তিস্তার বুক জুড়ে কৃষকের কান্না

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৩, ২২:৫৬
যত দূর চোখ যায় ধু-ধু বালুচর। ফাঁকে ফাঁকে শীর্ণ জলধারা। দূরে কাশবনের সারি, গাছের রেখা দেখা যায়। মাঝে বিস্তীর্ণ ফাঁকা অংশটার নাম নদী। নাম তার তিস্তা। পঞ্জিকার হিসাবে বর্ষাকাল শুরু হয়েছে দুইদিন আগে। তিস্তা নদীর বুকে এখনও গ্রীষ্মের রুদ্র জ্বালাময়ী রূপ। ভারত থেকে তিস্তার জলধারা বাংলাদেশের ঝাড় সিংহেশ্বর গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবেশ করেছে। সেখানে দাঁড়িয়ে নদীর এ রূপ দেখলে সীমাহীন হতাশার জন্ম দেয়। এ গ্রামের অশীতিপর বৃদ্ধ তোফাজ্জল বললেন, ‘তিস্তার বুকেই সারাজীবন কাটালাম। ভাগ্য ফিরলো না। বন্যায় ভাসি, বাড়ি-ঘর ভেঙে নদী নিয়ে যায়। গ্রীষ্মে খটখটে নদী। চাষের সময় পানি মেলে না।’ খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের দোলপাড়া গ্রামের কৃষক জামাল মন্ডল বললেন, গেল বছর ভালো পানি ছিল নদীতে। বৃষ্টিও ছিল, সেজন্য পানিও ছিল। সেচের পানি কিছুটা হলেও পাওয়া গেছে। এর আগের কয়েক বছর পানি খুবই কম। সেচের পানি মেলে নাই। গ্রীষ্মকালে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে তিস্তা নদী এ অঞ্চলের মানুষের কাছে এক সীমাহীন দুর্ভোগের নাম। অনেক সম্ভাবনা আর প্রত্যাশায় নির্মিত তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পও মুখ থুবড়ে পড়েছে। কৃষকের ভাগ্য ফেরেনি। পানির অভাবে আউশের আবাদ করতে পারছেন না তারা। নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা উপজেলা, লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গ্রীষ্মে তিস্তা নদীতে কোন পানি প্রবাহই থাকে না। নদীর বেশিরভাগ অংশই শুকনো থাকে। হালকা সরু নালার মত কিছুটা পানি আসে। সেটা নদীর ধারা নয়। তিস্তা ব্যারেজের প্রধান সেচ ক্যানেলগুলো শুকনো খটখটে। সৈয়দপুর, নীলফামারী, দিনাজপুরে পানি প্রেরণের প্রধান সেচ ক্যানেলে গিয়ে দেখা গেল পানি নেই। যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিভিশনের প্রকৌশলীরা বললেন, গত বছর গ্রীষ্মে পানি এসেছে গড়ে ৩ হাজার কিউসেক। আর এর আগের বছরগুলোতে সর্বোচ্চ ২৫০০ কিউসেক থেকে সর্বনিম্ন ২০০ কিউসেক পর্যন্ত। কিন্তু কৃষকের কথার সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রদত্ত পানির হিসাব মেলে না। ঝাড় সিংহেশ্বর গ্রামের শাহ্ আলম বললেন, বন্যা যখন হয় তখন পরিবার নিয়ে বাঁধে থাকি। গরু-ছাগল রাখাই দায় হয়ে পড়ে। আর গরমকালে আবাদের জন্য পানি মিলে না। জীবনভর এই দেখলাম। এ দিন আর কবে বদলাবে? শাহ্ আলমের প্রশ্নের জবাব দেয়া যায় নাই। বর্ষায় বিপুল স্রোতস্বিনী এই নদীর ডালিয়া পয়েন্ট থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত প্রায় ৬৫ কিলোমিটার তিস্তার বুক জুড়ে এখন ধু-ধু বালুচর। ফাল্গুনেই শুকিয়ে যায় তিস্তার পানি। কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও বা কয়েক ইঞ্চি। বর্তমানে তিস্তা নদী দিয়ে মালবোঝাই নৌকা তো দূরের কথা, খালি ছোট নৌকা চলাচল করার মতো পানিও নেই। চলতি মৌসুমে তিস্তার বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য চর জেগে উঠায় স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার ডালিয়া ও দোয়ানীতে নির্মিত তিস্তা ব্যারেজের মাধ্যমে কৃষি জমিতে সেচ দেয়ার ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে যে সম্ভাবনা নিয়ে তিস্তা ব্যারেজসহ প্রকল্পটি নির্মাণ করা হয়েছিল তা একেবারেই অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ওয়ারপোর সাবেক মহাপরিচালক ম. ইনামুল হক বললেন, গ্রীষ্মে তিস্তায় পানি না থাকায় কৃষকরা যেমন নিদারুণভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি কৃষকদের সেচ সুবিধা দিতে গিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অগভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূ-গর্ভের পানির ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। ফলে তিস্তার মত এত বৃহত্ একটা সেচ প্রকল্প থাকার পরও পানির অভাবে বাংলাদেশের কৃষকরা ফসল উত্পাদন করতে পারছে না। আবার ভূ-গর্ভের পানি ব্যবহার করে পরিবেশগত ক্ষতির মুখোমুখীও হতে হচ্ছে দেশকে। তিস্তার পানির স্বাভাবিক প্রবাহ থাকলে বাংলাদেশের কৃষক এই ক্ষতি, সীমাহীন আশঙ্কার মুখে পড়তো না। এ বছরও পানির অভাবে বৃহত্তর রংপুর জেলার ২৫টি উপজেলায় জমির ফসল এখন হুমকির মুখে পড়েছে। প্রয়োজনীয় সেচের অভাবে ফসল উত্পাদন ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পরিবেশ ও নৌ-যোগাযোগ ক্ষেত্রে পড়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহার করায় গ্রীষ্মে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৭৭ সালে সরকার দেশে সেচ সুবিধার জন্য তিস্তা নদীতে ব্যারেজ, হেড রেগুলেটর ও ক্লোজার ড্যাম তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করে। নব্বই দশকে এরশাদ সরকারের আমলে এ সেচ প্রকল্প নির্মাণ শেষ হয়। ১৯২৮ সালে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা প্রথম গ্রহণ করা হয়েছিল বলে পানি উন্নয়ন বোর্ডসূত্রে জানা গেছে। তিস্তা ব্যারেজের প্রথম ধাপেই ভারত জলপাইগুড়ি জেলার গজালডোবা নামক স্থানে ৯২১ দশমিক ৫৩ মিটার দীর্ঘ ব্যারেজ নির্মাণ করে। এ ব্যারেজের মাধ্যমে ভারত তিস্তার ৮০ শতাংশ পানি প্রত্যাহার করে তিস্তা-মহানন্দা ক্যানেলের মাধ্যমে জলপাইগুড়ি জেলা, দার্জিলিং, পশ্চিম ও উত্তর দিনাজপুর মালদহ ও কোচবিহার জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে সেচ প্রদান করছে। অবশিষ্ট ২০ শতাংশ পানি ভারত ভাটিতে ছাড়লেও ৬৩ কিমি. পথ অতিক্রম করে এ সে াতধারা দোয়ানীতে ব্যারেজ এলাকায় একেবারেই ক্ষীণ হয়ে যায়। ফলে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণের পরও কৃষকের কোন উপকারেই আসছে না।