সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন সুষম খাদ্যের। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে একজন সুুস্থ মানুষের দৈনিক অন্তত ১১৫ গ্রাম ফল খাওয়া উচিত। ফল খাওয়া নিয়ে এখন মানুষের মধ্যে আতঙ্কের শেষ নেই। ফল খাওয়ার উপকারিতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া সত্ত্বেও অনেকেই বিষ আতঙ্কে ফল খাওয়া তো দূরের কথা, ফল স্পর্শ করতেও ভয় পাচ্ছেন। প্রায় প্রতিটি ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশ্রিত থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ আতঙ্ক ক্রমেই বিস্তার লাভ করছে।
বাজারে মৌসুমি ফলের অভাব নেই। ফল মানুষকে যেমন প্রলুব্ধ করছে, তেমন একইসঙ্গে আতঙ্কিত করেও তুলছে। আম, জাম, লিচু, কলা, পেঁপে, আনারস, কাঁঠাল কিনতে গিয়ে ক্রেতারা সংশয়ে ভুগছেন। আপেল, আঙ্গুর ও নাশপাতিসহ বিদেশি ফলেও মেশানো হচ্ছে নানা ধরনের রাসায়নিক। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরুতে আম ঠিকমতো পাকার কথা নয়। আগাম বর্ষার কারণে পাকার প্রক্রিয়া কিছুটা হলেও বিলম্বিত হওয়ার কথা। কিন্তু রাজধানীতে অনেক আগে থেকেই পাকা আমের আমদানি লক্ষ করা যায়। রাসায়নিক দিয়ে পাকানো এই আম ক্রেতাদের শুধু প্রতারিতই করছে না, তাদের স্বাস্থ্যহানিরও আশঙ্কা সৃষ্টি করছে। প্রভিট, ইডেন, ইথরেল প্রভৃতি রাসায়নিক ব্যবহার করে আমে হলুদ রঙ ধরানো হচ্ছে। রাজধানীর আড়তে রাসায়নিক ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় গাছ থেকে আম পেড়ে তা উত্পাদন এলাকায় কৃত্রিমভাবে পাকিয়ে রাজধানী বা অন্যান্য বিক্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে। লিচুসহ অন্যান্য ফলেও ব্যাপকভাবে রাসায়নিক প্রয়োগ করা হচ্ছে। আমাদের দেশে ক্রেতাদের ফলমূল খাবারে বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রণের ব্যাপারে সতর্ক করার যেন কেউ নেই। মাঝে মাঝে লোক দেখানো কিছু ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ভেজালবিরোধী অভিযানে খুচরা ব্যবসায়ীদের জরিমানার মুখে পড়তে হয়, রাঘব বোয়ালরা থেকে যায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। তাই ভেজালবিরোধী অভিযান ফলমূলে রাসায়নিকের মিশ্রণ বন্ধে ভূমিকা রাখতে পারছে না। সরকারের অনেকটা নিষ্ক্রিয়তার জন্য ফলমূলে বেপরোয়াভাবে রাসায়নিকের মিশ্রণ দেওয়ার সাহস পাচ্ছে অতিলোভী ব্যবসায়ীরা। হাইকোর্ট এক নির্দেশনায় বাজারে রাসায়নিক মেশানো ফল বিক্রি হচ্ছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণের জন্য সরকারকে বললেও এখন পর্যন্ত সে নির্দেশনা কার্যকর হয়নি।
পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফল গাছে থাকা পর্যায় থেকে বিক্রি পর্যন্ত ছয় দফা রাসায়নিক প্রয়োগ হয়। এর ফলে এসব ফল রীতিমতো বিষে পরিণত হয়। মাঠ পর্যায়ে রাসায়নিক মিশ্রণের প্রবণতা রোধে কৃষি অধিদফতর উদ্যোগ নিলেও ফলাফল প্রায় শূন্য। কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক এবং বিপজ্জনক রাসায়নিক স্প্রে করার ঘটনা ঘটলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হলেও তারা এ ব্যাপারে ভূমিকা পালন করতে পারছে না। কৃষি কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই ফলচাষিরা অবাধে কীটনাশক ও রাসায়নিক স্প্রে করে চলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাসায়নিক পদার্থযুক্ত ফল ধীরে ধীরে লিভার ও কিডনি অকেজো করে দিতে পারে। এসব রাসায়নিক হূদযন্ত্র দুর্বল করে দেয়। ব্রেন ন্যুব্জ করে স্মৃতিশক্তিও কমিয়ে দেয়। অস্বাভাবিকভাবে অ্যাসিডিটি বাড়ায়। ফরমালিনযুক্ত খাদ্য নিয়মিত গ্রহণ করলে পাকস্থলী, ফুসফুস ও শ্বাসনালিতে ক্যান্সার এমনকি ব্লাড ক্যান্সারও হতে পারে। জনস্বাস্থ্য স্বভাবতই হুমকির মুখে পড়ছে। জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে ফলমূলসহ খাদ্যপণ্যে রাসায়নিকের ব্যবহার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এ ব্যাপারে গণসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগও নিতে হবে। ফলে রাসায়নিক ব্যবহারকারীকে কেউ ধরিয়ে দিতে পারলে তাকে পুরস্কৃত করা হবে সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের ঘোষণা এলে হয়তো ভেজালকারীদের ধরা সম্ভব হতো।
আমাদের দেশে আইনের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মূলত এই কারণেই অপরাধীরা প্রায়ই পার পেয়ে যাচ্ছে। দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেওয়া হলে ফলে যারা রাসায়নিকের মিশ্রণ দেয় তাদের নিবৃত্ত করা সম্ভব হতো। খুচরা ব্যবসায়ীকে ধরে বা তার কাছ থেকে আটক ফল নষ্ট করে অপরাধীদের মনে ভয় ঢোকানো যাবে না। অপরাধের উেসও ভেজালবিরোধী অভিযানকারীদের হানা দিতে হবে।
আমি বার বার খাদ্যে ভেজাল এবং ফলমূলসহ খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশ্রণের বিরুদ্ধে লিখেছি। ক্রেতাস্বার্থ রক্ষায় প্রচলিত আইন আরো কড়াকড়ি করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছি। জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মসজিদে জুম্মার বয়ানে খাদ্যে ভেজাল ও বিষ মেশানোর ক্ষতিকর বিষয়টি তুলে ধরা উচিত। খাদ্যে ভেজাল মেশানো মানুষ হত্যার শামিল— এটি মানুষকে জানানো উচিত। অস্তিত্বের স্বার্থেই এ বিষয়ে সবাই দায়িত্বশীল এবং অঙ্গীকারবদ্ধ ভূমিকা পালন করবে এমনটিই প্রত্যাশিত।
ঢাকা
