লাইভ কাভারেজ

আপডেট : ২০ জুন ২০১৩, ১৯:০২
শরাফত এখন ড্রয়িংরুমে ঘুমায়। ড্রয়িংরুমটাই তার বরং ভাল্লাগে। সোফা, টেবিল, কিছু হাবিজাবি শো-পিস। ক্রিস্টাল হাঁসের একটা জোড়া আছে। নীলকণ্ঠি হাঁস। রাতের মোহনায় তারা জল কাটে, খলবল শব্দ হয়, রাতের উজানে প্যাঁক প্যাঁক ডেকে ওঠে একজোড়া হাঁস। তাদের কণ্ঠে বিষ জমা করেছে মানুষ, ক্রিস্টাল করে বাঁধিয়ে রেখেছে। হাঁসেদের ড্রয়িংরুম নাই। তাই তারা ক্রিস্টাল আবরণে মানুষের ড্রয়িংরুমে জায়গা নেয়। অথবা আসলে মানুষের বাসনা ক্রিস্টাল হাঁসের রূপ নেয়। একটা দেয়াল-ছবিতে গরুর গাড়ি ঠেলছে লোকটা, কাদায় দেবে গেছে গাড়ির চাকা, আল্লার দুনিয়ায় যে কত কাদা। পারে না লোকটা, সে ওই পারার চেষ্টাতেই ধীর হয়ে থাকে শিল্পীর চোখে। শরাফতও রাতভর হাত লাগায়। কাদায় দেবে যাওয়া গরুর গাড়ি ঠেলে, নিজেই দেবে যায় অনেকটা, কোমর তক, আবারও উঠে আসে। পরদিন রাতের বেলায় আবারও নেমে পড়ে গরুর গাড়ি ঠেলার কামে। এতটুকুও আগাইতে পারে না সে। না-পারাতেই মায়া জন্মায়। পেরে গেলে হয়তো ঈর্ষার জন্ম হইত। এসব কারণেই ড্রয়িংরুমে থাকতে ভালো লাগে তার। জানলা-দরজার পর্দায় ড্রয়িংরুমের একটা পেলবতা আছে। বাঙালি মধ্যবিত্তের শো-পিসেরও কোনো ঠিক নাই। যার যখন যা ভাল্লাগে, সে তা-ই এনে শো-পিস হিসেবে সাজায়। শরাফত এবং তার বউ মিলে ঘুরতে গেছিল জাতীয় স্মৃতিসৌধ, বাংলা নববর্ষ, বসন্তের উত্সব আর পিঠা উত্সব, রাঙামাটি। এসব উত্সব-আয়োজনের উপজাত হিসেবে তাদের ড্রয়িংরুম বেশ বাঙালি সাজ নিছে। তার বেডরুম বহুভাষী, আর ড্রয়িংরুম বাঙালি। বেশ মজাই লাগে। এ বাঙালি সংস্কৃতির লাগোয়া একটা সিলিং ফ্যান, একটা জানলা, দুইটা দরজা আর ডিভানের ওপর সে। একটা দরজা দিয়া বাইরে যাওয়া যায়, আরেকটা দিয়া ভিতরে। ভিতর-বাইরের এমন যুগলস্থানে রাত কাটানোর মাজেজাই আসলে আলাদা। টিভিও একটা জোগাড় করবে কি না ভাবতেছে। যদিও টিভিতেই তার কাল হইছে। মাস্টার বেডে তার বউ থাকে, বউয়ের সঙ্গে থাকে ধানুশ। আগে থাকত রিতেশ, তারও আগে আরও কেউ কেউ আছিল, এখনও আছে। শরাফত নিজেই ছিল টানা চার বছর, আজ তিন মাস সে ড্রয়িংরুমে আসন নিছে। বাকি এক ঘরে থাকে মা, এক ঘরে ভাই। বউয়ের ঘরে তার যাতায়াত আছে অবশ্য, কিন্তু শোয়াশোয়ি নাই। বউ মানে আসলে শোয়াশোয়ির একটা বিষয় থাকে। এক লগে না-শুইলে আসলে সে বউ হয় না। মানুষ হয়তো এমন ভাবে, কিন্তু শরাফতের বিষয়টা ভিন্ন। আঁখি তার বউ, কিন্তু তারা এক লগে শোয় না। এটা তার ঘনিষ্ট বন্ধুরাও