আওয়ামী লীগের বিপর্যয়ের নেপথ্যে

আপডেট : ১৭ জুন ২০১৩, ১৮:০৫
চার সিটি নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। কিন্তু কেন এই বিপর্যয়? দেশজুড়ে গতকাল আলোচনার বিষয় ছিল সেটি। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, বিশ্লেষক, গবেষক সকল শ্রেণীর মানুষ নানাভাবে বিশ্লেষণ করেছেন এই ফল। অনেকেই বলেছেন, এই পরাজয় সরকার দলীয় প্রার্থীদের নয়, এটি ক্ষমতাসীন দলের প্রতি জনগণের হতাশা ও অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ এবং সরকারের জন্য সতর্কবার্তা। সমাজ বিশ্লেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেছেন, জনগণ জানিয়ে দিয়েছে, সরকার সঠিক পথে নেই। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলীয়করণ করা হয়েছে। স্থানীয় উন্নয়নের চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাই ভোটারদের কাছে প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। শনিবার গভীর রাতে চার সিটি নির্বাচনে ফলাফল প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। রাজশাহীতে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, খুলনায় মনিরুজ্জামান মনি, বরিশালে আহসান হাবিব কামাল এবং সিলেটে আরিফুল হক চৌধুরীকে বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এরা সকলেই বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী। প্রত্যেকেই বিপুল ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ নেতৃতাধীন ১৪ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থীদের হারিয়েছেন। ২০০৮ সালের ৪ আগস্টে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এই চার সিটিতেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছিলেন। ঐ নির্বাচনে বিজয়ী চার মেয়রই এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরেছেন। এদের মধ্যে বরিশালের শওকত হোসেন হিরন, রাজশাহীর খায়রুজ্জামান লিটন এবং খুলনার তালুকদার আবদুল খালেক নিজ এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। উন্নয়নের ক্ষেত্রে সিলেটের বদর উদ্দিন কামরান তাদের তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও ঈর্ষণীয় ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ছিল তার। শওকত হোসেন হিরনকে বলা হয়, উন্নয়নের রূপকার। তিনি বরিশাল শহরকে বদলিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এসব কোনো কাজে আসেনি ভোটে। রাজনীতি বিশ্লেষকরা একবাক্যেই বলছেন, প্রার্থীদের চেয়ে ভোটাররা সরকারের ভূমিকাকে বড় করে দেখেছেন। ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে জনগণ পরাজিত প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ইমেজ ও কৃতিত্ব বা স্বাতন্ত্র্যবোধকে যতটা বিবেচনায় নিয়েছেন, তারচেয়ে বেশি বিবেচ্য ছিল তারা সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থী। ব্যক্তিগতভাবে এটি প্রার্থীদের পরাজয় নয়, বরং সরকারের শেয়ার বাজারে ধস, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারের বাড়াবাড়ি, যুবলীগের ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি- বিশ্বজিত হত্যাকাণ্ড, বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের অসহিষ্ণু আচরণ, বিরোধী দলকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, বিজয়ের ব্যাপারে সরকারি দলের অতি আত্মবিশ্বাস, সুশাসনের অভাব, সরকারি দলের নেতাদের আক্রমণাত্মক বক্তব্য, সংযম ও সমঝোতার রাজনীতির অভাব এবং সর্বোপরি রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজত ইসলামের উপর সরকারের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানসহ বিভিন্ন ঘটনায় জনগণ হতাশ হয়ে এই গণরায় দিয়েছে। এছাড়া বিরোধী দলের জোটভুক্ত সকল দল ও স্থানীয় নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধভাবে ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থীদের মোকাবেলা করেছেন। সরকারি দলের অভ্যন্তরে ছিল অনৈক্য, দ্বন্দ্ব ও কলহ। শেয়ার বাজারে ধস :শেয়ার বাজার কারসাজিতে প্রায় ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। কিন্তু শেয়ার কেলেংকারির হোতাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়নি সরকার। বরং বিষয়টি ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। পদ্মাসেতুতে দুর্নীতি :পদ্মাসেতু নিয়ে মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাস তৈরি করেছিল এ সরকার। বিশেষ করে বরিশাল ও খুলনার মানুষ এই সেতুর মাধ্যমে অনেক বেশি উপকৃত হত। কিন্তু দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা জনগণকে ক্ষুব্ধ করেছে। এ নিয়ে সরকার প্রধানের বক্তব্যকেও ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেনি জনগণ। বিরোধী দলের প্রতি 'অসহিষ্ণু আচরণ' : ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর এই সরকার বলেছিল, বিরোধীদলকে সংখ্যানুপাতে বিচার করা হবে না। বিরোধী দলের প্রাপ্য মর্যাদা বজায় রাখা হবে। ডেপুটি স্পিকারও বিরোধী দল থেকে মনোনীত করার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কার্যত বিরোধী দলকে দমনের নীতি অবলম্বন করেছিল সরকার। বিরোধী দলের হাজার হাজার কর্মীকে মামলার জালে ফেলে রাখা হয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতাদেরও জামিন ও কারামুক্ত করার ব্যাপারে হেনস্থা করা হচ্ছে। সভা-সমাবেশের উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সরকারের এই অসহিষ্ণু আচরণ জনগণ ভালোভাবে নিচ্ছে না। