বাবার জন্যই আজ আমি এতদূর

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৩, ২০:২৮
ফাহমিদা মাহবুব। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজমে মাস্টার্স শেষ করে পেশাগতভাবে যুক্ত হয়েছেন সাংবাদিকতায়। একুশে টিভি’র ‘দেশ জুড়ে’ প্রোগ্রামের সংবাদকর্মী হিসেবে শুরু। তারপর, দৈনিক ‘আজকের কাগজ’ হয়ে ইন্টারন্যাশনাল টেলিভিশন চ্যানেল-এনটিভি’তে এখন আছে আন্তর্জাতিক ডেস্কের প্রধান হিসেবে। পেশাগত কাজে বা সে কাজের দক্ষতা ভারি করতে ঘুরেছেন দেশে-বিদেশে। গিয়েছেন দ:কোরিয়া, আমেরিকা। ভ্রমণ করেছেন-নাসা, বিবিসি, সিএনএন অফিস। জানছেন প্রতিক্ষণ, জানাচ্ছেন প্রতিদিন। নিষ্ঠা আর নীতির সাথে আপোষহীন কাজ করে যাচ্ছেন একনিষ্ঠভাবে। অথচ এই সাংবাদিকতায়ই পড়ার কথা ছিল না ফাহমিদার! এইচএসসি পাস করার পর যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিবেন তখন পরিবারের সবাই চাচ্ছিলেন, ফাহমিদা পড়ুক ইংরেজি অথবা অর্থনীতিতে। কেবল বাবা ড. এস এম মাহবুব-উল হক মজুমদারই চাচ্ছিলেন তার কন্যা পড়ুক সাংবাদিকতায়। কন্যাও বাবাভক্ত। নিজের ইচ্ছা আর বাবার মনোবলে সবার পীড়াপীড়িকে উপেক্ষা করে বাবার মতকে দিয়েছেন প্রাধান্য। বাবা সম্পর্কে বলতে গিয়ে ফাহমিদা বলেন, ‘আমার বাবার জন্যই আমি ফাহমিদা, আজকের ফাহমিদা। আমার পেছনে আমার বাবার প্রেরণা অনস্বীকার্য।’ সততা সাহস মনোবল শ্রমের যে শক্তি তা ফাহমিদা পেয়েছেন বাবার কাছ থেকে। বাবা যেমন আপোষ করেননি অনৈতিকতার সাথে ফাহমিদাও জানেন না অনৈতিকতার রূপ কি। নৈতিকতার সাত রঙ মিশেল করে কাজ করেন সবসময়, অন্যায়কে দমন করার চেষ্টা করেন লেখনির মাধ্যমে। ফাহমিদা আবারো বলেন, ‘আমার মধ্যে যে সাহস, সততা, কষ্টকে সহ্য করার ধৈর্য তা আমি আমার বাবার কাছ থেকেই পেয়েছি।’ নিজের সংসার সন্তান হয়েছে। আলাদা একটা গন্ডি হয়েছে চলাচলের। পেশাগত কর্মব্যস্ততা আছে তবু আজও ছিন্ন বা সামান্যতম দূরত্ব বাড়েনি বাবার সাথে, বাবার স্নেহ-মমতার কোমল ছায়া থেকে। এখনো বাবার সাথে প্রায় প্রতিদিন অন্তত একবার মুঠোফোনে কথা হয়, দেখা হলে বেশ জমে ওঠে আড্ডা। বাবা আর কন্যার মধ্যে এখনো এক সরল বন্ধুসুলভ সম্পর্ক। বাবা এখনো উপদেশ দেন পথ চলতে, এখনো শাসন করেন ভুল দেখলে, উত্সাহ দেন ভালো কাজে। ‘বাবা আমাকে সাহস দিয়েছেন বলেই আমি অনেক না পারা কাজ অনায়াসে করতে পেরেছি, এখনো পারি। আমার বাবা আমার সাহসের জায়গা। আমার অনেক না পারা কাজের পরামর্শের জায়গা।’ জানিয়ে ফাহমিদা বাবার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘বাবা, তুমি আমার জীবন অভিধান, তোমাকে ভালোবাসি।’ ‘সানোফি এভেন্টিস’ ফার্মাসিউটিক্যালস’র কমিউনিকেশন ম্যানেজার ফারহানা তোফায়েল। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইস্ট ওয়েস্ট থেকে ২০০৬ সালে এমবিএ ডিগ্রি নিয়ে প্রথমে শিক্ষকতা দিয়ে শুরু করেন কর্মজীবন। গতিময় সময়ের গতিচক্র পেরিয়ে এখন কর্পোরেট কর্মকর্তা। অফিস করেন নয়টা-ছয়টা। কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি সময় দিতে হয় দায়িত্বের কারণে। ‘ব্যস্ততাই জীবন’ কাজ করে যান নিয়ম ও নীতির সাথে। ধৈর্য হারান না কখনো। সাহস ও মনোবল রাখেন। আর এ সাহসের কৃতিত্ব ফারহানা তোফায়েল এককভাবে দেন তার বাবা ব্রিগে: জেনারেল এ জেড. তোফায়েল আহমেদকে। কেননা, বাবার কাছ থেকেই কাজের প্রেরণা। বাবাই শিখিয়েছেন কেমন করে মানিয়ে নিতে হয়-রক্ষা করতে হয় চারকুল, কেমন করে বুঝে নিতে হয় অনুকূল-প্রতিকূল পরিবেশ। গৃহ থেকে ময়দান কোথাও ফুলেল বিছানা নেই নিজেকেই বিছিয়ে নিতে হয় ফুলেল শয্যা; প্রতিকূলকে করে নিতে হয় অনুকূল। চার বোন তারা। বাবার শিক্ষায়, প্রেরণায় সবাই প্রতিষ্ঠিত স্ব স্ব ক্ষেত্রে। ‘আমার বাবা আমাদেরকে কখনো না বোধক কিছু বলেননি। স্বাধীন মত ও সত্তায় সততার সাথে পথ হাঁটতে সত্ উপদেশ দিয়েছেন সবসময়, ছেলে বা মেয়ে বলে আলাদা করতে শিখাননি কিছু, লিঙ্গান্তর না করে মানুষকে মানুষ হিসেবে জ্ঞাত করে তাদের সাথে চলাচলের জ্ঞান দিয়েছেন। বাবা ছোটবেলা থেকেই শিখিয়েছেন কি করে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। কি করে পরিশ্রমের দখল সামলাতে হয়। বাবা আমাকে মেয়েদের সাথে খেলাধুলা করতে যেমন নিষেধ করতেন না, ছেলেদের সাথেও খেলাধুলা করতে বাধা দিতেন না। আমি সবার সাথেই সমান তালে মিশতাম। সবাইকে আমার মানুষ মনে হতো, ছেলে বা মেয়ে নয়, এখনো ঘরে-বাইরে এর ভিন্ন কিছু আমার মনে হয় না।’ বাবার কাছ থেকে পাওয়া মানসিকতার কথাগুলো ফারহানা তোফায়েল বললেন হাস্যোজ্জ্বল মুখে। ফারহানা তোফায়েল আরো বলেন, ‘বাবা সবসময় আমার পাশে আছেন বলেই আমি আমার উঁচু-নিচু পথগুলো ধৈর্যের সাথে চলার অনুপ্রেরণা পাই। বাবার উত্সাহের কারণেই আমি স্বাভাবিক কাজের চেয়ে অনেক বেশি কাজ করতে পারি। কখনো কোনো কারণে মানসিক বিষাদ এলে বাবা তার স্নেহ-মমতা আর সাহসী সান্ত্বনা দিয়ে আমাকে শক্ত হতে সাহায্য করে বলে আমিও মানসিকভাবে শক্ত হতে পারি। গুছিয়ে নিতে পারি বৈরী বাতাস। আমার বাবা আমার পথ চলার শক্তি। ’ বাবাই তার সেরা বন্ধু। বাবা মেয়ের এই বন্ধুত্বতাই হয়তো একজন সফল কন্যার জন্য শ্রেষ্ঠ পাওয়া, শ্রেষ্ঠ প্রেরণা। ত্যাহনিয়াত আহমেদ করিম (আনিতা)। ১৯৯১ সালে সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নেয়ার পর ‘ইউএসএ’ থেকে করেছেন সার্টিফিকেট কোর্স। মানব সম্পদ উন্নয়ন বিষয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েটে হয়েছেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম আর পেয়েছেন গোল্ড মেডেল। পেশায় এসে ট্রেনিং নিয়েছেন কানাডা, জার্মানী, ইন্ডিয়াতে। যোগ দিয়েছেন