গতকাল শুক্রবার থমথমে পরিস্থিতি ছিল বরিশালে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে নির্বাচনী প্রচারণার ডামাডোল থেমে যাওয়ার পর নগরীর সর্বত্রই যেন সুনসান নীরবতা। বুধবার রাতে বিএনপি’র মেয়র প্রার্থী আহসান হাবিব কামালের সমর্থকদের উপর পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনা হঠাত্ করে এখানকার নির্বাচনী হাওয়ায় যে উত্তাপ সৃষ্টি করেছিলো তা পরে আর বিস্তৃত না হওয়ায় সকল পক্ষই আছেন মোটামুটি স্বস্তিতে। প্রচারণা শুরুর পর থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো অপ্রত্যাশিত বা বৈরী ঘটনা এখানকার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দেখা যায়নি। চমত্কার এক সহনশীল পরিবেশে চলতে থাকা বরিশালের নির্বাচনী মাঠকে পুলিশের অতি উত্সাহী আচরণে অস্থিতিশীল করে তোলার কোনো অপরিচিত পক্ষের নীলনকশা যেন ব্যর্থ হয়ে গেলো বরিশালবাসীর ধৈর্যের ফলে। বুধবারের গুলিবর্ষণের পেছনে কি অসত্ উদ্দেশ্য ছিলো তা না খুঁজেই বলা যায় দু’জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থেকে শুরু করে তাদের নেতা-কর্মী-সমর্থক তথা ভোটারদের সহনশীল মনোভাব সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এবং বরিশালবাসীকে একটি অজানা দুঃসময়ের আশংকা থেকে রক্ষা করল। যদিও আক্রান্ত মেয়র প্রার্থী আহসান হাবিব কামাল ও তার অনুসারীরা মৃদু প্রতিবাদের মধ্যে নিজেদের সীমিত রেখেছিলেন রাতে তাত্ক্ষণিকভাবে মিডিয়ায় এবং পরদিন দুপুরে রাজপথে শান্তিপূর্ণ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে। বিকালে মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরন সংবাদ সম্মেলন করে গুলিবর্ষণের ঘটনাটিকে নাটক বলে আখ্যায়িত করেছেন। যদিও কামালের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গুলিবর্ষণের ঘটনাটি ছিলো নির্বাচনী পরিবেশকে এক ধরনের সহিংসতার অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করার কূটকৌশল। আহসান হাবিব কামালের নির্বাচনী প্রচারণা কমিটির মিডিয়া উইংয়ের প্রধান এডভোকেট মজিবর রহমান নান্টু বলেন, ধৈর্য ও ঠাণ্ডা মাথায় তারা ঐ ঘটনা ও তার পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তার ধারণা, কোনো বিশেষ মহল গুলিবর্ষণের উস্কানিমূলক ঘটনা ঘটিয়ে কামালের কর্মী- সমর্থকদের সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে এক নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চেয়েছিলো।
মহাজোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরন বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে গুলিবর্ষণের ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত ও তার প্রতিপক্ষের প্রধান নির্বাচনী সমন্বয়কারী মজিবর রহমান সরোয়ার এমপি’র সাজানো নাটক বলে আখ্যায়িত করেছেন।
শুরু থেকে পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশে চলা বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার শেষ পর্যায়ে মেয়র প্রার্থী আহসান হাবিব কামালের দেহরক্ষী পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার ঘটনায় ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক শঙ্কার সৃষ্টি হয়। পুলিশের এহেন অতি উত্সাহী আচরণের কারণে ভোটাররা আজকের ভোট গ্রহণের দিনটিকে মোটেই নিরুপদ্রব ভাবছেন না। নিরাপদে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট প্রদান করে সহি সালামতে ঘরে ফিরতে পারবেন কিনা, সে ব্যাপারে গতকাল শুক্রবার নগরীর অনেকের মাঝেই একধরনের সংশয়-সন্দেহ বিরাজ করছিলো। আবার নগরবাসীর একাংশ বুধবারের গুলিবর্ষণের ঘটনাটিকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই মনে করছেন। এদিকে বিএনপি’র সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়েছে, র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা যুবদল-ছাত্রদলের বিভিন্ন নেতা-কর্মীর বাসায় বৃহস্পতিবার রাতে তল্লাশি অভিযানের নামে তাদের হয়রানি করেছে, ভয়ভীতি দেখিয়েছে। যাকে নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ নস্যাত্ করার চক্রান্ত বলে বিএনপি নেতারা মন্তব্য করেছেন। ‘বিএনপির ভোট ব্যাংক’ বরিশাল মহানগরের ভোটাররা জাতীয় রাজনীতির ঘটনাবলীর কারণে প্রভাবিত হয়ে তাদের দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আহসান হাবিব কামালকেই ভোট দেবেন বলে তার সমর্থকদের দৃঢ় বিশ্বাস।
পক্ষান্তরে ভোটের সরল সমীকরণ বদলে ফেলে স্থানীয় ইস্যুকে ভিত্তি করে ব্যক্তিগত ইমেজ বলে মহাজোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরন যদি বিএনপি’র ভোট ব্যাংকে হানা দিতে পারেন তাহলে অনেকটাই বদলে যাবে বরিশালে মেয়র নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ।
অর্ধলক্ষাধিক রিজার্ভ ভোটের দাবিদার শওকত হোসেন হিরন প্রায় সোয়া ২ লাখ ভোটের মধ্যে জয়ী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ভোট সংগ্রহে সচেষ্ট আজকের ভোট গ্রহণের ক্ষণটি পর্যন্ত। আর হিরনের এই কাঙ্ক্ষিত ভোট লাভের ‘টাগ অব ওয়ার’ এবং সনাতনী হিসাবে দলীয় ভোট ব্যাংক অটুট রেখে নির্বাচিত হতে কামালের প্রাণপণ চেষ্টার টানাটানিতে বরিশাল মহানগরবাসীর মধ্যে গতকালও বিরাজ করছিলো থমথমে অবস্থা। যার অবসান হবে আজ বিকাল ৪টার পর থেকে।
