আনারসও নিরাপদ নয়। লোভী ব্যবসায়ীরা দ্রুত ফলনের জন্য আনারস গাছে প্রথমে হরমোন জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করে। অপরিপক্ক আনারসে সুন্দর হলুদ রং আনতে ব্যবহার করা হয় ভিন্ন রাসায়নিক। সর্বশেষ পচনরোধে এসব আনারস চুবানো হয় ফরমালিন মেশানো পানিতে। এভাবে তিন দফা রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসে আনারস। তবে যেসব শ্রমিক আনারস বাগানে কাজ করে তারা এই রাসায়নিকের ব্যবহার ও এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে তেমন ধারণা রাখে না। তারা বলেন, উনারা (বাগান মালিক) এসব ওষুধ দিতে বলে তাই দেই।
রাজধানীর বাদামতলী, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, কাওরানবাজার ও যাত্রাবাড়ীর বেশ কয়েকটি ফলের আড়তে গিয়ে আড়ত মালিক, শ্রমিকদের কথা বলে এবং কয়েকজন আনারস বাগান মালিক ও সেখানকার শ্রমিকদের সম্পর্কে কথা বলে জানা গেছে আনারসে রাসায়নিক ব্যবহারের বিস্তারিত।
জানা গেছে, আনারস গাছে ফুল আসা শুরু করে ফল তোলার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের কমপক্ষে ১০ ধরনের রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। সর্বশেষ আনারসে পচন রোধে ও দীর্ঘদিন রেখে বিক্রি করার জন্য ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। চাষীরা জানান, ঢাকা থেকে মহাজনরা (ব্যবসায়ী) আনারস বাগান তিন বছরের জন্য কিংবা তার অধিক সময়ের জন্য কিনে নেন। দ্রুত উচ্চ ফলনের আশায় হরমোন জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করতে বলেন। মাঝে মাঝে দেয়া হয় নানা ধরনের কীটনাশক। ফল আসার পর অপরিপক্ব অবস্থায় পাকানোর জন্য গাছে স্প্রের মাধ্যমে রাসয়ানিক দেয়া হয়। এর ফলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কাঁচা আনারসের রং হয়ে যায় হলুদ। সেই আনারস গাছ থেকে তোলার পর ফরমালিন মেশানো ড্রাম ভর্তি পানিতে চুবানো হয় ।
গত ৫ থেকে ৭ বছর ধরে আনারসে বিষাক্ত কেমিক্যালের ব্যবহার শুরু হয়েছে। কয়েকজন ব্যবসায়ী ইত্তেফাকের স্থানীয় প্রতিনিধিদের জানান, কেমিক্যাল দিয়ে পাকানোর পর ফরমালিনযুক্ত পানিতে আনারস চুবানো হলে টাটকা ও তরতাজা থাকে দীর্ঘদিন। এ সব আনারসের হলুদ রং দেখা গেলে ভেতরে কাঁচা খেতেও সুস্বাদু নয়।
দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেছেন, রাসায়নিক মেশানো আনারস খেলে প্রথমে ডায়রিয়া ও বমিসহ নানা ধরনের উপসর্গ শুরু হয়। রাসায়নিক দেহে জমাট বেধে থাকবে। ধীরে ধীরে ক্যান্সার, কিডনি, লিভার নষ্টসহ মরণব্যাধি দেখা দিবে।
টাঙ্গাইলের গোপালপুর সংবাদদাতা জয়নাল আবেদীন জানান, জেলার মধুপুর ও ঘাটাইল, ময়মনসিংহের ফুলবাড়ি ও মুক্তাগাছা, জামালপুর সদর উপজেলাসহ পাঁচটি উপজেলায় প্রচুর আনারস উত্পাদন হয়ে থাকে। এসব উপজেলার ৩০ হাজার একর জমিতে আনারস চাষ হয়। মধুপুরের আনারসের কদর সেই ১৯৪২ সাল থেকে। তখন জলডুবিসহ নানা জাতের আনারস চাষ হতো। গত ১০ বছর ধরে হরমোন জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করে উচ্চ ফলনশীল জয়েন্টকিউ জাতের আনারস চাষ হচ্ছে। এখন বেশিরভাগ বাগানে এই আনারস চাষ হচ্ছে।
ঢাকার বড় বড় ফল ব্যবসায়ী ও মহাজনরা আনারস বাগান কয়েক বছরের জন্য কিনে। যে ফল এক কিংবা দেড় বছরে আসার কথা সেই ফল ওঠানো হয় ৫ থেকে ৭ মাসের মধ্যে। আনারস বাগানে ব্যবহারের জন্য বছরে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকায় রাসায়নিক কেনেন ব্যবসায়ীরা।
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি নজরুল ইসলাম মুহিব জানান, মৌলভীবাজারে সাতটি উপজেলায় প্রচুর পরিমাণে আনারস উত্পাদন হচ্ছে। দ্রুত মুনাফার লক্ষ্যে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী বিষযুক্ত ছত্রাকনাশক আনারসে ব্যবহার করে বাজারজাত করছে।
কৃষি বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, আনারসসহ বিভিন্ন মৌসুমী ফল পাকানোর জন্য এসিড জাতীয় ক্যামিকেল ‘ইথরেল’ এবং ওইসব ফলের পচনরোধে এসিটিক এসিড ‘ন্যাপাকথক্স’ (এন.এ.এ) ও ‘জিবারেলিক’ ব্যবহূত হয়।
মৌলভীবাজার রাজনগর কুলাউড়া, বড়লেখা জুড়ি শমশেরনগর, ভানুগাছ ও আদামপুর বাজারে এখন মৌসুমী ফলের হাট। শ্রীমঙ্গলের আড়তসমূহে অধিকতর ফরমালিন ও ছত্রাকনাশক ব্যবহার করে জেলার সকল হাটবাজারে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রয় করা হয়। শমশেরনগর বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, গাছ থেকে আনারস কেটে একত্রে স্তূপ করে চুন জাতীয় একটি গুঁড়া পাউডার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করে খড়কুটো দিয়ে দু’এক দিন ঢেকে রাখা হয়। পরদিন বা একদিন পরে পাকা আনারসের মতো রং ধারণ করে এবং বাজারজাত করা হয়। একজন কীটনাশক ব্যবসায়ী জানান, এছাড়াও আনারস পাকাতে ও পচন রোধে আমদানিকৃত ‘প্লানফ্লিক্স’ নামক একটি ছত্রাকনাশক স্প্রে করা হলে আনারস লালচে রং ধারণ করে ও পচন ঠেকানো সম্ভব হয়। শ্রীমঙ্গলসহ কমলগঞ্জের শমশেরনগরসহ কয়েকটি বাজারে এই ওষুধ পাওয়া যায়। তবে তাদের নির্ধারিত ব্যবসায়ী ছাড়া অন্য কারো কাছে ছত্রাকনাশক ওষুধ বিক্রি করা হয় না।
