মিশন ক্রুজাগর

আপডেট : ১৯ জুন ২০১৩, ২২:৩৯
এলব্রুস পর্বতে প্রথম বাংলাদেশ-রাশিয়া মৈত্রী অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর কথা যদি বলি, তাহলে তা শুরু হয়েছে ১৪ জুন থেকে। এদিন গাইড ডলহাট অলমেঝভ সকালে আমাদের হোটেলে আসার কথা। তার সঙ্গে সাক্ষাতে এলব্রুস অভিযানের পুরো পরিকল্পনা সাজানো হবে। এই অভিযানের অভিযাত্রী নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারী এর আগে বহু ধরনের অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন। আমেরিকায় লেখাপড়া করার সময়ে তিনি ম্যারাথন দৌড়েছেন। স্কাই ডাইভিং, স্কুবা ডাইভিং, প্যারাগ্লাইডিংসহ আরও অনেককিছু করেছেন। আর সিফাত ফাহমিদা নওশিন ইতি বাংলাদেশে এভারেস্ট একাডেমী আয়োজিত ট্রায়াথলনে অংশ নিয়ে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন। এছাড়াও নর্থ আলপাইন ক্লাব বাংলাদেশ আয়োজিত ২০১১ সালের চুলু ইস্ট পর্বতাভিযানে অংশ নিয়ে চূড়ায় পৌঁছেছিলেন। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে এভারেস্ট একাডেমী আয়োজিত দুই চাকায় স্বদেশ ভ্রমণ শীর্ষক ২৫ দিনব্যাপী সাইকেল অভিযানে অংশ নিয়ে সফলভাবে অভিযান শেষ করেছিলেন। আমারও অল্প-বিস্তর পর্বতারোহণের অভিজ্ঞতা আছে। ফলে অভিজ্ঞতার দিক থেকে পুরো দলই সমৃদ্ধ। সেদিক থেকে আরসেন ঝিনভই শুধু অনভিজ্ঞ। বলা চলে তার পর্বতারোহণ জ্ঞান একেবারেই নেই। সুতরাং আমাদের চ্যালেঞ্জ হলো তাকেও এই অভিযানে সফল করা। সকালের নাশতা সারার পরই গাইড ডলহাট অলমেঝভ চলে এলেন। করমর্দনের পর কথায় কথায় জানতে পারলাম, গত আট বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এলব্রুস পর্বতে গাইডের পেশা হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে তিনি অর্ধশতবারেরও বেশি এলব্রুস পর্বতচূড়ায় পৌঁছেছেন। তার সঙ্গে আলোচনায় সাতদিনে এলব্রুস পর্বত জয়ের পরিকল্পনা সাজানো হলো। আমরা যেখানে আছি-সেই আজাউ ভ্যালির উচ্চতা তেইশশ মিটার। প্রথম দু’দিন পর্বতের উচ্চতার সঙ্গে শরীরকে খাপ খাওয়ানোর জন্য প্রথমদিন আজাউ ভ্যালি থেকে এলব্রুস পর্বতের রুটে প্রায় তিন হাজার মিটার উচ্চতায় থাকা ক্রুগাজর নামক একটি জায়গা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসব। দ্বিতীয়দিন ফের আজাউ ভ্যালি থেকে টেরেসকাল ভিলেজ পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে ট্রেকিং শুরু করে প্রায় তিন হাজার পঞ্চাশ মিটার উচ্চতায় থাকা ওয়েদার অবজারভেশন টাওয়ারে যাব। এরপর ফের আজাউ ভ্যালিতে ফিরে আসা। তৃতীয়দিন বিশ্রাম এবং এলব্রুস পর্বতারোহণের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতির অংশ হিসাবে প্রায় তিন হাজার আটশ মিটারে থাকা সেকেন্ড ক্যাম্প বা ব্যারেলে