মুখের সমস্যা থেকে জটিলতা

আপডেট : ১৪ জুন ২০১৩, ২০:১৩
অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বিভাগীয় প্রধান, ডেন্টেষ্ট্রি বিভাগ বারডেম, ইব্রাহীম মেডিকেল কলেজ চেম্বার:১৫/এ গ্রীন স্কয়ার গ্রীন রোড, ঢাকা মুখের ভিতর আমাদের নানা ধরণের সমস্যা হয়। এই সমস্যাগুলোর মধ্যে আছে দন্তক্ষয় অথবা ডেন্টাল ক্যারিজ, মাড়ির রোগ বা পেরিওডনটাল ডিজিজ, মুখের সাদাক্ষত বা ঘা, আকাঁবাকাঁ দাঁত, আক্কেল দাঁত, মুখের ক্যান্সার ইত্যাদি। মুখের এই সমস্ত রোগ পরীক্ষার মাধ্যমে সনাক্ত করার পর সঠিক চিকিত্সা করা হয়। সঠিক চিকিত্সার পর বেশীর ভাগ রোগীই ভালো হয়ে যায়। কিন্তু কিছু কিছু রোগীর হয়ত ভালো হতে দেরী হয় অথবা সঠিক চিকিত্সা হয় না। সঠিক চিকিত্সা না হওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় না করার বিষয়টি। তবে একথা অবশ্যই স্বীকার করতে হয় সঠিক ভাবে রোগ নির্ণয় করতে অনেক সময় বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের হিমসিম খেতে হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় দাঁতের ব্যথা। দাঁতের এই ব্যথার কারণ খুজতে দন্ত চিকিত্সকদের প্রায়সই নানা পরীক্ষা-নীরীক্ষার আশ্রয় নিতে হয়। যেমন ধরুন দাঁতের এক ধরনের ব্যথা হয় যার নাম বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন “ট্রাইজিমিনাল নিউরেলজিয়া” এই রোগটি এক ধরণের স্নায়ুর রোগ। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে এই সব রোগ দাঁতের রোগ থেকে না হলেও মনে হতে পারে দাঁত থেকেই হচ্ছে এবং রোগীরাও বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে দন্ত চিকিত্সকের কাছে একটি বা দুটি নির্দিষ্ট দাঁতকেই চিহ্নিত করে দেখিয়ে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে সনাক্ত করা যায় বেশীর ভাগ রোগীরাই এই স্নায়ুর রোগকে দাঁতের রোগ মনে করে বেশ কয়েকটি দাঁত ফেলে দিয়ে সমস্যা আরও বাড়িয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের কাছে আসেন। তবে এখানে বলা প্রয়োজন, এই ট্রাইজিমানাল নিউরেলজিয়াতে একটি বিশেষ ধরণের ওষুধের মাধ্যমে চিকিত্সা দেয়া হয়। আবার ক্ষেত্র বিশেষে নিউরো সার্জন এর সাহায্যে শল্য চিকিত্সাও করা হয়। এক্ষেত্রে দাঁত ফেলে দেয়ার মত কোন প্রয়োজন হয় না। মুখের বিভিন্ন চিকিত্সায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, কয়েকটি ক্ষেত্রে সঠিকভাবে চিকিত্সা দিয়ে রোগীকে ক্লিনিকেল সুস্থ করে তুলে আনতে পারলেও রোগী সুস্থ হয় না। এসব ক্ষেত্রে রোগী মনে করেন তিনি এখনও পরিপূর্ণভাবে সুস্থ নন। উদাহরণস্বরূপ মুখের ঘা সম্পর্কে অনেক রোগীদেরই কিছু কিছু ভীতি কাজ করে। তারা মনে করেন মুখের ঘা হলেই ক্যান্সার হয়েছে বা হতে যাচ্ছে। ফলে তাদের মধ্যে এক ধরণের ক্যান্সার ভীতি কাজ করে। এই সমস্ত রোগীদের বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় “ক্যান্সার ফবিয়া” অর্থাত্ ক্যান্সার ভীতি। সাধারণত: এই ধরণের রোগীদের মুখের ঘা বা ক্ষত সৃষ্টি হয় কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণে। এই কারণ গুলির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- ধারালো দাঁতের ঘর্ষণ, কৃত্রিম দাঁতের অমসৃণ, ভিটামিন স্বল্পতা ইত্যাদি। সুনির্দ্দিষ্ট কারণ গুলোকে সঠিকভাবে চিকিত্সা দিয়ে সুস্থ করা গেলেও কিছু কিছু রোগী মনে করে থাকেন