স্থানীয় কিংবা জাতীয় পর্যায়ের আর কোনো নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করবে না নির্বাচন কমিশন। সদ্য অনুষ্ঠিত রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে ইভিএম নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় কমিশন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জটিলতার কারণে রাজশাহীর একটি কেন্দ্রের ফল এখনও প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এর আগে কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এবং নরসিংদী পৌরসভা নির্বাচনেও ইভিএম ব্যবহার করা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে আগামী ২০ জুন কালিগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গতকাল বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আপত্তি উপেক্ষা করে বিগত কমিশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথম চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ইভিএম ব্যবহার নিয়ে ছিল নানা জটিলতা। কমিশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইভিএম ব্যবহারে ত্রুটি, যান্ত্রিক সমস্যা, ব্যয়বহুল, জনবলের অভাবসহ বেশকিছু অভ্যন্তরীণ জটিলতা দেখা দেয়। আইনগত জটিলতাও ছিল। সনাতনী পদ্ধতিতে ব্যালট পেপার কিছুকালের জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হত। নির্বাচন নিয়ে কোনো মামলা হলে ট্রাইব্যুনালে সংরক্ষিত ব্যালট পেপার মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসাবে বিবেচিত হত। কিন্তু ইভিএমে কোনো ব্যালট পেপার থাকে না। তাছাড়া এই পদ্ধতিতে প্রিজাইডিং এবং পোলিং অফিসারকে বশ করে এক ব্যক্তির একাধিক ভোট দেয়া সম্ভব। বিরোধী দল থেকে এ ব্যাপারে ‘ডিজিটাল কারচুপির’ আশংকাও প্রকাশ করা হয়েছিল। পৃথিবীর বহু দেশ ইভিএম ব্যবহার করে পরবর্তীতে জটিলতার মুখোমুখি হয়ে এ পদ্ধতি থেকে সরে আসে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বর্তমান নির্বাচন কমিশন ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইভিএমে ত্রুটির কারণে রাজশাহী সিটির ৮ নং ওয়ার্ডের টিচার্স ট্রেনিং কলেজ কেন্দ্রের কাউন্সিলর প্রার্থীর ফলাফল স্থগিত রেখেছে কমিশন। এর আগে ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হলেও যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। নরসিংদী পৌরসভার উপ-নির্বাচনেও জটিলতা সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কারিগরি সহযোগিতায় ২০১০ সালের জুন মাসে প্রথম বিগত নির্বাচন কমিশন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে সীমিত পরিসরে ইভিএম ব্যবহার করেছিল। চট্টগ্রামে ইভিএম ব্যবহার নিয়েও মামলা হয়েছে। মামলার কারণে সেই ইভিএম মেশিন এখনো চট্টগ্রামে পড়ে রয়েছে। সেই সময় ১৩০টি ইভিএম উচ্চমূল্যে কিনতে হয়েছিল। পরে বুয়েটের সহায়তায় আরও ৪শ’ ইভিএম তৈরি করা হয়। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের জন্যও বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) সহযোগিতায় আরো ৭শ’ ইভিএম তৈরি করা হয়। ইভিএম ক্রয়ে কমিশনকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।
বড় পরিসরে ইভিএম ব্যবহার করা হয় কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে। সবকটি কেন্দ্র ইভিএম ব্যবহার করে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে ফলাফল ঘোষণার মাধ্যমে চমক সৃষ্টি করে কমিশন। কিন্তু ওই নির্বাচনে ইভিএমে ত্রুটি ধরা পড়লেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দুই মেয়র প্রার্থীর ব্যবধান বেশি হওয়ায় সেটি নিয়ে আর ঝামেলা হয়নি। আইনে না থাকলেও ২০১২ সালে অবৈধভাবে বিগত নির্বাচন কমিশন নরসিংদী পৌরসভার উপ-নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করেছিল। পরবর্তীতে পৌরসভায় ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহার বিধিমালা করা হয়। বর্তমান কমিশনের অধীনে রংপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনেও সীমিত পরিসরে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। কিন্তু রংপুরে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হয় কমিশনকে। সেই সময়ে বুয়েট ও ইসির মধ্যে আর্থিক টানাপোড়েন শুরু হয়।
এছাড়া ইভিএমের মালিকানা নিয়েও দেখা দেয় জটিলতা। বুয়েট ও ইসির দ্বন্দ্বের মূল বিষয় ছিল ব্যাটারি ব্যবহার নিয়ে। খরচ কম রাখতে কমিশন দেশি ব্যাটারি ব্যবহার করতে চাইলেও বুয়েট চেয়েছিল বিদেশি ব্যাটারি ব্যবহার করতে। এই ইস্যুতে বুয়েটকে বাদ দিয়ে শেষমেষ কমিশন নিজস্ব জনবল দিয়ে রংপুরে ইভিএম ব্যবহার করে। এছাড়াও টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পৌরসভার নির্বাচনেও ইভিএম ব্যবহার করা হয়।
ইভিএম জটিলতা রাজশাহীতেঃ
ইভিএম জটিলতায় রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (রাসিক) নির্বাচনে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদের নির্বাচনী ফলাফল স্থগিত রাখা হয়েছে। ভোট গণনার সময় ৩৯ নম্বর ভোট কেন্দ্রের (টিচার্স ট্রেনিং কলেজ) একটি বুথের ইভিএম বিকল হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে আইনের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকার ফলে সেটি সিলগালা করে রাখা হয়েছে। ওই কেন্দ্রে অথবা বুথে নতুন করে আবারো ভোট হতে পারে বলে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়সূত্রে জানা গেছে। এই ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী ৫ জন। তবে দু’জনের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। ব্যবধানও খুব বেশি নয় বলে জানা গেছে। রিটার্নিং অফিসার সুভাষ চন্দ্র সরকার বলেন, ‘বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে জানানো হয়েছে। কমিশন যে সিদ্ধান্ত দেবে সেটাই বাস্তবায়ন করা হবে।’