জানে না। জানলে হয়তো বিষয়টা রাষ্ট্র হবে। রাষ্ট্র আসলে এমনই কিছু যা মানুষ বিশ্বাস করে। মানুষ জানে সে বিবাহিত, বউয়ের লগে তার বিশ্বাসের সংসার। যদি এমনটা সবাই জানে যে সে এখন একা শোয়। তাতে তাদের ধারণা পাল্টায়া যাবে। তখন সবাই শরাফতরে নিয়ে ভিন্ন কিছু ভাববে। তখন শরাফত-আঁখি গসিপ হয়ে যাবে। অথচ শরাফত এবং আঁখি বিশ্বাস নিয়াই তাদের সংসার শুরু করছিল। প্রথম দিনটার কথা মনে হলে যেকোনো সময়েই উত্তেজিত হয় শরাফত। বাসর রাতেই জীবনে প্রথম নারীসঙ্গ পায় সে। তার বউয়ের জন্য সেটা জীবনের প্রথম কি না এ বিচার তখন করে নাই, এখনও করে না। বউই তারে বাকি সময়ের বালা-মুসিবত সম্পর্কে নছিহত করেছে। সে মোতাবেকই চলেছে শরাফত। বউয়ের কথায় রা করে নাই। বউ তারে বলেছিল, প্রথম দিনেই, আমি হইলাম নদী। তুমি আমাতে ডুব দিবা। এ নদীতে নামলে কিন্তু ভিজতে হয়। যত নামবা তত ভিজবা, যত ভিজবা তত নদীর লগে তোমার সোহাগ জমবে। এ এক আচানক নদী, ইশারায় যার জন্ম অনুভূতিহীনতায় তার শেষ। শরাফত এমন নদী এর আগে কখনো দেখে নাই। এখন সে নদীর সঙ্গে শরাফতের বিরহ তৈরি হয়েছে। এখন শরাফত ড্রয়িংরুমেই শোয়। উতাল নদীর বুকে একা চরের মতো উপুত হয়ে শুয়ে থাকে শরাফত। ড্রয়িংরুমে শুইতে এখন শরাফতের ভাল্লাগলেও বেডরুমে শোয়ার দিনগুলোর কথা সে ভুলতে পারে না। তার বন্ধুদের কেউ ড্রয়িংরুমে ঘুমায় না। হয়তো একা ঘুমায়, একই বিছানায় দুই জন দুই পাশে ঘুমায়। কারুর বউ হয়তো বাপের বাড়ি চলে গেছে। কারুর তালাকনামা ঝুলতেছে, ইদ্দত কাল চলছে মৌসুমীর জীবনে। জীবন আসলে একটা বাদাম খাওয়ার গল্প। যার জীবন তার বাদাম অন্যে খায়। কোনোটা ফাঁপা, পোঁতানো, কোনোঁটা ভরাট, রসালো। খোসা ফেলেই জীবনটারে দেখতে হয়। চোখে যা দেখা যায় তা-ই জীবন না। জীবন আসলে হাতে-পায়ে-জিহ্বায়-দাঁতে চাবায়া নিতে হয়, খুলে দেখতে হয় কী আছে ভিতরে। তারা বন্ধুরা যখন এক হয়, আড্ডা দেয়, তখন একে অপররে টিপে-চুষে দেখ নেয়, জেনে নেয়। মানুষ বিষয়টাই অদ্ভুত মনে হয় শরাফতের কাছে। শরাফতের ঠিকানা এখন তার ড্রয়িংরুম। এটা যখন প্রথম বন্ধুদের মধ্যে রাষ্ট্র হবে তখন মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাবে। কেউ তাকে বাহবা জানাবে, কেউ করবে আফসোস। অন্তত মঞ্জুর হতাশ হবে। শরাফতের এমন পরিণতিতে তার কষ্ট হবে। মঞ্জুর আবেগি ছেলে। জলকাদার মন তার। বিয়ার ওকালতিটাও সে-ই করছিল। তার বউয়ের বান্ধবী এই আঁখি। কিন্তু শরাফতের কষ্ট হয় না। সে দিব্যি আছে ড্রয়িংরুমে। এপার-ওপার