রাত্রিযাপন ও খাওয়া-দাওয়ার সব আয়োজন করতে হবে। চতুর্থ দিন আজাউ ভ্যালি থেকে ব্যারেলে পৌঁছে ব্যাগপত্র রেখে প্রায় চার হাজার দুইশ মিটার উচ্চতায় থাকা প্রিউট ইলেভেন নামক একটি জায়গা পর্যন্ত গিয়ে ব্যারেলে এসে রাত্রিযাপন করা হবে। পঞ্চমদিন ব্যারেল থেকে প্রায় চার হাজার সাতশ মিটার উঁচু পার্সটুহভ মাউন্টেন জয় করে ফিরে আসা হবে। ষষ্ঠদিন বিশ্রাম এবং এদিন রাতের বেলাতেই প্রায় পাঁচ হাজার ছয়শ বিয়াল্লিশ মিটার বা আঠার হাজার পাঁচশ দশ ফুট উঁচু এলব্রুস পর্বত জয়ের জন্য ব্যারেল বা সেকেন্ড ক্যাম্প থেকে সামিট পুশ করা হবে। অর্থাত্ সামিট পুশের দিন আমাদেরকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ফুট উচ্চতা পাড়ি দিতে হবে। সেদিনই আমরা আজাউ ভ্যালিতে ফিরে এলে এলব্রুস পর্বতে প্রথম বাংলাদেশ-রাশিয়া মৈত্রী অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে সুসম্পন্ন হবে। গাইড ডলহাট অলমেঝভ আমাদের সঙ্গে ব্যারেল থেকে থাকবেন। এজন্য তার ফি হলো দিনপ্রতি পঞ্চাশ ইউরো এবং শুধু সামিট পুশের দিন জনপ্রতি একশ ইউরো করে। আর সেকেন্ড ক্যাম্প ব্যারেলে থাকার সময় রান্নাবান্নার কাজে সহযোগিতার জন্য একজন পাচক নিতে হবে। এজন্য তাকে দিতে হবে দিনপ্রতি পঞ্চাশ ডলার করে। এসব সাব্যস্ত হওয়ার পর আমরা প্রথমদিনের অ্যাক্লেম্যাটাইজেশন হাইকিংয়ে ক্রুগাজর পর্যন্ত যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে নিলাম। ক্রুগাজরে যাওয়ার পথে প্রথম দু’শ মিটার হেঁটে পার হওয়ার পরই চারদিকের পর্বতের চমত্কার দৃশ্য একেবারে চোখের সামনে হাজির হলো। একটা ভ্যালির ঠিক শেষ মাথায় আজাউ ভ্যালি গড়ে উঠেছে। কিন্তু আরাধ্য এলব্রুস পর্বতের এখনও দেখা পাওয়া গেল না। আরসেন জানালেন, ক্রুগাজরে পৌঁছালে এলব্রুস পর্বতকে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই আশাতেই অ্যাক্লেম্যাটাইজেশন হাইকিং শুরু করেছি। সবার সঙ্গেই ক্যামেরা রয়েছে। যেখানে মনে চাইছে থামছি, ছবি তুলছি। আমার সঙ্গে থাকা ভিডিও ক্যামেরায় মনের আনন্দে সবকিছু তুলে নিচ্ছি। পথ বেশ খাড়া। তার মধ্যে ভ্যালিতে সূর্য তার মতো করে তাপ ঢেলে দিচ্ছে। ফলে সামান্য খানিকটা উঠতেই হাঁপিয়ে উঠছি। প্রায় আড়াই ঘণ্টা চড়াই পেরিয়ে আমরা পৌঁছলাম ক্রুগাজরে। মূলত আজাউ ভ্যালি থেকে যারা স্টেশন মির পর্যন্ত যেতে ক্যাবল কার ব্যবহার করেন, তারা ক্রুগাজরে ক্যাবল কার বদলে অন্য ক্যাবল কারে ওঠেন। সুতরাং ক্রুগাজর হলো বদলি স্টেশন। এখানে পৌঁছে আরসেন গেলেন পানির খোঁজে। তার বেশ পিপাসা লেগেছে। তিনি ফেরার পর পিচ ফল, কেক, চকোলেট বার ইত্যাদি দিয়ে খাওয়া-দাওয়া সারা হলো। আরও কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়ার পর নিচের দিকে নামা শুরু হলো।