তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা দিচ্ছে না ভারত

আপডেট : ১৯ জুন ২০১৩, ২২:৩৭
বাংলাদেশের মানুষের বহু প্রত্যাশিত তিস্তা চুক্তি কী আর এ সরকারের আমলে হবে? এ প্রশ্ন এখন দেশের প্রতিটি মানুষের। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে বিস্তর উদ্যোগের পরও তা ভেস্তে গেছে ভারতের কারণে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতানৈক্যের কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশের মানুষের তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তিকে বার বার উপেক্ষা করা হয়েছে। বরং তিস্তার পানি আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে ভারত তা প্রত্যাহার করে তাদের ভিন্ন নদীতে স্থানান্তর করছে বলে বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী থাকলেও শুধু গঙ্গা ছাড়া অন্যকোন নদীর পানি বণ্টনে দু’দেশের মধ্যে কোন চুক্তি নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ যদি তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পেত তাহলে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে ফসল উত্পাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি পেত। সেইসঙ্গে তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবনযাত্রাও যেত বদলে। অথচ তিস্তা চুক্তি না হওয়ার কারণে বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে পড়বে। তারা বলছেন, তিস্তার পানিচুক্তি নিয়ে গড়িমসি বাংলাদেশের মানুষের ভারতের প্রতি এক ধরনের বিরাগের জন্ম দিচ্ছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসাবে ভারতের যে ধরনের সহযোগিতামূলক আচরণ বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যাশা করে ভারত তা প্রদর্শন করছে না। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের অনেক প্রত্যাশাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের কোন প্রত্যাশা ও ন্যায্য হিস্যাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেনি ভারত। এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রহমান ‘দৈনিক ইত্তেফাক’কে বলেন, মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত বাংলাদেশের উন্নয়নে ও অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখবে বলে মানুষের মনে আশার সঞ্চার ঘটেছিল। কিন্তু বৃহত্ পার্শ্ববর্তী দেশ হিসাবে ভারত সে ভূমিকা রাখেনি। এমনকি ভারত তিস্তাচুক্তির বিষয়ে যেসব বৈঠক ও আশ্বাস দিয়েছে সেসব পুরোটাই ভাঁওতাবাজি। কারণ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীকে পাশ কাটিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের এ চুক্তি করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। সুতরাং ভারত বাংলাদেশকে তিস্তাচুক্তি নিয়ে যেসব আশ্বাস দিয়েছে তা আসলে ভাঁওতাবাজি। সে কারণেই এ মাসের বৈঠকের তারিখ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শেষ সময়ে বাতিল করে দিলেন। তাদের পক্ষে মমতা ব্যানার্জীকে বাদ দিয়ে এ চুক্তি করা সম্ভব নয়। তারেক শামসুর রহমান বলেন, সত্যিকার অর্থে, ২০১৪ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচনের আগে ভারতের পক্ষে এ চুক্তি করা সম্ভব নয়। কেননা, কংগ্রেসের রাজনীতিতে মমতা খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর পশ্চিমবঙ্গে মমতার বিজয়ের জন্যও তিস্তার পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সুতরাং তিস্তাচুক্তির বিষয়ে ভারতের আশ্বাস একেবারেই লোক দেখানো। পানি বিশেষজ্ঞ ও ওয়ারপোর সাবেক মহাপরিচালক ম. ইনামুল হক বলেন, সরকারের উচিত ভারতকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি করার বিষয়ে চাপ দেয়া। তা নাহলে ভারত এভাবে পানি প্রত্যাহার করে যাবে। আর বাংলাদেশের তিস্তা অববাহিকার মানুষ ও দেশের কৃষি আবাদ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। তিস্তায় দিন দিন পানি প্রবাহ কমে আসছে। পানি প্রবাহ কমে আসার কারণ হচ্ছে, ভারত গজালডোবা ব্যারেজ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে ক্যানেলের মাধ্যমে মহানন্দা নদী দিয়ে বিহারের মেতী নদীতে নিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে তিস্তার পানি অস্বাভাবিক কমে আসে। যার কারণে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প অকার্যকর হয়ে পড়ে রয়েছে। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশে শুষ্ক মৌসুমে দিন দিন পানি প্রবাহ আশংকাজনকভাবে কমছে। পানি প্রবাহ কমে আসায় বাংলাদেশের বোরো আবাদ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তেমনি নদী অববাহিকার পরিবেশ ও জনজীবনেও পড়ছে এর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব। তিস্তা তীরবর্তী অঞ্চলে শুরু হয়েছে মরুকরণ প্রক্রিয়া। এ মাসের ১৮-১৯ জুন যৌথ নদী কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের তারিখ ঘোষণা করার পরও ভারতের দিক থেকে এ বৈঠক পিছানো হয়েছে। এমনকি পরবর্তী সময়ে কখন বৈঠক হবে সে বিষয়েও কোন কিছুই জানানো হয়নি। যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) সদস্য মীর সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ভারতের পানিসম্পদ মন্ত্রী জরুরি কাজে আটকে যাওয়ার কারণে ভারতের পক্ষ থেকে এ বৈঠক পিছানো হয়েছে। তবে সুবিধাজনক ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে কোন তারিখ উল্লেখ করেননি তারা। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনেমাহন সিং-এর বাংলাদেশ সফরে তিস্তা চুক্তি না হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এ চুক্তির বিষয়ে কোন অগ্রগতি নেই। এদিকে, চুক্তি সম্পন্ন না হওয়ার পর এখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের দিক থেকে বলা হচ্ছে তিস্তায় পানি নেই। যে পানি আসে তা খুবই সামান্য। আর বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত কোন নিয়ম না মেনেই একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় তিস্তার প্রবাহ আশংকাজনকভাবে কমে এসেছে। ২০১১ সালে মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফরে আসার আগে তিস্তার পানির হিস্যা দু’দেশের সরকারের আলোচনায় চূড়ান্ত করা হয়। সিদ্ধান্ত ছিল, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হবে মূল প্রবাহের ৫০:৫০। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মমতা ব্যানার্জীর অনিচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি থেকে পিছিয়ে আসে।