বাংলার মতো করেই আছে সে। জি-বাংলায় বউ-শাশুড়ির ঝগড়া যখন চলে তখন শরাফত ড্রয়িংরুমে নিরাপদ বোধ করে। তার বউ এ ঝগড়ার মধ্যেই ঢুকে যায়। তাদের সাজ-পোশাকে আর চাহনিতে মজে যায়। একটা শেষ হইলে আরেকটায় ঢুকে পড়ে। মুহূর্তেই টিভির ঘটনাবলি পাল্টে যায়। দর্শন আর আদর্শ বদলে যায়। দেশ-কাল-মানুষ পাল্টে যায়, এমনকি ভাষাও। বরং যে মানুষটা, মানে এই যে তার বউ টিভি দেখে সে টিভি হতে না-পারার বিষয়ে এতই মগ্ন যে, শরাফত থেকে সে ক্রমে দূরে সরে গেছে। বউয়ের নিস্তরঙ্গ জীবনে এই টিভি যত বৈচিত্র্য আনতে পারে শরাফত তা পারে না। এত ভয়হীন রোমাঞ্চ, দায়হীন আনন্দ উদ্যাপন, কারুর সাতে অথবা পাঁচে না-থেকেও, তাদের ঘর-গেরস্থালির খবর এত নিরাপদে জানা যায় টিভিতে, এত কাহিনি আর ঘটনাবলির দৃশ্যায়নে হারিয়ে গিয়ে বউ এখন আর শরাফতের দিকে মনোযোগ দেয় না। ইচ্ছা কইরাই দেয় না। প্রথম যখন রজনিকান্তের ছবি কিনে নিয়ে আসে তার বউ, তখন সেটা মেনে নিয়েছিল শরাফত। পরে যখন শাহরুখ খানের পোস্টারও টানানো হয় বাসায় তাতেও আপত্তি ছিল না। একে একে নানা রঙের পোস্টার আর তাদের শরীর আর ভ্রুভঙ্গিতে জীবনহীনতা দেখতে দেখতে হাঁফায়া উঠলেও বউরে কিছু বলে নাই সে। বউ তখন জামাইরে নিয়া ভাবে না, জামাই কি-নিয়া ভাবে সেটা আমলে আনে না। শাহরুখের লিপস্টিকমাখা ঠোঁটেই তার যত আহ্লাদ। আসলে শরীরে তাদের পাওয়ার বাসনা থেকেই পোস্টার কেনে বউ—এমন সন্দেহ চাড়া দিয়ে ওঠে একদিন। মাঝে মাঝেই যখন বলে ওঠে তুমি আমার আব্রহাম। এটা মানতে রাজি হয় না শরাফত। কেন মানবে সে। সে স্বদেশি থাকতে চায়, আমাদের দেশে কি কিছুই নাই? নাখ-নায়িকা নাই, গান-বাদ্য নাই? বউরে সে অনেক বুঝাইছে, সিডি এনে দিয়েছে। কিন্তু বউ তার টিভি পাগল। বলে, ওরা সরাসরি দেখায়, সরাসরি, খনকার ঘটনা তখনই। তুমি একটু দেখ না, তোমার না বন্ধু আছে, লাইভ প্রেম দেখানো যায় নিকি। মা খুব বকা দিত শরাফতরে। কি বউ আনলি, এ কেমুন বউ তোর। প্রথম দিকে শরাফত বুঝত এটা জেনারেশন গ্যাপ। সময়ের দূরত্ব বইলা একটা কথা আছে। ফোলানো শরীরের নায়ক দেখে মা বলে উঠেছিল নাউজুবিল্লাহ, ঘরে ফেরেশতা ডুকবি না। ঘরে ফেরেশতা ঢোকানোর পাল্টা চেষ্টা হিসেবে তিনি ড্রয়িংরুমে মক্কার ছবি টানায়েছিলেন। সে ছবি এখনও আছে। রাত গভীর হইলে, বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকা মানুষের সমবেত কাতর ধ্বনি শরাফতের মগজে প্রবেশ করে। লাব্বায়েক ধ্বনিতে মুখরিত ড্রয়িংরুমে সে একা বেকুব বসে থাকে মাঝ রাতে। তার আজিজ চাচার কথা মনে হয়। তিনি হজে গেছিলেন। সেই চাচিও খুব পছন্দ করতেন শরাফতরে, ছোটবেলায়। বলতেন, আমার মেয়ের লগে তোরে বিয়া দিমু। চাচির কোনো মেয়ে হয় নাই, সব ছেলে। মানুষের বাসনা আসলে অজেয়। মক্কার ছবিটা মাঝরাতে আজিজ চাচার কথা মনে করায়ে দেয়। মাঝে মাঝে বাইরের শব্দও আসে। বিচিত্র সব শব্দই এখন সঙ্গী। ড্রয়িংরুমে থাকার এমন কিছু সুবিধা আছে। এটা অনেক জাগতিক, সদর দরজা লাগোয়া। ছিটিকিন খুলেই তুমি চলে যেতে পারো। এ ঘর, সংসার, বুড়া-মায়ের- শরীর, বউয়ের-নীল-মুখ। সব ফালায়ে তুমি দৌড় দিতে পারো। এই যে দৌড় দেয়ার সুযোগের কাছাকছি থাকতে পারার সুবিধা শরাফত এখন ভোগ করে। ড্রয়িংরুমের অর্থনীতিও বেডরুম থিকা আলাদা। দারিদ্র বেডরুমেই প্রথম দেখা দেয়। ড্রয়িংরুম বরং সচ্ছলতার ইঙ্গিতবাহী। অন্যের বউ, বন্ধুরা, যাপিত-জীবন, একা-একা উপভোগের সুযোগ আপাতত সে হাতছাড়া করতে চায় না। আগে যখন বেডরুমে ঘুমাইতে যাইত তখন ড্রয়িংরুম পার হয়ে, লাগোয়া রান্নাঘর ছেড়ে, মায়ের ছোট্ট ঘরখানা থেকে মাকড়শার আঁশের মতো গন্ধ আসত। তারপর ভারী পর্দা ঠেলে নিজের রুম, সেখানে বউ বসে আছে। এক হাঁটু ভাঁজ করে বিছানায় বসে আছে। থুতনি ঠেকানো মুখের চোখ জোড়ায় টিভির নীলাভ আলো। সেখানে ছল ছল করে রঙিন জীবনের বাসনা। এমন সব কিছু ড্রয়িংরুমে পাওয়া যায় না। সেক্যুলার পরিবেশে এখন শরাফত ভালোই আছে। আরেকটা শরীর থেকে দূরে আছে। নিজেরে তার এখন হাল্কাই লাগে। তবুও হতাশার দীর্ঘশ্বাস তেলাপোকার মতো বিচরণ করে। মানুষ মরে, হতাশা মরে না। তার বেডরুমটা দিনে দিনে এতটা অনিরাপদ হয়া উঠল। অথচ প্রথমদিকে কাউরেই সে ঢুকতে দিত না। মনে হতো তাতে গোপনীয়তা বজায় থাকে না। সে যে তার বউরে আগলে রাখতে চাইত বিষয়টা এমন না। বেডরুমটারেই আগলাত, এটা নিজস্ব, একান্ত ব্যক্তিগত ভাবত। মা ছাড়া আর কারুর প্রবেশাধিকার ছিল না। মায়ের বিষয়টাই আসলে এমন। কোনো নিয়মে প্রবেশ করায় না নিজেরে। অনিয়মের বালাই। এই যে অফিস, সেখানে এডমিন, ছুটির নোটিশ, আইডেন্টিটি, বৃদ্ধাঙ্গুলের ছাপ, এত কিছু। অথচ মায়ের বেলায় এসব নাই। কেবল জানলেই চলে—মা। মা আসলে ঘরের ভেতরে আরেক ঘর। মা নিজেই এক ব্রহ্ম?