এলব্রুস পর্বতের পাদদেশে

আপডেট : ১৮ জুন ২০১৩, ২২:৪৯
মস্কোয় এখন গ্রীষ্মকাল। ফলে এ সময় সূর্য ওঠে ভোর প্রায় চারটার দিকে। আমরা মাত্র তিন ঘণ্টার মতো ঘুমিয়ে উঠে পড়লাম। ট্র্যাফিক জ্যাম এড়িয়ে যেতে হবে এয়ারপোর্টে। ফলে পাঁচটার দিকে ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রাখলেও ট্রাফিক জ্যামের ভয়ে ঘুম ভেঙ্গে গেল চারটার দিকেই। ফারুক মামা আমাদের দোমোদেদোভো এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিবেন। তার বাসা মস্কো শহরের এক প্রান্তে। আর এয়ারপোর্ট আরেক প্রান্তে। প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার যেতে হবে। তাকে আমাদের এয়ারপোর্টে নামিয়ে দেয়ার অনুরোধ করার প্রধান কারণ ছিল—তার গাড়িতে বেশ জায়গা রয়েছে। ফলে আমাদের নয়টা ব্যাগ সহজেই তার গাড়িতে জায়গা হয়ে যাবে। নয়তো দু’টো ট্যাক্সি প্রয়োজন হবে। আর ফারুক মামা আমাদের নামিয়ে দিয়ে সকাল নয়টায় তার অফিসের কাজে ফিরে যাবেন। এই হলো গিয়ে পরিকল্পনা। এলব্রুস পর্বতে প্রথম বাংলাদেশ-রাশিয়া মৈত্রী অভিযানের অভিযাত্রী নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারী, সিফাত ফাহমিদা নওশিন ইতি এবং আমি—এই তিনজন দ্রুত প্রস্তুত হয়ে সকালের নাশতা সেরেছি ডাল-ভাত-মুরগির মাংস আর আচার দিয়ে। খেয়েই বের হয়ে পড়েছি। ১৩ জুন সকাল বেলা মস্কো শহরের অলিগলি প্রধান সড়ক হয়ে লুভলিনোতে ইতির মামাতো ভাই চয়নের বাড়িতে চললাম। চয়নের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চললাম দোমোদেদোভো এয়ারপোর্টের দিকে। প্রায় দেড় ঘণ্টার মতো সময় লাগলো দোমোদেদোভো এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে। ফারুক মামাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ট্রলিতে ব্যাগপত্র তুলে এয়ারপোর্টে ঢুকে পড়েছি। এয়ারলাইন্সে ওঠার আগে সর্বশেষ সময় ইতি তার জ্যাকেট হাতছাড়া করলেন। কিন্তু তা টের পেলেন প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পর। টের পাওয়ার পর আমাদের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি শুরু হলো। নিরাপত্তা তল্লাশি’র দায়িত্বে থাকা এক মহিলাকে ব্যাপারটা জানাতেই তিনি একটা কক্ষে গিয়ে ইতির জ্যাকেট বের করে দিলেন। প্লেনে উঠতেই ফের ঘুম। মিনারেলিন ভোডি এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ আগে থেকেই ছোটখাট পর্বত দেখা গেল। কিন্তু তাতে কোনো বরফ নেই। বুঝে নিলাম এসবের উচ্চতা হয়তো এক হাজার মিটারের বেশি হবে না। যাত্রা শুরুর ঘণ্টা দুয়েক পর স্থানীয় সময় বেলা একটার দিকে এয়ারপোর্টে নামলাম। ব্যাগপত্র সংগ্রহ করে মিনারেলিন ভোডি এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই প্রচণ্ড গরম বাতাসের হলকা যেন মুখে ঝাপটা মারল। কিছুক্ষণ পরই শুরু হলো পর্বতের উপত্যকার মধ্য দিয়ে পথ চলা। দূরে