পোশাক শিল্পখাত :এখনও হলো না আলাদা মন্ত্রণালয়

আপডেট : ১৮ জুন ২০১৩, ২২:৪৬
দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প চলছে অনেকটা অভিভাবকহীন সন্তানের মতো। বার্ষিক প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয়ের এ খাত দেখভাল করতে নেই আলাদা মন্ত্রণালয় বা সংস্থা। এ খাতে কোনো সমস্যা দেখা দিলে এডহক ভিত্তিতে তা সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ আজও নেয়া হয়নি। পৃথক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার জন্য বিজিএমইএ দীর্ঘদিন ধরে দেনদরবার করলেও বিষয়টি এগোয়নি। বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটলে এ খাতের দুর্বলতাগুলো আলোচনায় আসে। অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধস বা অন্যান্য দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হলে দেশের পাশাপাশি হৈচৈ হয় বিদেশেও। কোনমতে সে ক্ষত সারানোর পর আবারও একই দশা। দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সামগ্রিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে এবং এ খাতের উদ্যোক্তাদের সাথে কথা বলে পোশাক শিল্পের অভিভাকহীনতার কথা উঠে এসেছে। শুরুতে রপ্তানিকারকরা পোশাক তৈরির ক্ষেত্রে বিদেশি কাপড়ের ওপর নির্ভর করলেও এখন আর তা নেই। এ শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশাল বস্ত্রখাত। শুরুর দিকে মাত্র কয়েকটি ডিজাইনের মধ্যে পোশাক শিল্প কেন্দ্রীভূত থাকলেও এখন বাংলাদেশ থেকে হাজারো ডিজাইনের পোশাক রপ্তানি হয়। আবার এ খাতকে কেন্দ্র করে বেশকিছু পশ্চাদসংযোগ শিল্প গড়ে উঠেছে। এ খাতে কাজ করছে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক, যার ৮০ শতাংশের বেশি নারী।পোশাক শিল্পের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, সুশৃংখল ও নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় কারখানা গড়ে তোলার জন্য আলাদা গার্মেন্টস পল্লী প্রতিষ্ঠার দাবি অনেক আগে থেকেই করে আসছেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু এসব দাবির একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। এক সময় তৈরি পোশাক শিল্প মালিকরা সরকারের কাছে ঋণের সুদ মওকুফ, নগদ আর্থিক সহায়তাসহ নানা দাবি করলেও এখন তারা শুধু সরকারের কাছে অবকাঠামো সুবিধা চান। শুরুর ইতিহাস ১৯৭৪ সালের কথা। মাল্টি ফাইবার এরেঞ্জমেন্ট (এমএফএ)-এর মাধ্যমে বিশ্বের টেক্সটাইল বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়। এশিয়ার দেশগুলোর শিল্প উন্নয়নের জন্য উন্নত দেশগুলো কোটা ব্যবস্থার প্রবর্তন করে। যেসব দেশ পোশাক রপ্তানিতে কোটা সুবিধা পেতো না, দক্ষিণ কোরিয়া তাদের একটি। বাংলাদেশ যেহেতু এমএফএর মাধ্যমে কোটা সুবিধা পায় সেজন্য দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান দেইয়্যু এখানে যৌথ উদ্যোগে কারখানা স্থাপন করে। দেশ গার্মেন্টস-এর সাথে যৌথ উদ্যোগে স্থাপিত কারখানাটি চালু হয় ১৯৭৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর। কিন্তু দক্ষ জনবলের ঘাটতি থাকায় কারখানাটির ১৩০ জন সুপারভাইজার এবং ম্যানেজারকে প্রশিক্ষণের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ায় দেইয়্যুর পোশাক কারখানায় পাঠানো হয়। এরা সবাই প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে এলেও ১১৫ জন আলাদা আলাদা তৈরি পোশাক কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের প্রসারে ৭০-এর দশক থেকে যে দুটি বিষয় কাজ করেছে তা হলো উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর কোটা সহায়তা এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা। ১৯৮০ সাল থেকে তৈরি পোশাক বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য রপ্তানি পণ্যের তালিকায় নাম লেখাতে থাকে। ২০০২ সালে এসে বাংলাদেশ বার্ষিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এগ্রিমেন্ট অন টেক্সটাইল এন্ড ক্লথিং চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইউরোপে কোটা সুবিধা ভোগ করে। একই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাজারে বাংলাদেশ কোটার অধীনে পোশাক রপ্তানি করে লাভবান হয়। উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, মূলত: এই দশকজুড়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বাজার সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। ২০০৫ সালে কোটা উঠে যাবার পরও বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা তাদের সক্ষমতা দিয়ে ক্রেতাদের ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ২০০৭ সালে যেখানে ১০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হতো, সেখানে বর্তমানে রপ্তানির পরিমাণ বার্ষিক ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। গার্মেন্টস পল্লী:ধারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতের বিপুল বিস্তার সত্ত্বেও এখনও পরিকল্পিত গার্মেন্টস পল্লী গড়ে ওঠেনি। পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি এবিএম শামছুদ্দিন বলেন, পরিকল্পিতভাবে তৈরি পোশাক শিল্প কারখানা গড়ে তোলার জন্য ২০০৭ সালে মেঘনা সেতুর কাছে বাউশিয়ায় তিনশ একরের বেশি জমি নিয়ে একটি পল্লী করার কথা ছিলো। প্রকল্প প্রস্তাবটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভা (একনেক) পর্যন্ত গিয়েছিলো। কিন্তু নানা অজুহাতে তা পাশ করা হয়নি। প্রকল্প সারপত্র অনুযায়ী তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা সেখানে জায়গা কিনে কারখানাগুলো সরিয়ে নেয়ার কথা ছিলো। এক পর্যায়ে বর্জ্য শোধনাগার প্লান্ট (ইটিপি) স্থাপন নিয়ে সমস্যা তৈরি হলে উদ্যোক্তারা তাদের থেকে ইটিপির জন্য জায়গা ছাড়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি। তবে আশার কথা হচ্ছে, বাউশিয়ার সে প্রকল্পটিতে আবার প্রাণ ফিরে এসেছে। বিজিএমইএর বর্তমান সভাপতি আতিকুল ইসলাম জানান, প্রকল্পটিতে এখন ৫৩৫ একর জমি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ৬ মাসের মধ্যে জমি অধিগ্রহণ করা হবে। একটি অর্থনৈতিক জোনের আদলে এটি গঠন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ নিয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদেরকে দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে যেতে হবে। সেখানকার জমিগুলো আমরা সরকারের কাছ থেকে কিনে নেবো। তারপর কারখানাগুলো সেখানে পরিকল্পিতভাবে নিয়ে যাওয়া হবে।’ এদিকে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা অনেক পোশাক কারখানা এখনো রাজধানীতেই অবস্থান করছে। এসব কারখানাকে সরিয়ে নেয়ার কোন উদ্যোগ পর্যন্ত নেয়া হয়নি। পৃথক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা:দাবি দীর্ঘদিনের তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা রপ্তানি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য ১৮টি স্থান থেকে লাইসেন্স নেন। সরকারের ৭টি মন্ত্রণালয় এ শিল্পের সাথে জড়িত। যেমন আইন-শৃংখলার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্যের বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিদেশের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ব্যাংকিং খাতের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ইত্যাদি। বিজিএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি এবিএম শামছুদ্দিন বলেন, পোশাক শিল্পের নানা সমস্যা সমাধানের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় থাকলে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের এত ঝক্কি পোহাতে হতো না। এখন একটি বিষয় সামনে আসলে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় মিলে বৈঠক করতে হয়। এতে অনেক সময় জটিলতার সৃষ্টি হয়। কিন্তু একটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলে যে কোন ইস্যুতে অল্প সময়ের নোটিসে বৈঠক করা যায়। বিজিএমইএ-র বর্তমান সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, যে কোন আদলে যদি অ্যাপারেল মন্ত্রণালয়ের মতো কিছু করা যেতো তাহলে দুর্ভোগ অনেক কমে যাবে। একটি টার্ম অফ রেফারেন্স ঠিক করে এ কাজটি করা যায়। তাত্ক্ষণিক তোড়জোড়ই সার মাঝেমধ্যেই অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধস, শ্রমিক আন্দোলন, ভাংচুর-এর মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। কিন্তু কোন পক্ষই এসব সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধানে যান না। যেমন সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর বিজিএমইএর পক্ষ থেকে পোশাক কারখানা স্থাপন করা হয়েছে, এমন সব ভবনের কারিগরি নকশা চাওয়া হয়েছে কারখানা মালিকদের কাছে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও অর্ধেকেরও বেশি পোশাক শিল্প মালিক ভবনের নকশা জমা দেননি। সেবা বন্ধ করে দেয়ার হুমকিও এক্ষেত্রে কাজে আসেনি। আবার কোন কারখানায় আগুন লাগলে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে কারখানাগুলোর অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক তোড়জোড় হয়। বিকল্প সিঁড়ি আছে কিনা, কারখানার সিঁড়ি প্রশস্ত কিনা—এসব খোঁজখবর নেয়া হয়। কিন্তু কয়েকদিন যাবার পর এ ধরনের মনিটরিংয়েও ভাটা পড়ে। তৈরি পোশাক শিল্পের সমস্যা সমাধান হয় এডহক ভিত্তিতে।