াণ্ড। তার কাছে সব পাওয়া যায়। সেই মা-ও এখন আর বেডরুমে যায় না, তিনিই প্রথম বলছিলেন, এমন রুমে থাহস কেমনে। এর উত্তর দিতে পারে নাই শরাফত। সে নিজেও ভেবেছে। এভাবে থাকা যায় কিনা। ভাই চেয়েছিল বউরেই তাড়ায়া দিতে। কিন্তু বউ তাড়াবে কেন শরাফত। এটা তার বউয়ের সিদ্ধান্ত, টিভি সে সারাজীবনই দেখবে। শরাফতরে সে জানিয়েছে। কি আছে আমার জীবনে, এই তুমি অফিস থিকা আসো, বুইড়া মা, একটা খটখটা দেবর। রাতের বিছানা ছাড়া আমর জন্যে আর তো কিছু দেখি না যাতে আমি কাতর হইতে পারি। কও, আছে, দিতে পারবা তুমি। এর কি জবাব দিবে শরাফত। জবাব নাই। তাছাড়া এই যে এখন বউ আছে। অন্তত একটা বউ যে তার আছে, সে তো সত্যি। না থাকলে তো নাই। আছে যখন, তখনই তো মজা। তখনই আনন্দ অথবা বেদনা। তাছাড়া এই যে বিয়া করল শরাফত, মায়ের বকা, মায়ের আব্দার। সমাজ সংস্কার, বংশের ইজ্জত, ধারা রক্ষা, অনেক টাকা, অনেক আত্মীয়, অনেক আমোদ আর ফূর্তি, সব তো এখন ওই বউয়ের মধ্যেই আছে। সে-ই এখন বিগত-খরচ আর প্রত্যাশারে আছে করে তুলতেছে। এ বউয়ের না-থাকা তো অনেক আশা আর চাহিদার না-থাকা। ইজ্জত থাকবে নাকি। বাজারে বাজারে ঘুরবে নাকি তার বউ না-থাকার-কাহিনি। তার চাইতে বউ থাকা ভালো। অবশ্যই ভালো। বিচ্ছেদের সম্ভাবনাও থাকার মধ্যেই লুকায়া আছে। তাছাড়া আঁখির প্রতি শরাফতের প্রেম-ভালোবাসা এখনও নাই হয়ে যায় নাই। ধানুশদের জ্বালায় বা তাদের প্রতি বউয়ের অনুরাগে বিরক্ত হয়ে সে ড্রয়িংরুমে ঠাঁই নিছে এইটা সত্য। টিভির লগে বউয়ের পরকীয়া তারে হয়রান করে ফেলেছে যদিও। অথচ এ টিভি শরাফতই কিনে আনছিল। বউয়ের একা সময় কাটাত না। সারা দিন ঘরে বসে সে কি করবে। মায়ের ফরমায়েশ শোনা ছাড়া, তেলে বাগাড় আর মাংসে লবঙ্গ দেয়া ছাড়া আর তো কিছু করার নাই বউয়ের। চাকরির চেষ্টা সে করছিল, হয় নাই। শরাফতের এমন ক্ষমতা নাই যে তার অনুরোধে চাকরি হয়ে যাবে। ফলে বউরে টিভি কিনে দিয়েছিল সে। যেদিন টিভি কিনে আনছিল, বউয়ের সে কি খুশি। ঝলমল করা রুপালি নদী যেন চোখে-মুখে ভাইসা উঠে। তার বউয়ের মধ্যে এমন রুপ আবিষ্কারে সে মোহিত হয়। এবং যেদিন সে টিভি কিনে আনছিল সেদিনই রুমে একটা টিকটিকি দেখতে পায়। তখনই সাবধান হতে পারত শরাফত। টিকটিকি আছে মানে মশা বা এমন কোনো কীটও আছে রুমে। তার মানে এ রুমের নিরাপত্তায় খুঁত আছে। নিরাপত্তার যে লোহার-বাসর নিজ ভাবনায় তৈরি করছিল শরাফত তাতে টিকটিকিটি ছিদ্রের হাজিরা দিল। সেই শুরু। এরপর টিভির গল্প আর ছবি, টিভির রং আর শব্দ, তাতেই বউয়ের জীবন যাপিত হতে থাকে। লখিন্দরের বাসরের মতো বাসুকীরা সব একে একে ফণা তুলে নৃত্য করে। তাদের একেক নাম, একেক ভাষা। অন্য ভাষায় দক্ষ হয়ে ওঠে আঁখি। অন্যের চেহারা রপ্ত করে সে। নিজেই কেমন সে অপর হয়ে ওঠে। অস্পৃশ্য অপরের প্রতি তার বেদনা জাগে। চোখে জল