বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানায় গত আট মাসে মর্মান্তিক ঘটনায় ১২শ’র বেশি মানুষের প্রাণহানির পর যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা (জিএসপি) বাতিলের বিষয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত আসতে পারে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রর ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভস কার্যালয় সরকারের অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে পরামর্শ করে তাদের সুপারিশ তুলে ধরেছে। যদিও বাংলাদেশ সরকার জিএসপি সুবিধা বাতিল না করার জন্য ওবামা প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে। গতকাল শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
এদিকে, বাংলাদেশের গার্মেন্ট কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মানোন্নয়নে অনুদান দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শ্রমিকদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কারখানায় আগুন ও ভবন নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে তারা ২৫ লাখ ডলার অনুদান দেবে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে যখন উদ্বেগ বাড়ছে তখনই এ অনুদানের কথা জানালো মার্কিন সরকার।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিলের জন্য ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শ্রম সংগঠন দ্য আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার অ্যান্ড কংগ্রেস অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্গানাইজেশন (এএফএল-সিআইও) প্রথম আবেদন করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সরকার এজন্য ছয় বছর অপেক্ষা করেছে। তাদের ধারণা ছিলো, অব্যাহত হুমকির মুখে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় শ্রম পরিস্থিতি সংস্কারে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু তাজরীন ফ্যাশন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ড ও রানা প্লাজা ধসে ১২শ’র বেশি শ্রমিকের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। এএফএল-সিআইওএ’র বাণিজ্য বিষয়ক প্রধান সেলেস্ট ড্রেইক বলেন, এসব ঘটনার কারণে ওবামা প্রশাসন বাংলাদেশকে দেয়া বাণিজ্যিক সুবিধা বাতিল বা হ্রাস করতে পারে। ১৯৮০ সালে শ্রমিক অধিকার রক্ষার বিষয়টি মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৩টি দেশের জিএসপি সুবিধা আংশিক কিংবা পুরোপুরি বাতিল হয়েছে। তবে অনেক দেশই শ্রমিক অধিকার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করেছে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১২৫ দেশের সঙ্গে বাংলাদেশও পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে জিএসপি সুবিধা ভোগ করে থাকে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্যে এ সুবিধা প্রদান করা হয়। ১৯৭৬ সালে জিএসপি সুবিধা চালুর পর থেকে বাংলাদেশ এ সুবিধা ভোগ করে আসছে। তবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এই সুবিধার আওতাভুক্ত নয়। ড্রেইক বলেন, জিএসপি সুবিধা বাতিল করা হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
গ্লোবাল ওয়ার্কস ফাউন্ডেশনের বাণিজ্য বিষয়ক বিশ্লেষক এড গ্রেসার জানান, গত বছর বাংলাদেশ সাড়ে তিন কোটি টাকা মূল্যের তাঁবু, গলফ খেলার সরঞ্জাম, প্লেট যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি করেছে। এর ওপর জিএসপি সুবিধা অনুযায়ী ২০ লাখ ডলার শুল্ক ছাড় পেয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর দ্য সাউথ এশিয়া স্টাডিজের সহযোগী পরিচালক সঞ্চিতা সাক্সেনা বলেন, বাংলাদেশি পণ্যের ক্ষেত্রে জিএসপি-সুবিধা প্রত্যাহার করে নিলেও তা দেশটির তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের কোনো সহায়তায় আসবে না। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই পরিস্থিতির উন্নয়ন চায় তাহলে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড কর্তৃপক্ষ ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো এসব পোশাক কারখানায় নজরদারি বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। এছাড়া বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নে ইউরোপীয় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর চুক্তির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুক্ত হওয়া উচিত।
অনুদানের বিষয়ে মার্কিন শ্রম মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি কয়েক মাসে বাংলাদেশ সরকার, শিল্প, শ্রমিক ও সুশীল সমাজ এবং আরো কিছু সংগঠন কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ও ভবন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মন্ত্রণালয়ের ব্যুরো অফ ইন্টারন্যাশনাল লেবার এফেয়ার্সের মাধ্যমে এ অর্থ ছাড় করা হবে।
এদিকে, গত বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে পোশাক নেয়া মার্কিন কোম্পানিগুলো কাজের পরিবেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখবে বলে আশা করে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র জেন পাসাকি এক প্রশ্নের উত্তরে এ কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে কর্ম-পরিবেশ ও পরিস্থিতির উন্নতিতে সহায়তার জন্য কোম্পানিগুলো ও সরকারের সঙ্গে কিভাবে কাজ করা যায়, তা নিয়ে সরকার ও আমাদের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে বাংলাদেশে ইউরোপীয় অনেক কোম্পানি আগুন ও ভবন বিষয়ক নিরাপত্তা চুক্তিতে সই করলেও মার্কিন কোম্পানিগুলোর এতে স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা নেই বলে জানান তিনি।