সিঙ্গাপুর, ব্যাংককসহ বেশ কয়েকটি দেশের বিভিন্ন কর্মশালায়। কাজ করেছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ পদবীতে। প্যান প্যাসিফিক সোনার গাঁ হোটেলে পাবলিক রিলেশন ম্যানেজারের পদ দিয়ে শুরু -১৯৯১ইং। মাঝখানে ‘ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেটেড পপুলেশন এন্ড হেল্থ প্রোগ্রাম’-এ কো-অর্ডিনেশন ম্যানেজার, ‘আইসিডিডিআরবি’তে কো-অর্ডিনেশন ম্যানেজার, ‘স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে সাপোর্ট ম্যানেজার থেকে সিইও, সর্বশেষ ব্র্যাক ব্যাংকে হেড অব মানব সম্পদ উন্নয়ন’ পদে কৃতিত্বের সাথে কাজ করেছেন। অসুস্থতার কারণে সাময়িক বিশ্রামে থাকলেও আনিতা পাড়ি দিয়েছেন দীর্ঘ কর্মব্যস্ত পথ। যেতে চান আরো সামনে। তার এ ব্যস্ততা এ সাফল্যের পেছনে তিনি মনে করেন তার বাবার অনুপ্রেরণা, সহযোগিতা, পাশে থাকার ভূমিকা সর্বাগ্রে। বাবার কথা বলতে গিয়ে আনিতা বলেন, ‘বাবা আমাকে হেরে যেতে শিখাননি। তিনি বলতেন, যতবার হেরে যাবে ততবার তুমি জয়ের জন্য প্রস্তুত হবে, প্রস্তুত হতে হতে তুমি জয়ী হবে। আমি বাবার কথা অনুসরণ করেছি এবং হেরে না গিয়েও জয়ী হয়েছি।’ পরিবারে অন্য সদস্যরা থাকলেও আনিতা বাবার কাছ থেকেই পেয়েছেন মানসিক মনোশক্তি। পেয়েছেন পড়াশোনায় মনোযোগ আর কাজের প্রেরণা। আনিতা বলেন, ‘মেয়ে বলে বাবা কখনো কোনো কিছু চাপিয়ে দিতেন না বা কোনো কিছুতে অসহযোগিতা করতেন না। তার কাছে ছেলে বা মেয়ে নয় পেয়েছি সন্তানের স্নেহ। সামাজিকতার পুরনো কাঠামোর ধ্যান-ধারণায় বড় না করে সতত আধুনিকতার নিয়ম-কানুনে নিয়ম-নীতি শিখিয়েছেন আমার বাবা।’ ভালো-মন্দে সব সময় কাছে পাওয়া মুক্তিযোদ্ধা বাবা তাহের উদ্দিন আহমেদের মুখে সে সময়ের সাহসী নানা ঘটনার কথা শুনতে শুনতে তাই আনিতাও হয়েছেন বাবার মতোই সাহসী। সত্ কাজে পিছপা হন না সহসা। সাধ্যের মধ্যে অপরকে সাহায্য-সহযোগিতার মানসিকতাও পেয়েছেন বাবার সংস্পর্শেই। মুক্তিযোদ্ধা বাবার দেশপ্রেম রয়েছে তার মধ্যেও। নিজের অবস্থান থেকে নিজের যা সাধ্য তাই দিয়ে অনিতা পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছেন নিজ বাড়ির পরিচায়িকার নাতি-নাতনিকে। পড়াশোনা করাচ্ছেন, তার দাদার কবরের রক্ষণারেক্ষণকারী রবিউলকে। আনিতা বলতে চান,‘‘ আমার বাবা আমার পাশে আছেন বলেই হয়তো আমার দ্বারা আমাকে আমার মতো হওয়া সম্ভব হয়েছে, আমি পারছি এতকিছু করতে। আমি আমার বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ।’ বাবা অসুস্থ। একটু পর বাবাকে দেখতে যাবেন বলে ত্যাহনিয়াত আহমেদ (আনিতা) কথা শেষ করতে চান; বাবার সুস্থতা কামনা করে আমরাও শেষ করি। ‘পৃথিবীর সব সন্তানের কাছেই হয়তো তার বাবা সেরা। আমার কাছেও তার ভিন্নতা নয়। কিন্তু আমি আমার বাবাকে দেখি অন্যভাবে। বাবাকে একজন বাবা, বাবাকে একজন মানুষ, বাবাকে একজন পুরুষ —এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে আমি মনে করি আমার বাবা প্রথমত, মানুষ হিসেবে একজন উত্তম মানুষ। দ্বিতীয়ত, আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় আমার বাবা এই তান্ত্রিকতা বৃত্তের বাইরে একজন অন্যরকম পুরুষ। যিনি তার কন্যাকে যেমন বানিয়ে দিয়েছেন নাচের কস্টিউম, এনে দিয়েছেন পায়ের ঘুঙ্গুর তেমনি তিনি তার স্ত্রীকে কিনে দিয়েছেন হারমোনিয়াম, তবলা, নাচের জন্য রেখে দিয়েছিলেন শিক্ষক। এটা বিরল। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় অধিকাংশ পুরুষই তার নিজ স্ত্রীকে করতে চান বোতলবন্দি আর কন্যাকে দিতে চান রাজ্যের শৌখিনতা। তারা ভুলে যান, যে স্ত্রী সেও তো কন্যা ছিল কারো না কারো; তারও তো ছিল কিছু না কিছু শখ। আবার যে কন্যাকে তারা শৌখিন শখে রাঙাতে চান তারাও একদিন কারো না কারো স্ত্রী হবে। তখন কি দাঁড়াবে? আমার বাবা সে জায়গাটাতে মহত্। তাই আমার বাবাকে আমার মনে হয় তিনি অন্যরকম পুরুষ, অন্য রকম বাবা। আর এই অন্যরকমটাই আমার চলার পথের প্রধান পুঁজি, আমার সাহস, আমার শক্তি, আমার সেই ‘সকাল সন্ধ্যা’ নাটক থেকে এতদূর আসা। কথাগুলো বলছিলেন অভিনেত্রী অপি করিম। বুয়েট থেকে স্থাপত্য বিদ্যায় নিয়েছেন উচ্চতর ডিগ্রী, শিখেছেন নাচ, দাপটের সাথে কাঁপিয়েছেন মঞ্চ, অভিনয় করছেন কৃতিত্বের সাথে। মাঝখানে বিভুঁই জার্মানী থেকেও নিয়ে এসেছেন একাডেমিক ডিগ্রী। অভিনয়ের পাশাপাশি শিক্ষকতা করছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। চতুর জ্ঞানে পারদর্শী এই কন্যাটি তার ‘বহুমাত্রিক প্রতিভার জন্য কৃতজ্ঞ থাকতে চান তার বাবার কাছে। বলতে চান, ‘‘আমার বাবা কোনোদিন আমার উপর তার মতামত বা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেননি, আমাকে দিয়েছেন আমার মতের স্বাধীনতা। ছোটবেলা থেকেই তিনি লক্ষ করতেন, আমার দ্বারা কি করার ইচ্ছা প্রবল; সে দিকেই তিনি আমাকে চলার উত্সাহ দিতেন, দিয়েছেন বলেই আমি অপি করিম হতে পেরেছি।’ মা অবশ্য চাইতেন মেয়ে তার ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা সচরাচর যে সব পেশার প্রতি সব বাবা-মায়ের খেয়াল থাকে সে রকম হউক কিন্তু বাবা আগে লক্ষ্য করেছেন তার মধ্যে প্রতিভাটা কি! কি করতে সে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। একদিন খেয়াল করলেন মেয়ে তার নাচে ভালো। বাবা আর বিলম্ব না করে মেয়েকে নিয়ে গেলেন নাচের স্কুলে। এভাবেই সতত পথে যখন যা করতে চেয়েছেন তখন তাই করতে বাবা পাশে দাঁড়িয়েছেন ছায়া হয়ে, সাথে থেকেছেন মমতার হাত ধরে। ভালোবাসায়, স্নেহে, আদরে, শাসনে বাবাই নিয়ে এসেছেন অনেক ক্লান্তির পথ পাড়ি দিয়ে সাফল্যের এ দ্বারে। বাবার প্রতি অপির ভালোবাসাও তাই অন্যরকম।