আসে। তরঙ্গায়িত হয় ভরদুপুর। বাসায় ফিরলে এসব বিষয় নিয়ে আলাপ করেছে শরাফত। বউয়ের তখন সে কি উচ্ছ্বাস। বউ যেন তার বোনের বাড়ি যাওয়ার গল্প করতেছে। যেন টিভির লোকেরা তার আত্মীয়। যেন এদের আনন্দ-বেদনায় তার অনেক কিছু যায়-আসে। সে মনে মনে নটরাজ হয়ে ওঠে। বলত, দেখছ পৃথিবীতে কত মানুষ আছে, কত বিচিত্র এ জীবন, জীবনের কত দুয়ার। টিভিটাই বাস্তব আর বাস্তবটাই তার কাছে টিভি হয়ে ওঠে ক্রমশ। তুমি কি দেখছ কখনো এক জোড়া নরনারী প্রেম করতেছে, দেখছো কখনো বোমা ফাটতেছে, দাউ দাউ আগুন জ্বলতেছে, চাপা পড়ে আছে অসহায় কাতর মানুষ। জানো, জানো ওরা যখন বলে না, আমাকে কি শুনতে পাচ্ছেন, আমি নিজেই না কনফিউজড হয়ে যাই, ওরা কি আমারেই বলতেছে, আমি কি আসলেই তাদের কথা শুনতে পাইতেছি। তুমি তো পাশের বাড়ির লোকটার খবরই জান না। অথচ এ টিভির কি মহিমা, খালি বেডরুম কেন, মনের কতো গোপন কথা, গোপন খবর টিভি আমাদের জানায়া দেয়, বলো? শরাফত বুঝতে পারে বউয়ের জগতে কেবল চ্যানেলের বাস। শরাফত নাকি আর তারে উত্তেজিত করতে পারে না। বেদনা জাগাইতে পারে না। বউ এখন তার মায়ের লগেও ভিন ভাষায় কথা কয়, আইয়ে মা খানা তাইয়ার। মা বুঝে না, বলতেও পারে না কিছু, তার কাছে অচিন ঠেকে। চেনা ঠেকে যা, তা হইল ইশারা। ইশারায়ও সম্পর্ক টিকে থাকে। শরাফত আর আঁখির মধ্যে এখন যেমন আছে। বউ মনে করতে থাকে জীবনটাই এমন। জীবনটাই এক ইশারা। শরাফতরে বলেছে সে, দেখছ, কেমন ইশরা দেয়, ইশারাতেই ওরা হাসে আর কান্দে, আমার জীবনটা যে কেন এমন হইল না। এমন হইতে না-পারার বেদনায় সে জরজর। কত বিদ্যাশিক্ষা করলাম বাপে কত টাকা-পয়সা খরচ করল, কি হইল কও। টিপ দিলেই তো জীবনের পাল্টে যাবার কথা। শরাফত ছাড়া অন্য কেউ তো তার জামাই হইতে পারত। যার ঘরে আলোর নহর বয়ে যেত, দাসী-বাঁদি থাকত গন্ডাখানেক। আছে না, এমন জামাই আছে তো, নইলে টিভিতে কেমনে থাকে তারা। ভাত-কাপড়ের হিসাব করার জীবন বউয়ের ভাল্লাগে না। এথিকস তো টিভির মতোই একটা বিষয়। নাকি কও, তুমি আমারে পরকীয়া করতে দিবা না, ড্যাং ড্যাং কইরা ঘুরতে দিবা না, আমার জীবনে কোনো কাহিনি থাকবে না, ম্যারম্যারা একটা জীবন তো আমি চই না শরা। এমন আরো অনেক কথা আগাম বলে রাখে আঁখি। শরাফতরে আদর করে সে শরা ডাকে। বলে, তুমি একটা আহাম্মক, মাইয়া পটাইতে পার না। তুমি একটা ক্ষ্যাত। টিভিতে দেখা নানা জায়গায় যাওয়ার বাসনা করে। জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা। সুতরাং যা মন চায় করো। ঘরের