এখনও তাদের মুখের সেই ঘা বিদ্যমান আছে। সেইসাথে তিনি সবসময়ই এই সম্পর্ক নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করেন। দুঃচিন্তার কারণ হচ্ছে তিনি ধরেই নিয়েছেন তার ক্যান্সার হয়েছে। এই সমস্ত রোগীদের ইতিহাস নিলে জানা যায় তারা তাদের কোনো আত্মীয়স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবকে মুখের ঘা থেকে ক্যান্সার হয়ে যাওয়ার কারণে মৃত্যু দেখেছেন অথবা কারও কাছে এমন ধরণের কথা বা গল্প শুনেছেন। সেই ভীতি থেকেই তারাও ভাবেন তাদের এই মুখের ঘা হয়ত ক্যান্সারই হতে যাচ্ছে বা হয়েছে। এ ধরণের রোগীদেরকে প্রথমত বিশেষজ্ঞরা সাধারণত: আস্বস্ত করেন, দ্বিতীয়ত তাদের ঘা বা ক্ষত স্থানের পরীক্ষা নীরীক্ষা করে নিশ্চিত করেন যে এই ঘা সম্পূর্ণভাবে বেনাইন বা সাধারণ ঘা, যা অল্প কিছু চিকিত্সাতেই ভালো হয়ে যাবে। তৃতীয়ত: কিছু কিছু ঘা যেহেতু কারণ দুরিকরণের পরেও শুকাতে সময় লাগে। সেহেতু ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করতে বলা ও চতুর্থত: হচ্ছে নিয়মিতভাবে বা মাসে ১ বার ঘা এর স্বাস্থ্যটা পরীক্ষা করা। তবে রোগীর কাছে সব ধরনের চিকিত্সা ও অস্বস্থিকর অবস্থা যখন ব্যর্থ হয় তখন তার উদ্ব্বিগ্ন অবস্থা থেকে মুক্ত করার জন্য বা তাকে সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মত আবার ফিরিয়ে আনার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়। কারণ রোগীর এই দুঃশ্চিন্তা অনেক সময় তাকে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন করে তুলতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেছে যে, এই সমস্ত রোগীর শুধু এই একটি মাত্র চিন্তা মাথায় নিয়ে বসে থাকতে থাকতে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের দন্ত বিশেষজ্ঞরা এই সমস্ত রোগীদের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা সাইকিয়াট্রিকট এর কাছে রেফার করে থাকেন। লক্ষ্য করা গেছে এই সমস্ত রোগীর সঠিক সময়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে না পাঠালে, স্থায়ীভাবে মানসিক রোগীতে পরিণত হয়। এখানে বলা প্রয়োজন, গবেষণায় দেখা গেছে যে সমস্ত রোগীদের এই ধরণের ক্যান্সার ফরিয়া রয়েছে তদের কে সঠিক সময় মনোরোগ চিকিত্সকের কাছে রেফার করার কারণে অতি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন, এবং মাথা থেকে সব চিন্তা দুর হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা, এই ধরণের রোগীদের প্রথমেই ইতিহাস নেয়া যেমন জরুরী তেমনি চিকিত্সার পাশাপাশি তাকে দ্রুত আরোগ্য পাওয়ার ব্যাপারে আশ্বস্থ করাও জরুরী। তবে সঠিক চিকিত্সা ও আশ্বস্ত করার পরেও যদি রোগী দুঃশ্চিন্তায় থাকেন এবং তার রোগ রয়েছে বা ক্যন্সার হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়ে থাকেন তবে তাদেরকে তাদের পরিবার বা আত্মীয়স্বজনকে বিষয়টি অবহিত করার পর একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে পাঠিয়ে দেয়া প্রয়োজন। কারণ রোগটি যেহেতু সম্পূর্ণভাবেই মানসিক তাই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্যেই তাকে সুস্থ করে তুলতে হবে। তবে সবচেয়ে বড় কথা এই সমস্ত রোগীদের নিয়মিত ফলোআপ চিকিত্সা করা এবং নিশ্চিত হওয়া যে, তার মধ্যে আর সেই দুঃশ্চিন্তা আর নেই এবং তিনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।