এগার জুন প্রায় বার ঘণ্টা আকাশপথে যাত্রা শেষে ঢাকা থেকে মস্কো এসে যখন হাজির হলাম, তখন বিকাল ছয়টা বাজে। ঘড়ির সময় অনুযায়ী বিকাল। কিন্তু মস্কোর সূর্য তখনো প্রায় মাঝ আকাশে। বলা চলে মাঝ আকাশ থেকে মাত্রই পশ্চিমে হেলতে শুরু করেছে। এখানে এখন গ্রীষ্মকাল। ফলে এপ্রিলের পর থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত গ্রীষ্মকালে সূর্য ওঠে ভোর চারটায়। আর ডুবে প্রায় এগারটার দিকে। শীতকালে এর ঠিক উল্টো। সূর্য ওঠে বেলা প্রায় এগারটায়, ডুবে তিনটার দিকে। আর মস্কোর সঙ্গে ঢাকার সময় পার্থক্য মাত্র দুই ঘণ্টা। মস্কোর সময় ঢাকার চেয়ে দুই ঘণ্টা পিছানো। কিন্তু উত্তর মেরুর প্রায় কাছাকাছি হওয়াতে বাংলাদেশের তুলনায় সূর্যের এমন উল্টোপাল্টা আচরণ। মস্কো দোমোদেদোভো এয়ারপোর্ট থেকে যখন বের হলাম মনে হচ্ছিল ঘুমিয়ে নিতে পারলে মন্দ হতো না। এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়ার আগেই ইতির মামাতো ভাই চয়নের সঙ্গে দেখা। এলব্রুস পর্বতে প্রথম বাংলাদেশ-রাশিয়া মৈত্রী অভিযানের অভিযাত্রী নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারী, ইতি এবং আমি - তিনজন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। কারণ বিদেশ-বিভুঁইয়ে একজন পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা মানেই কষ্ট প্রায় অর্ধেক কমে যাওয়া।
চয়ন আমাদেরকে বাসে ও ট্যাক্সিতে করে লুভলিনোতে তার বাসায় নিয়ে গেলেন। সেখানে তার রুশ সহধর্মিণীর বাসায় গিয়ে উঠলাম। মস্কোয় বসবাসরত আরও ক’জন বাংলাদেশি বেদেনখায় তাদের কর্মস্থলে যাওয়ার অনুরোধ করলেন। কিন্তু ক্লান্তি তখন এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে, দুই চোখের পাতা ক্রমাগত এক হয়ে পড়তে চাইছে। কারণও আছে। মস্কোর হিসাবে তখনও সন্ধ্যা নামি নামি করলেও বাংলাদেশের হিসাবে তখন রাত প্রায় একটা। তাই একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে সামান্য বাজার-সদাই সেরে ফেরার পর গরম গরম মুরগি-ভাত-ডাল ইত্যাদি খেয়ে সোজা বিছানায় নিজেকে ছেড়ে দিয়েছি।
পরদিন সকালে নাশতা করেই সবাই বের হয়ে পড়েছি সকাল সাড়ে দশটার মধ্যে। মস্কোর চারদিকে সুউচ্চ ভবন। কিন্তু কোথাও মনে হয় না যে কোনো তাল বা সুর কেটেছে। সবকিছু সাজানো-গোছানো। আবাসিক ভবনগুলোর চারদিকে পরিকল্পনামাফিক গাছের প্রাচুর্য, রয়েছে প্রয়োজনীয় পার্কিং এরিয়া এবং অবশ্যই বাচ্চাদের খেলার পার্ক। সবকিছুতেই নিখুঁত স্থাপত্য। অলিগলি সব জায়গায়ই নিপাট ছকে সাজানো। সবকিছুই সুশৃঙ্খল।
একটা ব্যাপার লক্ষণীয়- এখানে ফ্লাইওভার আর আন্ডারপাস দিয়ে বড় সড়কগুলোতে সব ধরনের ক্রসিং দূর করা হয়েছে। এখানে সাবলীল রাস্তাঘাটে যেন গাড়ির মেলা। সবাই লেন মেনে চলছে। কেউই অস্থির হয়ে পড়ছেন না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, কোনো অযথা হর্ন বাজানোর শব্দ কানে আসছে না। বাসযাত্রীরা সবাই নির্দিষ্ট স্থানে অপেক্ষা করছেন এবং বাস এলে নিয়মমাফিক উঠে পড়ছেন। মস্কোয় আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো রেলও বেশ জনপ্রিয়। গেলাম স্পোর্টসমাস্টার নামে একটি শপিং সেন্টারে। আরও কয়েকটি শপিং মলে ঘুরে পর্বতারোহণের সরঞ্জাম খোঁজা হলো। পানির ফ্লাস্ক, অতিবেগুনি রশ্মি প্রতিহতকারী রোদচশমা, ম্যাট্রেস ইত্যাদি পাওয়া গেল। আমাদের যাত্রার তথ্য কাবারডিনো বলকারিয়া রিপাবলিকের ক্রীড়া ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আরসেন ঝিনভকে জানিয়ে দেয়া হলো।