পর্বতের গায়ে মেঘ আটকে আছে। মেঘের ভেতর দিয়ে কোথাও আবার সূর্যের আলো উঁকি দিচ্ছে। ফলে আলোআঁধারির এক চরম খেলা শুরু হয়েছে পর্বতের কোলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রচণ্ড বেগে বৃষ্টি নেমে এলো। তার ভেতর দিয়েই চলছে গাড়ি। পথে আবারও ঝিমুনি এলো। ফের ঘুমিয়ে পড়লাম। কতোক্ষণ ঘুমিয়েছি খেয়াল নেই। হঠাত্ একটা গ্রামের কাছে গাড়ি একটু ধীরে চলতেই ঘুম ভাঙল। এটাই এলব্রুস ভিলেজ। আর পাঁচ কি ছয় কিলোমিটার পরই আমরা পৌঁছে যাব আজাউ ভ্যালিতে। সেখানে হোটেল শাহরিজাদা’র সামনে থামা হলো। এলব্রুস পর্বতের একেবারে পাদদেশ লাগোয়া সেই হোটেল। চারদিকের পাহাড় দেখে হিমালয়ের কথাই মনে হলো। ককেশাস পর্বতমালার এই অঞ্চলটায় পর্বতের পাদদেশে কেমন একটা শান্ত ভাব রয়েছে। মনে হলো যেন হিমালয়েরই কোনো পর্বতে এসেছি। অনেক আপন মনে হলো সব কিছু। এটাই এক ধরনের শান্তি এনে দিলে মনে। ভাবছিলাম - পর্বত আমাদেরকে ডেকেছে। সেই ডাকের কাছে নিজেকে সঁপে দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। হোটেলের পরিচালকের নাম হুসেন। আমাদের দেখে হুসেন এগিয়ে এলেন। তার কাছ থেকে মাথাপিছু পাঁচশ’ রুবল হারে দু’টো রুম ভাড়া নিলাম। রুমে ব্যাগপত্র রাখার পর আরসেন জানালেন, যেহেতু এই এলাকায় ‘স্কি সিজন’ শেষ হয়ে গেছে, ফলে হোটেলে এখন অতিথি আসে খুবই কম এবং সে কারণে হোটেলের পাচকও ছুটিতে রয়েছে। তাই আমাদেরকে নিচের গ্রামে গিয়ে আগামী দিন সকালের নাশতা কিনে আনতে হবে। গ্রাম বলতে যা বোঝায়, এই এলব্রুস ভিলেজ তেমন কিছু নয়। সব ধরনের নাগরিক সুবিধা এখানে আছে। এলব্রুস ভিলেজে গিয়ে পরদিন সকালের জন্য পাউরুটি, মধু, জ্যাম, জেলি, আনারসের জুস ইত্যাদি খাবার নেয়া হলো। দোকান চালাচ্ছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সী সৌম্য চেহারার এক মহিলা। তিনি কথায় কথায় আমরা কোন দেশ থেকে এসেছি, তা জানতে চাইলেন। আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি, জানাতেই জ্যাকেটের গায়ে আমাদের নাম দেখে জানতে চাইলেন আমরা মুসলিম কি না? সম্মতিসূচক মাথা নাড়তেই ফের জিজ্ঞাসা করলেন আমরা কি দিনে পাঁচবার প্রার্থনা করি কি না? এবারও ‘হ্যাঁ’সূচক সম্মতি জানালাম। তিনি খুশি হলেন। স্বধর্মী জানতে পেরেই কি না, তিনি আমাদেরকে নিজ থেকেই বেশ কিছু খাবারদাবার নেয়ার সুপারিশ করলেন, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। এলব্রুস পর্বতে প্রথম বাংলাদেশ-রাশিয়া মৈত্রী অভিযানে পৃষ্ঠপোষকতা করছে সামিট গ্রুপ, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্স ও আব্দুল মোনেম লিমিটেড। এছাড়াও এতে সহযোগিতা করছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, বাংলাদেশে রাশিয়ার দূতাবাস এবং রাশিয়ার কাবারডিনো বলকারিয়া রিপাবলিকের ক্রীড়া ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।