তিস্তা :গ্রীষ্মে পোড়ায় বন্যায় ভাসায়

আপডেট : ১৮ জুন ২০১৩, ২২:৪৭
ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের কলোনি এলাকার বাঁধে সারি সারি অসংখ্য ঘর। ছনের ঘরে শত শত পরিবারের বাস। তিস্তা নদীর ভাঙনের শিকার এসব পরিবার অসহায় হয়ে কয়েক বছর ধরে জীবনযাপন করছেন এই বাঁধের ওপরে। এখানেই তাদের জীবন কাটে। এখানে ঠাঁই নেয়া প্রতিটি পরিবারের একদিন সাজানো সংসার ছিল কিন্তু আজ সব হারিয়ে তারা নিঃস্ব। বাঁধের বাসিন্দা ফারুক হোসেন বললেন, ‘গ্রীষ্মে আমরা তিস্তায় পানি পাই না। তাই ফসল ফলাতে পারি না। আর বর্ষায় তিস্তা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। এই নদীর পাড়েই সারা জীবন কাটালাম। এ নদীকে ঘিরেই আমাদের জীবন চলে। কিন্তু আমরা কোনদিন শান্তি পেলাম না। যদি গ্রীষ্মে ভালোভাবে ফসল ফলাতে পারতাম তাহলে বর্ষার কষ্টের দিনগুলো পাড়ি দিতে এত কষ্ট হতো না।’ খালিশা চাপানি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন ময়মনা বিবি। তিস্তার ভাঙনের শিকার হয়ে এখন উঠে এসেছেন খগাখড়িবাড়ির কলোনির বাঁধে। শরীরে বয়সের ভাঁজ। সোজা হয়ে হাঁটতে পারেন না। নদী ভাঙনের কথা জিজ্ঞেস করতেই ফুঁপিয়ে ওঠেন। বলেন, ‘পানি যে কখন এসে সব ভাসায় নিল বাবা বলতে পারি না। দুইটা হালের গরু ছিল, নাই। ভাইস্যা গেছে। ঘরের সব জিনিস ফালায় টিনের চালটা নৌকায় তুইল্যা চইলা আইছি, চার বছর হলো। নদী ভাঙনে সব গেছে। ধানি জমি, সাজানো সংসার। এখন দুই ছেলে দিনমজুরি করে সংসার চালাই।’ বিশালতা ও ভয়ঙ্করতার দিক থেকে তিস্তা উত্তরবঙ্গের প্রধানতম নদী। বর্ষায় এ নদীর প্রচণ্ড, তীব্র সে াত ভাসিয়ে নিয়ে যায় গ্রামের পর গ্রাম। নিশ্চিহ্ন করে দেয় জনপদ। বিগত কয়েকশো বছরের ইতিহাসে দেখা যায়, একেকটি প্রলয়ঙ্করী বন্যায় তিস্তা নদী তার গতিপথের মানচিত্রকে বারবার মুছে দিয়েছে। প্রতিবছরই তিস্তার পাহাড়ি ঢল শুধু নদীর গতিপথেরই নয় নদীর তীরবর্তী মানুষের জীবনের মানচিত্রও পাল্টে দিয়ে যায়। তিস্তা নদীকে উত্তরবঙ্গের দুঃখ নামেও অভিহিত করা হয়। তিস্তা পাড়ের মানুষের দুঃখ নিয়ে বাঁধা হয়েছে গান- বৈন্যের দেশে যাও ঘুঘু মোর তিস্তা নদীর পাড়ে কন যায়া মোর দুঃখের কথা।........ তিস্তা নদীর বানভাসি মানুষের দুঃখের কথা বলে শেষ করা যাবে না। পানির ঢল যখন আসে তখন তা ৫/৬ ফুট উচুঁ হয়ে সাক্ষাত্ মৃত্যুর মতো ধেয়ে আসে। পানির তীব্র স্রোত এক টানে উড়িয়ে নিয়ে যায় মানুষের সাজানো সংসার। ভাসিয়ে নিয়ে যায় ফসলের মাঠ। জন্ম ভিটার টান উপেক্ষা করে শুকনো মাটির জন্য নৌকা নিয়ে সবাই পাড়ি জমান অজানার উদ্দেশ্যে। পানিবন্দী অসংখ্য মানুষ তখন সরকারি রিলিফের আশায় দিন গোনে। রিলিফে পাওয়া চাল-আটায় প্রতিদিনের খাবারের সংস্থান হয় তাদের। বাংলাদেশে ভারত থেকে তিস্তা নদী প্রবেশমুখে ঝাড়সিংহেশ্বর গ্রাম। এ গ্রামের বাসিন্দা আশরাফ উদ্দিন বললেন, কিছু বোঝার আগেই পানি এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সব। রাতে ঘুমের মধ্যে দেখি ঘরে পানি ঢুকে থৈ থৈ করছে। তবে, গত বছর থেকে পরিস্থিতি একটু বদলেছে। এখন গজলডোবা ব্যারেজের গেট খুললে তা তারা বাংলাদেশকে জানায়। আমরা তখন অন্তত পরিবার আর গরু-ছাগলগুলোকে নিয়ে বাঁধে গিয়ে উঠতে পারি। ডিমলা উপজেলার ১০ নম্বর পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ খান বললেন, বর্ষার সময় এমন ঢল নামে এলাকার মানুষ দিশেহারা হয়ে যায়। ভারতের গজলডোবা ব্যারেজের সব গেট একসঙ্গে খুলে দেয়। তখন প্রায় ৫ ফুট উচুঁ হয়ে পানি ঢোকে নদীতে। মানুষ নিজেকে সামলানোরও সুযোগ পায় না। তবে এখন সে অবস্থা কেটেছে। গজলডোবা থেকে আমাদের পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিভিশনে জানালে তারা আমাদের জানায়। আমরা তখন মাইকিং করে গ্রামবাসীকে জানাই যে, ৫ ঘণ্টার মধ্যে নদীতে বান আসবে। গ্রামের মানুষ তখন নিরাপদ আশ্রয়ে সরে আসে।