একটা দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর বিয়াল্লিশ বছর পার হওয়া অবশ্যই কম কথা নয়। আমরা পারিনি এ দীর্ঘ সময়ে আত্মকেন্দ্রিকতা আর আত্মবিভেদ ভুলে জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়ে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের তালিকায় নিয়ে যেতে। বাংলাদেশের চেয়ে আয়তনের দিক থেকে অনেক ছোট রাষ্ট্র বর্তমান বিশ্বে নিজেদের মান সমুন্নত রেখেছে। এ প্রসঙ্গে বলা যায়— লুক্সেমবার্গ, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড প্রভৃতি রাষ্ট্র উন্নত আর ধনী দেশের কাতারে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বের সর্বোচ্চ আয়ের দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষ পনেরোটি দেশের মধ্যে ঐ চারটি দেশ অন্তর্ভুক্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো দেশকে পেছনে ফেলেছে লুক্সেমবার্গ, যার মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ ৩৯,৮৫০ মার্কিন ডলার। এর পরেই রয়েছে সুইজারল্যান্ড। অথচ লুক্সেমবার্গের আয়তন মাত্র ২,৫৯০ বর্গকিলোমিটার আর সুইজারল্যান্ডের আয়তন ৪১,২৯৩ বর্গকিলোমিটার।
দেশের জনসংখ্যাকে দক্ষ ও কর্মঠ করে গড়ে তুললে অত্যধিক জনসংখ্যাও জাতীয় অগ্রগতির পথে কোনো অন্তরায় নয়— এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত চীন। আয়তনে ছোট হয়েও যে ধনী দেশে পরিণত হওয়া যায়— সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ড, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া তার প্রমাণ। তাহলে আমাদের সোনার বাংলাদেশের আজ এ চেহারা কেন?
উল্লিখিত দেশগুলো আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশের চেয়ে ছোট হলেও আজ তারা শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। অথচ আমরা জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাহ্য করে মগ্ন দলীয় স্বার্থে কিংবা ব্যক্তি স্বার্থের হীনম্মন্যতায়। দেশের জনসংখ্যাকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করে এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদের সুষ্ঠু, ব্যবহার করার মাধ্যমে জাতীয় অগ্রগতি নিশ্চিত করলে আমাদের সোনার বাংলাদেশের চিত্রটা হয়তো অন্য রকম হতে পারতো। পরিকল্পনামাফিক দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সামগ্রিক উদ্দেশ্য অর্জনের অপরিহার্যতার গুরুত্ব আমাদের কাছে মুখ্য নয়। তা না হলে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত পরিহার করে আমরা দেশের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে, হাতে হাত মিলিয়ে সবাই মিলে কাজ করতে কিংবা ভালো কাজের জন্য প্রতিপক্ষকে অভিনন্দন জানাতে পারতাম। আর সঙ্গত কারণেই আমাদের পশ্চাদগামিতা হয়ে পড়েছে অনিবার্য। এদেশের এক শ্রেণির আমলার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, পক্ষাবলম্বনের অভিযোগ রয়েছে। ঘুষ ছাড়া ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে যায় না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে আবেদনপত্র লাল ফিতায় মাসের পর মাস বন্দি থাকায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও সময় সময় হতাশ হয়। এতে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন সরকারি কাজে কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে উচ্চপদস্থ আমলারা বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কাজ করেন এবং চূড়ান্ত ক্ষমতা তাঁদের হাতে ন্যস্ত থাকায় অনেক সময় দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়ে অযোগ্য লোকদের নিয়োগ দেওয়া হয়। আর দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাবীদেরও থেকে যেতে হচ্ছে বঞ্চিতদের তালিকায়।
এ দেশের মাঠ প্রশাসনে যেসব সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তার অভাব। শহর থেকে পাস করে উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা মাঠ পর্যায়ে মফস্বলে কাজ করতে আগ্রহী নন। কারণ যোগ্য কর্মকর্তাদের জন্য যে পদমর্যাদা, বেতনভাতা, পদোন্নতি, সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন মাঠ প্রশাসন তার ব্যবস্থা করতে সক্ষম নয়। ফলে মাঠ পর্যায়ে দক্ষ কর্মকর্তার অভাব আমাদের পশ্চাদগামী করে তুলছে। এ অবস্থা চলতে থাকায় দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর আনুষঙ্গিক বিভিন্ন কারণে যোগ্য ব্যক্তিদের যোগ্য স্থানে অধিষ্ঠিত করতে না পারায় আমরা দিন দিন পিছিয়েই পড়ছি, ব্যর্থ হচ্ছি উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে। এ সুযোগটাই গ্রহণ করছে বহিরাগত শক্তি। আর এ সুযোগে প্রভাবশালী দেশগুলো আমাদের খাদ্য, পণ্য, প্রকল্পের ওপর বিভিন্ন শর্ত আরোপ করে এক রকম শোষণ অব্যাহত রেখেছে।
বিজাতীয় সংস্কৃতিরও অনুপ্রবেশ ঘটছে। যার সুদূরপ্রসারি প্রভাব পড়ছে আমাদের মন মানসিকতা, চিন্তা-চেতনার ওপর। আমাদের মতো দরিদ্র দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষিতদের প্রশিক্ষণে সহায়তার নামে দেশ থেকে মেধা পাচার করে আমাদের মেধাশূন্য করার পাঁয়তারা চলছে। আজকের মেধাবী ছাত্ররা যারা ভবিষ্যতে দেশকে সুন্দরভাবে পরিচালনা, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শিল্পোন্নত হিসেবে দেশকে গড়ে তোলা এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে তারা বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে সুযোগ-সুবিধার আধিক্যের কারণে সেখানেই থেকে যাচ্ছে। এভাবে আমরা অজান্তেই নিজেদের পায়ে নিজেরা কুড়াল মারছি।
তৃণমূল পর্যায়ের বিভিন্ন অসঙ্গতির কারণে তৃণমূল থেকে ট্যালেন্টরা জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছতে পারছে না। এভাবে আমরা অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে পড়তে পড়তে হয়তো একদিন উপলব্ধি করতে সচেষ্ট হবো যে কতোটা পশ্চাদগামী হয়েছি, তখন শত চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা হবে পণ্ডশ্রম।
ঢাকা