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মকাণ্ড :বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে সরকারের নেতিবাচক ভাবমূর্তি সৃষ্টি হয়। যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নাম ব্যবহার করে এক শ্রেণীর তরুণ চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে, পুরান ঢাকায় বিশ্বজিত হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য দেশের মানুষকে দারুণভাবে ব্যথিত করেছে। হেফাজতে ইসলামের উপর অভিযান:মতিঝিলে শাপলা চত্বরে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে হতাহতের ঘটনায় বিভ্রান্তি রয়েছে দেশজুড়ে। যে প্রক্রিয়ায় অভিযান চালানো হয়েছে বিশেষ করে মাদ্রাসা শিক্ষক-ছাত্রদের কান ধরে ঘটনাস্থল থেকে বের করে দেয়ার ঘটনায় একশ্রেণির ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। নির্বাচনের প্রচারণার সময়ও হেফাজতের ইস্যুটি ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর ঐক্য, সরকারি দলে অনৈক্য:বিরোধী দলের উপর সরকারের দমন-নিপীড়ন দলগুলোর অস্তিত্ব হুমকির মুখে ফেলে দেয়। কোণঠাসা বিরোধী দল নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ হয়। বিশেষ করে বরিশাল এবং সিলেটে দীর্ঘদিনের শত্রুতা ভুলে পরস্পর বিরোধী শিবির এক কাতারে দাঁড়িয়ে যায়। নির্বাচনে বিএনপি সমর্থকদের ভোট+জামায়াত ইসলামের ভোট+হেফাজতে ইসলামের ভোট+দোদুল্যমান ভোটারদের ভোট এবং আওয়ামী বিরোধী অন্যান্য ভোটের সমষ্টিগত ফলের প্রকাশ ঘটেছে এ নির্বাচনে। বিরোধী দলগুলোর এ ঐক্যের বিপরীতে সরকারি দলগুলোর মধ্যে ছিল ব্যাপক অনৈক্য। রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে বিএনপি প্রার্থীকে সমর্থন দেন। বরিশাল এবং খুলনায়ও আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে অনৈক্য ছিল। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ:ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, ক্ষমতাসীন দল তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেনি। জনগণের সমস্যা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সমাধান করতে পারেনি। অনেক নেতারই ক্ষমতার অপব্যবহার জনগণকে বিরক্ত এবং ক্ষুব্ধ করেছে। তাই সার্বিক বিবেচনায় জনগণ বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীকে বেছে নিয়েছে। জনগণ এক্ষেত্রে এটাও বুঝে, নতুন করে যাদের নির্বাচিত করল, তাদের থেকেও খুব ইতিবাচক কিছু পাওয়া যাবে না। পরিবর্তনের অভ্যাস থেকেই তারা সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের কম ভোট দিয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ এবং মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ-প্রচারণা সারাদেশেই ধর্মভীরু জনগণ এবং অসাম্প্রদায়িক জনগণের মধ্যে একটি ব্যবধানের দাগ কেটেছে। সিলেটসহ বেশ কয়েকটি স্থানে ধর্মভীরু জনগণ হেফাজতের প্রচারণায় প্রভাবিত হয়েছেন। সিলেটে ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনা এবং রাজশাহীতে নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন সময়ে গ্যাস সংযোগ সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক ও বিকল্পধারার রাজনীতিক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ক্ষমতাসীনরা অনেক গর্ব-দম্ভ দেখিয়েছে। তাই জনগণ পরিবর্তনের সুযোগ নিয়েছে। এ নির্বাচন স্থানীয় সরকারের হলেও জাতীয় ইস্যুগুলোই প্রাধান্য পেয়েছে। তাই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত হেভিওয়েট ও ভালো ইমেজের হলেও হেরেছে। তিনি বলেন, এ সরকারের সাড়ে চার বছর জনগণের পছন্দ হয়নি, চার সিটি নির্বাচনে তারা সেই রায়ই দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. ফেরদৌস হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের যে ঝোঁক ছিল এখন সেটি আওয়ামী বিরোধিতায় পরিণত হয়েছে। নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে আওয়ামী লীগ প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে। কেননা অন্য কেউ প্রার্থী হলে ভোটের ব্যবধান আরো বাড়ত। সাধারণ মানুষের মতামত:ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র তাঈসীর জাহান বলেন, বাংলাদেশের জনগণ অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি পছন্দ করে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকার অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করেছে। রাজশাহী মহানগরের বাসিন্দা কর্মজীবী নারী খাদিজা পারভীন বলেন, কোনো দলই জনগণের মনের ভাষা বোঝে না। বোঝার চেষ্টাও করে না। ক্ষমতা পেয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করে। জনগণের মঙ্গলের চেয়ে নিজের আখের গোছাতেই ব্যস্ত থাকে। একদিন যাদের থাকার জায়গা ছিল না, তাদের গাড়ি-বাড়ি, জায়গা-জমি এবং বিলাস-বৈভবে ভরপুর হয়ে যায়। নদী-খাল দখল, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যসহ হেন কোনো কাজ নেই যার মধ্যে সরকারি দলের নেতারা থাকেন না। এ বিষয়টি সব সরকারের আমলেই আমরা দেখছি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হরি নারায়ণ বলেন, 'দেশের ভোটাররা কাউকে দেশের ক্ষমতা চিরদিনের জন্য দেন না। কিন্তু ক্ষমতা যে চিরস্থায়ী নয়, এটি কেউ মনে রাখে না।'