চার সিটিতেই বিএনপি বিজয়ী

আপডেট : ১৫ জুন ২০১৩, ২৩:২০
চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনেই বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। রাজশাহীতে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, খুলনায় মনিরুজ্জামান মনি, বরিশালে আহসান হাবিব কামাল এবং সিলেটে আরিফুল হক চৌধুরীকে বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। ২০০৮ সালের ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এই চারটি সিটিতেই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা মেয়র পদে বিজয়ী হয়েছিলেন। নির্বাচনে সরকার সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় প্রত্যাবর্তনের শ্লোগান দেয়া হয়েছিল কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের সমর্থকরা নির্বাচনী প্রচারণায় পরিবর্তনের যে আওয়াজ তুলে ছিলেন ভোটাররা তার পক্ষেই গণরায় দিয়েছেন। প্রতিটি সিটিতেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে বিজয়ী প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ছিল বিশাল। বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এমপি ও ড. আব্দুল মঈন খান এ বিজয়কে জনগণের বিজয় বলে অভিহিত করেছেন। তারা বলেছেন, এ বিজয় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে বেগবান করবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, এ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে এ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। গতকাল শনিবার চার সিটিতে একযোগে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক ঘোষিত বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী খুলনার ২৮৮টি ভোট কেন্দ্রের সবকটি কেন্দ্রের প্রাপ্ত ফলাফলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী মো. মনিরুজ্জামান মনি (আনারস প্রতীক) ১ লাখ ৮০ হাজার ৯৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক (তালা প্রতীক) পেয়েছেন ১ লাখ ১৯ হাজার ৪২২ ভোট। দুই জনের ভোটের ব্যবধান ৬০ হাজার ৬৭১। জাতীয় পার্টি সমর্থিত প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মধু (দোয়াত-কলম) তিন হাজার ৭৬ ভোট পেয়েছেন। রাত পৌনে ২টায় খুলনার রিটার্নিং অফিসার মোস্তফা ফারুক এ ফলাফল ঘোষণা করেন। খুলনা সিটির ৩১টি ওয়ার্ডে মোট ভোটার চার লাখ ৪০ হাজার ৫৬৯। এর মধ্যে পুরুষ দুই লাখ ২৪ হাজার ৫০৪ ও নারী দুই লাখ ১৬ হাজার ৬২। রাজশাহীর মোট ১৩৭টি ভোট কেন্দ্রের প্রাপ্ত ফলাফলে ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী মো. মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল (আনারস) ১ লাখ ৩১ হাজার ৫৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১৪ দলীয় জোট সমর্থিত খায়রুজ্জামান লিটন (তালা) পেয়েছেন ৮৩ হাজার ৭২৬ ভোট। দুই জনের ভোটের ব্যবধান ৪৭ হাজার ৩৩২। গতকাল রাত দেড়টায় রাজশাহীর রিটার্নিং অফিসার সুভাষ চন্দ্র সরকার এ ফলাফল ঘোষণা করেন। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ডে মোট ভোটারের সংখ্যা দুই লাখ ৮৬ হাজার ৯১৭। এর মধ্যে পুরুষ এক লাখ ৪৩ হাজার ৩৯৫ ও নারী এক লাখ ৪৩ হাজার ৫২২। গতকাল রাত সোয়া ১২টায় বরিশালে রিটার্নিং অফিসার মো. মজিবুর রহমান নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা করেন। বরিশালের মোট ১০০টি ভোট কেন্দ্রের ঘোষিত ফলাফলে ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী আহসান হাবিব কামাল (আনারস) ৮৩ হাজার ৭৫১ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১৪ দলীয় জোট সমর্থিত শওকত হোসেন হিরন (টেলিভিশন) পেয়েছেন ৬৬ হাজার ৭৪১ ভোট। দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ১৭ হাজার ১০। অপর প্রার্থী মাহমুদুল হক খান (দোয়াত-কলম) পেয়েছেন এক হাজার ৮০৭ ভোট। বরিশাল সিটির ৩০টি ওয়ার্ডে মোট ভোটার দুই লাখ ১১ হাজার ২৫৭। এর মধ্যে পুরুষ এক লাখ সাত হাজার ৬২৫ ও নারী এক লাখ তিন হাজার ৬৩২। এর মধ্যে ভোট প্রদান করে এক লাখ ৫৫ হাজার ১২৬ জন। ভোট প্রদানের হার ৭৩ দশমিক ৫ ভাগ। রাত সাড়ে ১১টায় সিলেটের রিটার্নিং অফিসার এজাহারুল হক নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা করেন। তবে সব কেন্দ্রের ফলাফল আসার পরও রিটার্নিং অফিসার আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করতে বিলম্ব করায় বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শমসের মবিন চৌধুরীর নেতৃত্বে দলটির নেতা-কর্মীরা দ্রুত ফল ঘোষণর জন্য দাবি জানান। উত্তেজিত কর্মীরা ফলাফল ঘোষণা কেন্দ্র ঘেরাও এবং সন্নিহিত সড়ক অবরোধ করেন। এক র্যায়ে রিটার্নিং অফিসার আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করেন। ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী ১২৮টির সবকটি কেন্দ্রের প্রাপ্ত ফলাফলে ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী (টেলিভিশন) ১ লাখ সাত হাজার ৩৩০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১৪ দলীয় জোট সমর্থিত বদরউদ্দিন আহমদ কামরান (আনারস) পেয়েছেন ৭২ হাজার ১৭৩ ভোট। সালাহ উদ্দিন (তালা) পেয়েছেন এক হাজার ২২ ভোট। আরিফুল এবং কামরানের ভোটের ব্যবধান ৩৫ হাজার ১৫৭। সিলেট সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডে মোট ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ৯১ হাজার ৪৬। এর মধ্যে পুরুষ এক লাখ ৫৭ হাজার ১৮১ এবং নারী ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৬৫। এর মধ্যে ভোট প্রদান করে এক লাখ ৮০ হাজার ২৫ জন। ভোট প্রদানের হার ৬২ ভাগ। এদিকে চার সিটিতেই বিএনপি সমর্থকরা রিটার্নিং অফিসারের অফিসের সামনে অবস্থান নেয়। খুলনার খালিশপুর থানার কাশিপুরে বিএনপির নির্বাচনী কার্যালয় ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। রাজশাহীতে লক্ষ্মীপুর মোড়ে খায়রুজ্জামানের সমর্থকরা ফলাফল বাতিলের দাবিতে মিছিল বের করলে র্যাব লাঠি চার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। খায়রুজ্জামান লিটন দলীয় কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে ফলাফল নিয়ে ‘মিডিয়া ক্যু’র অভিযোগ করেছেন। সিলেটে পরাজিত প্রার্থী বদরউদ্দিন কামরান নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে বিজয়ী আরিফুল হক চৌধুরীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বরিশালে বিএনপির প্রার্থী আহসান হাবিব কামাল বলেছেন, আমার কর্মীদের উপর হামলা না হলে এবং ভীতি না ছড়ানো হলে আরো বড় ব্যবধানে জয়ী হতাম। বরিশালে রাতে বিএনপির নেতা-কর্মীরা শহরজুড়ে আনন্দ-উল্লাস করেন। তাদের কয়েক হাজার কর্মী চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। ফলাফল নিয়েও রাজনীতি সকাল থেকেই নির্বাচনে ভোট গ্রহণে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ করে যাচ্ছিল বিএনপি। দুপুরে বিএনপির একটি সংসদীয় প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনে দেখা করে এ সংক্রান্ত লিখিত অভিযোগ দাখিল করে। এতে বরিশালে ১৮টি কেন্দ্রে আহসান হাবিব কামালের এজেন্টদের ভোট কেন্দ্র থেকে জোর করে বের করে দেয়ার অভিযোগ ছিল। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকেও সাংবাদিক সম্মেলন করে একই ধরনের অভিযোগ করা হয়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, পরাজিত হবে জেনেই মিথ্যাচার ও অপপ্রচার চালাচ্ছে বিএনপি। ক্ষমতাসীনদের জন্য ভোটারদের বার্তা ২০০৮ সালের নির্বাচনে খুলনায় আওয়ামী লীগের তালুকদার আবদুল খালেক ১ লাখ ৫৭ হাজার ৮১২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মনিরুজ্জামান মনি পান ১ লাখ ৩১ হাজার ৯৭৬ ভোট। রাজশাহীতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন ৯৮ হাজার ৩৬০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল পেয়েছিলেন ৭৪ হাজার ৫৫০ ভোট। বরিশালে আওয়ামী লীগের শওকত হোসেন হিরন ৪৬ হাজার ৭৯৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার বিপরীতে সরফুদ্দিন আহমদ ঝন্টু পান ৪৬ হাজার ২০৮ ভোট। সিলেটের বদরউদ্দিন আহমদ কামরান জেলখানায় থেকে ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৩৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার অপর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সমর্থিত এ এফ এম কামাল পান ৩২ হাজার ৯৭ ভোট এবং এম এ হক ২৩ হাজার ৪৮৭ ভোট পেয়েছিলেন। এবার হেরে যাওয়া আওয়ামী লীগের চার মেয়র প্রার্থীই গতবার বিজয়ী হয়েছিলেন। এই চার প্রার্থী হেরে যাওয়া মানে শুধু প্রত্যেকের ব্যক্তিগত পরাজয় নয়। এই পরাজয় রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন জোটের কাছে দেশের চারটি বড় শহরের ভোটারদের একটি বার্তাও।