টার্গেট এখন গাজীপুর

আপডেট : ১৭ জুন ২০১৩, ২১:১৪
চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ের সুসংবাদে গাজীপুরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা উজ্জীবিত হয়ে নির্বাচনী মাঠে নামছেন। তাদের মধ্যে বিরাজ করছে ব্যাপক উত্সাহ-উদ্দীপনা। অপরদিকে চার সিটির ফলাফলে গাজীপুর সিটি ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী ও তাদের দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। গত রবিবার উচ্চ আদালত আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীর আলমের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করায় ১৪ দলের হতাশা আরো ঘনিভূত হয়ে উঠছে। আগামী ৬ জুলাই অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১০ লাখ ২৬ হাজার ভোটারের নবগঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। গাজীপুর বিএনপিতে বর্তমানে কোন দ্বন্দ্ব না থাকায় দলটি বিজয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। সিটি নির্বাচনে দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক এমএ মান্নান ও দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, সাবেক এমপি ও সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ্ব হাসান উদ্দিন সরকার মেয়র পদে দলীয় সমর্থন চেয়েছিলেন। প্রথমে দুজনেই পৃথক পৃথকভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও দল যাকে সমর্থন দেবে তার পক্ষেই তারা কাজ করার ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন। ফলে অধ্যাপক এমএ মান্নান দলীয় সমর্থন পাওয়ার পর হাসান উদ্দিন সরকার ও তার সমর্থকরা কোন বিদ্রোহ বা অসহযোগিতা না করে অধ্যাপক মান্নানকে সমর্থন দেন। এতে দলের হাইকমান্ড হাসান উদ্দিন সরকারকে আগামী সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-২ আসন থেকে মনোনয়নের নিশ্চয়তা দেয়ায় হাসান-মান্নান ঐক্য আরো সুদৃঢ় হয়েছে। বর্তমানে হাসান উদ্দিন সরকার ও তার সমর্থকরা আন্তরিকতার সাথেই অধ্যাপক এমএ মান্নানের পক্ষে কাজ করছেন। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ১৮ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর প্রধান সমন্বয়কারী আলহাজ্ব হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, ১৪ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান বিগত ১৭ বছর ধরে একটানা টঙ্গী পৌরসভার চেয়ারম্যান বা মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে টঙ্গীতে উন্নয়নের নামে যে দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে এবারের সিটি নির্বাচনে জনগণ ভোটের মাধ্যমে তার সমুচিত জবাব দেবে। তিনি বলেন, এ সরকারের বিগত সাড়ে চার বছরে বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষের উপর যে অত্যাচার-নির্যাতন, দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে জনগণ ইতিমধ্যেই ভোটের মাধ্যমে এর জবাব দিতে শুরু করেছে এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও ১৮ দলীয় প্রার্থী বিজয়ী হবে বলে তিনি আশাবাদী। এদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ও সম্মিলিত নাগরিক কমিটির আলোচিত প্রার্থী গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আলমের প্রার্থিতা গত রবিবার বৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট। জাহাঙ্গীরের মনোনয়নপত্র বৈধ হওয়াতে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন নতুন মোড় নিল। গাজীপুরকে সিটি করপোরেশন ঘোষণার পর তফসিল ঘোষণার অনেক আগে থেকেই নিজেকে নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা দিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালান এক সময়ের তুখোড় ছাত্র নেতা, ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম। এ লক্ষ্যে তিনি স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করেন। কিন্তু নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হন। মেয়র পদে আওয়ামী লীগ তথা ১৪ দলীয় সমর্থন লাভ করেন টঙ্গী পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান। এ কারণে সম্মিলিত নাগরিক কমিটির ব্যানারে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থী হিসেবে জাহাঙ্গীর আলম নিজের মনোনয়নপত্র জমা দেন। এ লক্ষ্যে তিনি গত ২ মে সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পদত্যাগপত্র জমা দেন। রিটার্নিং অফিসার মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের প্রথম দিনে গত ৯ জুন জাহাঙ্গীরের মনোনয়নপত্র স্থগিত করে ১০ জুন বিকাল ৪টার মধ্যে পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে মর্মে যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নপত্র জমা দেয়ার জন্য তাকে নির্দেশনা দেন। কিন্তু উক্ত সময়ের মধ্যে কোন প্রত্যয়নপত্র দাখিল করতে না পারার কারণে রিটার্ণিং অফিসার ১০ জুন তার মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করেন। পরে জাহাঙ্গীর আলম গত ১২ জুন ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কমিশনারের নিকট আপীল করেও তা ফেরত নিয়ে হাইকোর্টে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপীল করেন। জাহাঙ্গীরের প্রার্থিতা বাতিলের পর দুই বৃহত্ জোটের সমর্থন নিয়ে দুই হেভিওয়েট প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অধ্যাপক এমএ মান্নান মাঠে সরব থাকলেও সকলের দৃষ্টিনিবদ্ধ ছিল আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ও আলোচিত প্রার্থী মো. জাহাঙ্গীর আলমের আপীলের ফলাফলের দিকে। গতকাল তার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করার খবর গাজীপুরে ছড়িয়ে পড়লে জাহাঙ্গীরের সমর্থকদের মধ্যে উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে ও তাদের মাঝে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়। জাহাঙ্গীরের প্রার্থিতা ফিরে পাবার ফলে ক্ষমতাসীন জোটের ভোটের হিসাব-নিকাশ পাল্টে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে এ নির্বাচনে ত্রিমুখী লড়াই জমে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে সমর্থন দিয়েছিল অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খানকে। কিন্তু বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে সম্মিলিত নাগরিক কমিটির ব্যানারে জাহাঙ্গীর আলম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফিরে আসায় আওয়ামী লীগের মধ্যে অনেকটা বিভাজন তৈরি হয়েছে। দলীয় হাইকমান্ড জাহাঙ্গীর আলমকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য রাজি করাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। জাহাঙ্গীর নির্বাচনী লড়াইয়ে নিজের প্রার্থিতার ব্যাপারে অনড় থাকায় দলের নেতা-কর্মীরা অনেকেই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়েছেন। প্রধান দুই দলের উল্লেখিত দুই প্রার্থী এবং বিদ্রোহী প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম ছাড়াও মেয়র পদে বৈধ প্রার্থী ছিলেন আরও ৫ জন। এরা হলেন, জাতীয় পার্টির (এ) জেলার সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) কাজী মাহমুদ হাসান, মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম দলের জেলা আহবায়ক মেজবাহ উদ্দিন সরকার রুবেল, ইসলামী ফোরামের মাওলানা ফজলুর রহমান ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আমান উল্লাহ এবং রীনা সুলতানা । এরমধ্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) কাজী মাহমুদ ও মাওলানা ফজলুর রহমান গতকাল সোমবার তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় মেয়র পদে মোট প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এখন ৬ জনে।