বর্তমানে বাংলাদেশের সকল কিছুর সঙ্গেই উচ্চারিত হয় ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। কেউ কেউ একে ব্যঙ্গও করেন। তাঁদের কাছে হতাশার নাম ডিজিটাল বাংলাদেশ। কেউ কেউ এমনও বলেন, বাতি জ্বালানোর বিদ্যুত্ যেখানে পাওয়া যায় না সেখানে আবার ডিজিটাল বাংলাদেশ! আবার যেখানে আশাবাদ সেখানেই ডিজিটাল বাংলাদেশ। তরুণদের মধ্যে এই স্বপ্নটা অনেক বড়। সরকারের সকল পর্যায়ে যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা অবিরাম বলতে থাকার ফলে এখন বাংলাদেশের রাজনীতির মধ্যেও সবচেয়ে জনপ্রিয় শব্দটি হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশ। বাণিজ্য ও সমাজ দুদিকে এর প্রভাব তীব্র। এর প্রভাবে মোবাইল অপারেটর কোম্পানির বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করার সুযোগ সংবলিত বিজ্ঞাপনেও ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ সামপ্রতিক কালের আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে একটি।
সাধারণভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে অনেকেই সর্বত্র কম্পিউটার ব্যবহারকে মনে করেন। কিন্তু ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ হচ্ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যবিমোচনসহ সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রযুক্তির লাগসই প্রয়োগের একটি আধুনিক দর্শন। সর্বত্র স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং সর্বোপরি সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ হচ্ছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং দুর্নীতিমুক্ত সুখী সমৃদ্ধ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বাংলাদেশ, যার চালিকাশক্তি হচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। বর্তমান সরকারের রূপকল্প ২০২১ অনুযায়ী ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বলতে বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রসমূহের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং ধ্যান-ধারণার সঙ্গে সঙ্গতি ও সমন্বয় সাধন করে চলার যোগ্যতা অর্জনকে বোঝায়। পুরাতনকে বিদায় দিয়ে নতুনকে স্বাগত জানানো।
‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বলতে যত সহজ মনে হয় আসলে তা বাস্তবায়ন করা তত কঠিন। কিন্তু তাই বলে তা অসম্ভবও নয়। আমাদের দেশের ৮০ ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে। গ্রামের মানুষেরা শহরের মানুষের চেয়ে অনেক কম সুযোগ-সুবিধা পায়। শুধু শহরের নাগরিকদের কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট সুবিধা দিলে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পাবে না। গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে দিতে হবে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সুবিধা। পরিবর্তন করতে হবে গ্রামের জনসাধারণের জীবনযাত্রার মান। নিশ্চিত করতে হবে তাদের স্বাস্থ্যসেবা, ছড়িয়ে দিতে হবে শিক্ষার আলো, উন্নত করতে হবে যোগাযোগের ব্যবস্থা। এ কাজগুলো করতে পারলেই আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।
এছাড়াও বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। তাই উন্নয়ন এবং আর্থ-সামাজিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন কৃষি উন্নয়ন ও বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন কৃষিশিক্ষা, গবেষণা ও সমপ্রসারণ এবং ব্যবহারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। কৃষি উন্নয়ন বলতে বোঝায় দেশের শস্য, পশুসম্পদ, মত্স্যসম্পদ ও বনসম্পদের পরিকল্পিত উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা।
অথচ কৃষিখাতে এখনো মান্ধাতার আমলের কৃষি ও সেচকার্য চলছে। কৃষিখাত সম্মিলিতভাবে যান্ত্রিক যুগে প্রবেশ করতে পারেনি। কৃষিকে যদি ডিজিটাল পর্যায়ে নিয়ে না আসা যায় তাহলে ডিজিটাল শব্দটি স্লোগানধর্মী শব্দ হিসেবেই থেকে যাবে। তৃণমূলে কৃষি, মত্স্য, পশুপালন, বনবিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ে ডিপ্লোমা প্রযুক্তিবিদ পৌঁছাতে পারলে ডিজিটাল কৃষির অগ্রগতি একধাপ এগিয়ে যাবে।
বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সেমিনারে বলেছেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে ঠিকমতো কাজ করছেন না আমলারা। এই আমলাদের দিয়ে বাংলাদেশকে ডিজিটাল করা যাবে না। আমলাদের বেশিরভাগই তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান রাখেন না। এ বিষয়ে তাদের জ্ঞান ভাসা ভাসা। এই ভাসা ভাসা জ্ঞান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই টাইপ করা, কম্পিউটারে গান শোনা বা ছবি দেখার চেয়ে বেশি কিছু নয়।
তথ্যপ্রযুুক্তিতে অজ্ঞ লোক দিয়ে বাংলাদেশকে ডিজিটাল করা যাবে, সরকার এমনটা ভেবে থাকলে বলতে হবে তারা ভুল করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা যথাসময়ে বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে তার পরিকল্পনার সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তিতে জ্ঞানী, দক্ষ, অভিজ্ঞ লোকদের সম্পৃক্ত করতে হবে। এ কাজে সম্পৃক্ত হতে তরুণ যুব সমাজকে বিশেষভাবে শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।
অলস মস্তিস্ক শয়তানের কারখানা। সারাদেশে ৪০-৬০ লাখ এসএসসি পাস যুবক বেকার। অর্ধশিক্ষিত, কর্মহীন যুবকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পথে-ঘাটে, যানবাহনে, পাড়া-মহল্লা, অলিতেগলিতে ইভটিজিং-এ জড়িয়ে পড়ছে। স্কুলজীবনে এইসব তরুণের স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। শিক্ষা সমাপ্তির পর নিজ পরিবার, সমাজ, দেশের জন্য কাজ করবে। আজ তারা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এর জন্য উপনিবেশিক আমলে গড়া কেরানি তৈরির শিক্ষাব্যবস্থা দায়ী। রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। এই দিকনির্দেশনাহীন তরুণদের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রাথমিক ভিত রচনায় হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে হবে।
জ্ঞাননির্ভর এ প্রযুক্তিতে সাফল্য নিশ্চিত করতে হলে জ্ঞান বিতরণ ও সৃষ্টির উত্স শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোই হবে ডিজিটাল বাংলাদেশের কেন্দ্রবিন্দু। স্কুল-কলেজের তরুণ ছাত্রছাত্রীদের ই-গর্ভনমেন্ট, ই-হেলথ, ই-লার্নিংসহ ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার তৈরি, মোবাইল তৈরি, শিপ তৈরি, শিপ চালনা, বিমান তৈরি, বিমান চালনা, সাবমেরিন তৈরি, নিউক্লিয়ার, মহাকাশ প্রযুক্তিবিদ্যায় ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ দিতে হবে। সমাজে অবহেলিত ও বঞ্চিত তরুণদের এইসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে উত্সাহিত করার জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। লাখ লাখ ছাত্র-তরুণের সৃজনশীলতা, মেধা ও দক্ষতা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে ওঠার উপযোগী ক্ষেত্র তৈরি করবে।
চট্টগ্রাম
