নির্মলেন্দু গুণ

যিনি কবি তিনিই যোদ্ধা

আপডেট : ২০ জুন ২০১৩, ১৯:০৩
রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে শুরু করে শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ প্রত্যেকেরই অসামান্য দান আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে। আর কোন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম কবিদের প্রেরণায় এই পরিমাণে উদ্বুদ্ধ। আর কোন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম আর নতুন কাব্য রচনার সাধনা পস্পরের সঙ্গে মিলেমিশে এমন একাকার? বাংলাদেশ প্রকৃতই কবির দেশ, কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল শক্তি এসেছে বাংলা কবিতারই মানসসরোবর থেকে। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম, গুঢ়তর অর্থে কবিতারই মুক্তি সংগ্রাম। যে কবি সে-ই যোদ্ধা, কোনো না কোনো অর্থে, এই কথাটা মনে হলো আমার ‘আমার কণ্ঠস্বর’ পড়তে পড়তে। অথচ নির্মলেন্দুর ‘আমার কণ্ঠস্বর’ সমাজের জন্য অনুকরণীয় বা আদর্শ কোনো চরিত্রের আত্মস্মৃতি নয়। কজন কবির জীবনই বা সম্পূর্ণভাবে সমাজসম্মত? তবে নির্মলেন্দুর জীবন এবং সেই সঙ্গে তাঁর কবিতাও যেন বিশেষভাবেই সমাজের প্রচলিত, আরও যথাযথ করে বলা যায় যে, সমাজের প্রতিষ্ঠিত কাঠামো ও ধ্যান-ধারণাগুলোর বিরোধী। কবি নির্মলেন্দু বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে কলেজজীবন শুরু করেন। ‘স্বাধীন জীবন যাপনের প্রথম সুযোগ হাতে পেয়েই আমি হোস্টেল জীবনের প্রেমে পড়ি।’ এখানে ‘স্বাধীন’ শব্দটির প্রয়োগ লক্ষণীয়। কেননা তিনি বুঝতে পারেন, ‘শতকরা ষাট ভাগের নিচে নম্বর পাওয়ার স্বাধীনতা’ না থাকাটা পরাধীনতারই নামান্তর। তাঁকে তাঁর ‘স্বাধীন মানব’ বলে মনে হয় যার আছে বছরের পর বছর ফেল করার স্বাধীনতা। দ্বিতীয় বর্ষে নির্মলেন্দু গুণ হোস্টেলের ম্যানেজার হন। অমনি শুরু করেন টাকা মারা। ধরা পড়ে দোষ কবুল করেন, আবার চৌর্যবৃত্তির পক্ষে যুক্তিও দেখান। সেবার রেহাই পান সবার কাছে মাফ চেয়ে ও ম্যানেজারিতে ইস্তফা দিয়ে। কিন্তু অচিরেই ‘এক গভীর রাতে’ যখন তার রুমে জোর জুয়া চলছে তখন দরজায় কড়া নাড়া পড়ে। আর এক জুয়াড়ি বন্ধুর কথা ভেবে নির্মলেন্দু সাগ্রহে দরজা খুলে দেখেন, সাক্ষাত্ যম হোস্টেল সুপার। ‘ওটাই ছিল হিন্দু হোস্টেলের আমার শেষ রজনী।’ তখন সামনে আইএসসি ফাইন্যাল পরীক্ষা। টিসি নিয়ে চলে এলেন নেত্রকোনা কলেজে। নেত্রকোনার ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকায় তিনি বিদ্যালয়ের স্তরে কবিতা লিখতেন। আনন্দমোহন কলেজ ম্যাগাজিনেও তিনি লিখেছিলেন জীবনের প্রথম ইংরেজি কবিতা। নেত্রকোনায় এসে নির্মলেন্দু পেয়ে গেলেন একটি চমত্কার সাহিত্য পরিমণ্ডল।’ নেত্রকোনা কলেজ থেকে ১৯৬৪ সালে আইএসসি পরীক্ষায় নির্মলেন্দু গুণ একাই প্রথম বিভাগ এবং ফার্স্ট গ্রেড স্কলারশিপ পান। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতির জন্য এক বছর গ্যাপ দিয়ে যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চাইলেন, তখন মনোনীত হলেন না। মনে হয় তাঁর বড় ভাই যে ভারতে থাকেন এ তথ্যটির ভিত্তিতেই তাঁকে অমনোনয়ন করা হয়। অগত্যা ফিরলেন আবার সেই ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে। এটা সমাজবিজ্ঞানীদের সন্ধানের বিষয় হতে পারে যে, মার্কিন বিট প্রজন্ম কবিদের নিয়মভাঙা কবিতা ও জীবনভাবনা কেন পঞ্চাশ-ষাটের দশকের বাঙালি কবিদের প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল? অথচ এই ছিল সেই যুগ যখন এশিয়া আফ্রিকা ল্যাটিন আমেরিকার মানুষ বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়েছিল রুশ-চীন-ভিয়েতনাম-কিউবার সমাজতান্ত্রিক আদর্শবাদে। মার্কিনপন্থীরা মুক্তির এ রকম ব্যাখ্যা করেছিল, আর রুশপন্থীরা অন্যরকম। কবি কিন্তু নিজের মতো করে মুক্তির একটা ব্যাখ্যা করেই নেন। নির্মলেন্দু গুণ কবি হিসেবেই মুক্তির পর খোঁজা শুরু করেন। এবং নিজস্ব কবিতা উদ্ভাবনে সচেষ্ট হন। ‘আমি কবি খ্যাতি অর্জনের দুর্মর বাসনায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিলাম।’ নেত্রকোনার ‘উত্তর আকাশ’ অতিক্রম করে ১৯৬৫ সাল থেকে ঢাকার বিখ্যাত নানা পত্রপত্রিকায়ও তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতে শুরু করে, কোনো কোনো কবিতা খ্যতিও লাভ করে। ময়মনসিংহের কলেজ থেকে বিএসসি পরীক্ষা দেয়ার পরে নেত্রকোনা থেকে ‘সূর্য ফসল’ নামে একটি কাব্যসংকলন নির্মলেন্দু সম্পাদনা করেন। সম্পাদকীয় ও সংকলনভুক্ত কিছু কিছু কবিতার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের গোয়েন্দাবিভাগ নির্মলেন্দুর নামে মামলা রুজু ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। স্পষ্টতই পূর্বে উল্লিখিত ‘পঞ্চভূতের পাদপদ্মে আত্মোত্সর্গ করে তিনি সন্তুষ্ট হননি। অন্য কোনো এক বোধের তাড়নায় তিনি মুক্তির জন্য শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাকও দিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তার আগে বিএসসি পড়ার সময়ই ‘সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে পাকিস্তান নামক এই সামপ্রদায়িক রাষ্ট্রটিকে ভেঙেচুরে তছনছ করে দেবার বাসনা আমার মনে দানা বাঁধছিল।’ নির্মলেন্দুর এই বাসনার পেছনে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এক অনবদ্য প্রতীক। প্রথম সাক্ষাতের ঘটনাটি খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। নির্মলেন্দু ১৯৬৪ সালের একদিন ছিপ হাতে নেত্রকোনা থেকে ট্রেনে নিজের গ্রামে ফিরছেন শেখ মুজিবের কামরার হাতল ধরে ঝুলতে ঝুলতে। একটু পরে দরজা খুলে ঝুলন্ত যাত্রীদের ভেতরে ডাকা হলো। শেখ মুজিব ছিপটি চেয়ে নিয়ে কামরার মধ্যেই এমনভাবে ফেললেন যেন মাছ ধরবেন। বললেন, ‘এটা আমার খুব প্রিয় নেশা ছিল।’ তারপর নির্মলেন্দুর সঙ্গে কিছু কথাবার্তা বললেন। ‘শেখ মুজিবের সান্নিধ্য লাভের আনন্দ নিয়ে আমি নেমে গেলাম।’ তাঁকে নিয়ে ট্রেন চলে গেল। দেড় বছর পরে, ১৯৬৬ সালে, ঢাকা থেকে ‘আমাদের বাঁচার দাবি ৬ দফা কর্মসূচী’ পুস্তিকাকারে প্রকাশ করেন। তাঁর উত্থাপিত ওই বাঁচার দাবি ‘বাঙালির অবচেতনায় আঘাত হানে। বাংলার মানুষ তাদের ভবিষ্যত্ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে। শেখ মুজিব দেশব্যাপী গণজাগরণ সৃষ্টির লক্ষ্যে জনসভার পর জনসভা করে বেড়াতে থাকেন। তাই এক পর্যায়ে নারায়ণগঞ্জের জনসভা শেষ করে বাসায় ফিরলে পর ৮ মে তারিখে গভীর রাতে তাঁকে ধানমন্ডির বাসা থেকে পাকিস্তানের নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হয়। একই রাতে গ্রেফতার হন তাজউদ্দিন আহমেদসহ আরো বেশ কয়েকজন প্রথম সারির নেতা।’ পাকিস্তান সরকার মামলা সাজাল যে, শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সহকর্মীরা আগরতলায় গিয়ে ভারতের সঙ্গে মিলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছেন। এই মামলা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বলে পরিচিত। নির্মলেন্দু যখন প্রথাসিদ্ধ সমাজের কাঠামো ভেঙ্গে কবি-খ্যাতির জন্য আর অন্যদিকে পাকিস্তানি সরকারের শাসন ভেঙে শেখ মুজিবের ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য ব্যাকুল, তখন তিনি মিছেমিছি এক ডাকাতির মামলায় ফেঁসে গেলেন। শুরু হলো তাঁর পলাতক জীবন। দাদা তো আছেন ভারতে। কিন্তু ভারতে পালানোর পথে অলঙ্ঘ্য বাধা হয়ে দাঁড়ালো নেত্রকোনা কলেজের বন্ধু সহপাঠী ইলিয়াস। সে বিশ্বাস করত যে, ‘আগামী দিনগুলোতে শেখ মুজিবকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে বাঙালির স্বপ্ন ও সংগ্রাম।’ নির্মলেন্দুকে ইলিয়াস বলেন, ‘তোর কাজ হলো ভালা কবিতা লেখা। তুই কবিতা লিখবি মানুষের ঘুম ভাঙানের জন্য। পুলিশের ভয়ে তুই যদি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাস, এ কাজ করবে কে?’ ইলিয়াসের কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নির্মলেন্দু ঢাকায় এলেন। ‘আমি নতুন স্বপ্নে বুক বাঁধি। সেই স্বপ্ন হচ্ছে কবি হওয়ার স্বপ্ন। ...আমি বেশ বুঝতে পারি যে, এই বৈরী রাষ্ট্রব্যবস্থায় আমার পক্ষে কবি হওয়ার ছাড়া আর কোনও কিছুই হওয়া সম্ভব নয়।’ সুতরাং শুরু হলো ঢাকার সাহিত্য ও সংস্কৃতিজগতে নিজেকে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য নির্মলেন্দুর মরিয়া লড়াই। নির্মলেন্দু বুঝেছিলেন, ‘এখন ঢাকাকে কেন্দ্র করে কলকাতার বিকল্প একটি নতুন সাহিত্য পরিমণ্ডল গড়ে উঠতে শুরু করেছে। ...ক্রমে সেক্যুলার সাহিত্যের ধারাটিই যে এখানে প্রবল হয়ে উঠবে, তার লক্ষণ স্পষ্ট হচ্ছে।’ তিনি স্থির করেছিলেন যে, প্রথমে বন্ধুদের কাছে তেজগাঁও পলিটেকনিক ইস্টিটিউটের হোস্টেলে উঠবেন। ‘নিশ্চয়ই সেখানে আমার কিছু একটা কাজ জুটে যাবে। না জুটলে রিকশা চালাবো।’ যেমন ভাবা তেমন কাজ। ওই হোস্টেলের পুরোনো দুজন বন্ধু ছাড়াও অনেক নতুন বন্ধু পেয়ে গেলেন। আবার এমন ছেলেও পেলেন, যে বলেছিল, ‘এটা হচ্ছে মুসলমানের দেশ আমি যেন অবিলম্বে ভারতে চলে যাই। ...