বাঁধনে আরও টিকটিকি জমা হয়, আরও মশা আর মাকড়শাও একদিন। ঝুল জমে থাকে ছাদে। তাতে আটকা পড়ে মশারা। একদিন চোরও আসে। টাকা-পয়সা, গহনা সব নিয়ে যায়, টিভি ছাড়া। আঁখি গিয়েছিল গোসলে, টিভি বাজতেছিল, ঘরের দরজা খোলা রেখে বুয়া গিয়েছিল চলে। মা ছিলেন নামাজে, ছোট ভাই আর শরাফত অফিসে। চোর আইসা সব ছাফা কইরা দিয়া গেছে। আলমিরা খোলা ছিল কারণ বউ গোসলের পর পরবে বলে শাড়ি বের করেছিল। টিভিতে মগ্ন বউ সংসারের সমস্ত দরজা খোলা রেখে গোসলে গিয়েছিল। হয়তো কাজের বুয়াই কাজটা করছে, বা চোর হয়তো আনাড়িই ছিল, বা হয়তো চেনা-জানা কেউ। যার পক্ষে অল্প সময়ে চুরি করা সম্ভব। টিভি নিয়ে যেতে পারে নাই। এর ভার আছে, আকার আছে। পাঁচ তলা সিঁড়ি দিয়ে টিভি হাতে নামাটা সহজ না। শরাফত বাসায় এসে ঝিম ধরে বসে ছিল অনেকক্ষণ। তার বেডরুম আজ এতই অনিরাপদ। তার ব্যক্তিগত বলে কোনো বিষয় আর থাকল না। একান্ত বলে কোনো বিষয় আর নাই। তার ঘরে এখন কপাটহীন। চোর আসার পরেও অনেক দিন চলে গেছে। শরাফত তখনও বেডরুম ছাড়ে নাই। নিজের গাফেলতির বিষয়ে বউয়ের দুঃখ প্রকাশরে সে সম্মান দেখাইছে। এমন আর হবে না, যা গেছে তা গেছে, যা আছে তা নিয়াই আমরা থাকব—এটাই বলছিল বউ। কিন্তু এ সংসারে কি আছে? আছে টিভি। এরপর থিকা দরজা বন্ধ করতে ভুলে নাই তার বউ। সদর দরজা তো বটেই, নিজের দরজাও। নিজের বেডরুমের সামনে আইসা অপেক্ষায় থাকতে হইছে শরাফতরে। ভিতর থিকা নানা কিছিমের চিত্কার, বাজনা আসে। একটা গান চলে, বিরহ দৃশ্যের সঙ্গীত চলে, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল চলে। নিজের ঘরের দরজায় শরাফত বেকুব খাড়ায়া থাকে। এরপর দরজা খুললে বউ প্রথমে বিস্ময়, তারপর লজ্জা, এরপর হাসি, হাসি শেষে উষ্মা, কৌতূহল, চোখে-চোখ, এমন সব অনুভূতির ঘাট পার হয়ে তারপর শরাফত কখন আসছে তা জিজ্ঞেস করত। বউয়ের ভ্রু ভঙ্গিতে ক্যাটরিনা। টিভিটাই এখন তার হাতিয়ার আসলে। জিরো ফিগারের তালিম নিচ্ছে সে এখন। যদিও মোটা বউ শরাফতের ভাল্লাগে। গায়ে গোস্ত থাকবে, ঘামের গন্ধ থাকবে। আলুথালু বসনে হেঁটে বেড়াবে তার বউ। কিন্তু বউ কেন ক্যাটরিনা হইতে চায়। বউয়ের ফিগারটা খারাপ না। করলার মতো মসৃণতা আছে। বাড়তি মনে হয় না কিছুই। কালোর দিকেই গায়ের রঙ। এসব নিয়াই বউয়ের যত যাতনা। সে ফরসা হইতে চায়। অথচ জয়গামতো তার সব আছে, যেখানে যা থাকার কথা। আগে কথায় একটা চাঁদপুরের টান ছিল, এখন এসবের লেশমাত্র মাই। এখন হিন্দির মিশেল আছে। তাছাড়া এমনভাবে কথা বলে যেন