাখাওয়াতের নেতৃত্বে পুলিশ ইতিমধ্যেই বিপুলসংখ্যক বিএনপি নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে। তাদেরকে পুলিশের দায়েরকৃত পুরোনো মামলার আসামি দেখানো হয়েছে। প্রার্থীর উপর পুলিশের গুলিবর্ষণ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় কাম্য হতে পারে না। তারা অবিলম্বে ওসি সাখাওয়াতকে প্রত্যাহার করে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহবান জানান। মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে প্রমাণ করতে হবে তারা নিরপেক্ষ। এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় প্রশাসন আওয়ামী লীগের পক্ষ নিয়ে কাজ করছেন বলে সরোয়ার অভিযোগ করেন।
ঘটনার পর এ পর্যন্ত পুলিশ কমিশনার দুই দফা ও মহাজোট সমর্থিত প্রার্থী শওকত হোসেন হিরন সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন। ৩টি সাংবাদিক সম্মেলেনই পুলিশকে নির্দোষ দাবি করা হয়েছে। ঘটনার পর রাত ১২টায় এবং গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় পৃথক দুইটি সাংবাদিক সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মো. শামসুদ্দিন বলেন, আহসান হাবিব কামাল ও তার সমর্থকরা পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নেয়ার সময় পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলিবর্ষণ করেছে। মাত্র এক রাউন্ড শটগানের গুলিতে এক ব্যক্তি আহত হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য আর কোনো উপায় ছিল না পুলিশের কাছে। পুলিশ কমিশনার দাবি করেন, ওসি সাখাওয়াত ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির অভিযোগ সম্পর্কে পুলিশ কমিশনার বলেন, বিএনপি যেসব অভিযোগ করছে তা সুনির্দিষ্ট নয়। ঢালাও অভিযোগের প্রেক্ষিতে কাউকে দোষী চিহ্নিত করা যায় না। তবুও ওসি সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে পুলিশ গুলিবর্ষণ করেছে বলে পুলিশ কমিশনার সাংবাদিকদের জানান।
তবে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শহীদুল আলম ও সেখানে কর্তব্যরত দুই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট গুলি করার নির্দেশ দেননি বলে ইত্তেফাককে জানান। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, পুলিশ ছয় নারীকে আটকের পর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজির না করে অবরুদ্ধ করে রাখায় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর সেখানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা হাজির হয়ে আটককৃত ছয় নারী কর্মীকে তার কার্যালয়ে নিয়ে আসেন। সেখানে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিধিসম্মতভাবে দণ্ড দেয়া সম্ভব না হওয়ায় থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পুলিশ ঐ নারী কর্মীদের থানায় নিয়ে মামলা দায়ের করে।
গুলিবর্ষণের ঘটনার পর আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুটা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে তারা বিএনপি’র সাথে এ মুহূর্তে আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দিতে নারাজ। তাই বিএনপির পথসভা জনসভায় রূপ নিলেও কোনো বাধা দেয়া হয়নি। এমনকি গত কয়েকদিন যাবত্ র্যাব ও পুলিশ বিএনপি নেতা-কর্মীদের বাসাবাড়িতে যেভাবে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে তাও গুলিবর্ষণের ঘটনার পর বন্ধ হয়ে গেছে। ভোটারদের আতংক দূর করতে নগরীতে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের টহল চলছে। তবে তারা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় নির্বাচনী আচরণবিধি নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। বিজিবি ও কোস্টগার্ডের প্রত্যেক টিমের সাথে একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দেয়া হয়েছে। জেলা ম্যাজিস্টেট জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে সকল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বলা হয়েছে।