শরাফত না, কথা বলতেছে হাশমির লগে। আও মেরে জান, কাঁহা সে আ রাহাহে তোম, মে তেরা ইন্তেজার করতা রাহা হুঁ। যেন শরাফতের আসার কথা টিভির ভিতর থিকা, ঠোঁটে লিপস্টিকের আভা থাকবে, ওয়েস্টার্ন একটা হ্যাঁ থাকবে। দেখা মাত্র, ছুঁইতে পারার মতো দূরত্বে আসলেই যেন থাকার মাহাত্ম্য নাই হয়ে যায়। টিভি দেখার সকল গুণাগুণ বউয়ের আয়ত্তে এখন। খেলা থেকে শুরু করে রাজনীতি। খবর হিসেবে সে সবই জানে। শরাফত যে খবর জানে না, তা সে বউয়ের কাছ থেকেই পায়। ম্যান ভার্সাস ওয়াইল্ড থিকা শুরু কইরা রোডিস, বিশ্বের তাবত জল-জঙ্গল ঘুরেফিরে ক্লান্ত বউটা যখন ঘুমায়, বউয়ের প্রতি মায়া আরও বাড়ে শরাফতের। সেই ঘোরে আরও অনেক দিন ছিল নিজের বেডরুমেই। কিন্তু সেদিন ঘটনাটা ঘটল। টিভি নষ্ট হয়ে গেছিল। রিমোট বা পিকচার টিউব, বা কিছু একটা। শরাফত সেদিন টিভি ঠিক কইরা দিল না। তারপর দিনও না। তৃতীয় দিন শরাফত আর নিজের রুমে ঢুকতে পারল না। টিভি ঠিক না-কইরা দেয়া পর্যন্তত আঁখি তারে রুমে ঢুকতে দিল না। মায়ের কোল ঘেেঁষ সেদিন নিথর শুয়ে ছিল শরাফত। মায়ের গায়ে কাদার বাস। নরম, উষ্ণ। মা এত গভীর, কত কিছু সে ধারণ করে। মাইলের পর মাইল, বিস্তীর্ণ আকাশের সবটা, ঝড় অথবা জলোচ্ছ্বাস সব মা-তেই মেলে। মা নিজেই একটা দেশ। টিভি আর মায়ের এমন রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়ে শরাফত দিশেহারা। সংলাপের কথা ভাবে সে। কিন্তু যে তত্ত্বের সমাধান তার হাতে নাই সেখানে সংলাপ দিয়ে কি হবে। তারপরও সংলাপের নিউজ ভ্যালু আছে। বউ খুব বলে নিউজ ভ্যালুর কথা। বলে, তোমার মধ্যে কোনো নিউজ ভ্যালু নাই। তারপর থিকা ড্রয়িংরুমে শোয় শরাফত। মা বার কয়েক কইছিল যা, বউয়ের লগে ঘুমা। এমন করিস না। বউও কয়দিন ঘুর ঘুর করছিল। সোহাগি স্বরে মিনতি জানাইছিল। আও মেরা জানু, রাগ করো ক্যান, আমি তো তোমারে সব জানাইছি। তুমি একটা আহাম্মক, সনাতন। জীবনে অনেক মাল-মাশলা লাগে। এই যে আমি রূপশিখার মতো জ্বলি, আমারে তুমি ফেলে রেখে আসলা। জ্বলে জ্বলে আমি গলে গলে জমা হই অন্ধকারে, তুমি ছুঁয়েও দেখ না। রাগ জমছে তোমার খুউব, আসো আমার কাছে, রাগ মোচন করে দেই। টিভি দেখে আমি অনেক কিছু শিখেছি, হি হি হি। তুমি কল্পনাও করতে পারবা না। না, কল্পনা করতে পারে না এখন আর শরাফত। একটা বাস্তবতার মধ্যে থাকতে থাকতে তার কল্পনাহীনতার রোগ হয়েছে। বউয়ের মধ্যে যত কল্পনা তা থেকে সে অনেক দূরে বাস করে। গা ঘেঁষে বসে পড়ে বউ। গুটিয়ে আসে শরাফত। আমি তোমারে গল্প শোনাবো, চলো।