পরিস্থিতি আমি জীবনে আরও বহুবার মোকাবিলা করেছি। আমার খুব খারাপ লেগেছে। কিন্তু পরে যথারীতি ভুলে গেছি। আমার জন্মভূমির প্রতি খুব বাজে একটা ধরনের দুর্বলতা কাজ করত। ঐ জায়গাটায় আমি ছিলাম খুবই অসহায়।’ একদিন বন্ধু মামুন তাঁকে নিয়ে তেজগাঁও ইন্টারমিডিয়েট কলেজের অধ্যাপক ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকার সম্পাদক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কাছে যান। সম্পাদক নির্মলেন্দুকে ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকার জন্য ছোটখাটো কিছু কাজ তো দিলেনই, সেই সঙ্গে নিজের সাইকেলটিও ব্যবহার করতে দিলেন। ওই সাইকেলে চড়ে নির্মলেন্দু ঢাকার নতুন নতুন কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু করলেন। কিন্তু তাঁর ‘উদ্বাস্তু-উন্মূল যৌবনসঙ্গী’ কবি আবুল হাসানের সঙ্গে পরিচয় হয় ‘কণ্ঠস্বর’-এর পৃষ্ঠায়। ‘অর্থ নয়, বিত্ত নয়, প্রতিপত্তি নয়, এমনকি চূড়ান্ত অর্থে নারীও নয়—কবিতা, শুধু কবিতাই তার আরাধ্য।’ তাঁরা স্থির করলেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করবেন, ঘুরবেন, বেড়াবেন, সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে প্রেম করার চেষ্টা করবেন :কিন্তু ডিগ্রি নেওয়ার চেষ্টা করবেন না। সব ব্যাপারে তাঁদের মতের মিল ছিল না, তাঁদের কাব্যভাবনার বিরোধও ছিল। ঢাকাতে নির্মলেন্দুর জীবন ছিল পুরোপুরি বোহেমিয়ান। কোনো বিছানাপত্র বা বাড়তি জামাকাপড় নিয়ে তিনি ঢাকায় আসেননি, বাঁ-হাতে বাবার দেওয়া ঘড়ি আর ডান হাতে চার আনা সোনার একটি আংটি সম্বল করে বন্ধুদের ভরসায় এসেছিলেন। ঘড়িটি যায় জুয়ার আড্ডায় আর আংটিটি নিয়ে নেয় অবলা মাসির মেয়েরা। ‘এরপর যথার্থ অর্থে আমি ছিলাম একেবারে ঝাড়া হাত-পা। কবিতার পাণ্ডুলিপি ছাড়া আগলে রাখার মতো আমার আর কিছু ছিল না।’ এ জন্য কখনোই তাঁকে বিপন্ন মনে হয় না। ‘আমার কণ্ঠস্বর’ কী অসাধারণ কৌতূহলোদ্দীপক, পাঠকের অভিনিবেশের ওপর তার দাবি কত গভীর ও ব্যাপক। একদিকে জুয়া-মদ-সিদ্ধি-গণিকার দিকে অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ, অন্যদিকে কবিখ্যাতির জন্য দুর্মর আকাঙ্ক্ষা; একদিকে সমাজের প্রতি কবির দায়িত্ববোধ, অন্যদিকে কবিখ্যাতির জন্য দুর্মর আকাঙ্ক্ষা; একদিকে দুর্বার নিম্নমুখিতা এবং এইসব পরস্পরবিরোধী প্রবণতার টানাপোড়েনে মধ্যে কোনো অজ্ঞাত অসীমের জন্য অপার আকুতি তাঁকে কোনো কোনো বিরল মুহূর্তে অভিভূত করে। আবার এই সব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অনুভবের পাশাপাশি আছে ১৯৬৭-৬৮ সালের পূর্ব পাকিস্তানি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে অজস্র তথ্যপ্রভূত বিবরণ। এই বই লেখার সময়ে তিনি নিজেই একবার পেছনে ফিরে লিখেছেন যে, সেই ৬৮-৬৯ সালে ‘শুধু কবি হওয়ার জন্য কী পাগলামিটাই না করেছি।’ এবং ওই সময়েই পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে অলক্ষে শুরু হয় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। এই আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর একটি ছিল ১৯৬৮-র জুলাই মাসে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তন মঞ্চে অনুষ্ঠিত পাঁচ দিনব্যাপী ‘মহাকবি স্মরণোত্সব’। শুরু হয় মাইকেল মধুসূদনকে নিয়ে। রবীন্দ্রদিবসের অনুষ্ঠানের সভাপতি বলেন, ‘যাঁহারা ইসলাম ও পাকিস্তানী আদর্শের নামে রবীন্দ্রসঙ্গীত বর্জনের ওকালতি করিতেছেন তাঁহারা শুধু মুর্খই নহেন, দুষ্টুবুদ্ধি প্রণোদিত এবং তাঁহারা না বোঝেন রবীন্দ্রনাথ, না বোঝেন ইসলাম।’ পাকিস্তানবাদীদের রবীন্দ্র-বিরোধিতা বাংলা ভাষা ও বাঙলির মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বিপরীত দিক থেকে প্রবল প্রেরণা জোগায়। ইতিমধ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দী শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের জনমানসে পরিণত হন ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রধান অধিনায়কে। ‘আওয়ামী লীগের ছয় দফা কর্মসূচীর লক্ষ্যে তখন দেশ জুড়ে আন্দোলন দানা বাঁধছে।’ বাঙালি জাতীয়তাবাদী পত্রিকা ‘ইত্তেফাক’ সরকারি রোষানলে পড়ে বন্ধ। কিছুদিন বন্ধ থাকার পরে ‘সংবাদ’ আবার বেরোতে শুরু করলেও ’সংবাদ’-এর সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক রণেশ দাশগুপ্ত তখনো কারারুদ্ধ। আইয়ুব খানের বাহিনী বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে সবর্ত্র উদ্যত। সেই দুঃসময়ে শেখ মুজিবকে উত্সর্গ করে নির্মলেন্দু একটি দীর্ঘ কবিতা প্রকাশ করেন ‘সংবাদ’-এ। ‘ওটাই ছিল পূর্ব বাংলার নবীন নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে উত্সর্গ করা প্রথম কবিতা।’ নির্মলেন্দুর লেখনীতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে সেসব দিন। পরিস্থিতি সামলাতে খোদ আইয়ুব খান এলেন ঢাকাতে। কিন্তু পূর্ব বাংলার মানুষ তাঁকে ভাল করে বুঝিয়ে দেয় যে, শেখ মুজিবকে দেশদ্রোহী সাজাবার মামলাটি প্রেসিডেন্ট ও গর্ভনরকে গিলে ফেলতে হবে। বেপরোয়া পাকিস্তানি সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত জহুরুল হককে হত্যা করে। জনতা খেপে গিয়ে তিনজন মন্ত্রীর বাড়িতে এবং একজন বিচারপতির বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেবার একুশে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার ছুটি ঘোষণা করে। সেদিন ভোরে বাংলা একাডেমীর বটতলায় বসে শহীদদের উদ্দেশে নিবেদিত কবিতাপাঠের আসর। ওই আসরে নির্মলেন্দু প্রথম ছোট একটি কবিতা পড়েন, তারপরে পড়েন ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ নামক বিখ্যাত কবিতাটি। ওই দিন রবীন্দ্রসঙ্গীতের বিরুদ্ধে বিবৃতিদানের অভিযোগে তিন দালাল সাহিত্যিককে ছাত্র-জনতা একাডেমীর অনুষ্ঠান থেকে বহিষ্কার করে। এর পরদিন বাইশে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব মুক্তি লাভ করেন এবং ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহূত হয়। ‘আজ ২৩ জানুয়ারি ১৯৬৯। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ঢাকার সর্ববৃহত্ ময়দান রেসকোর্স মাঠে শেখ মুজিবের গণসংবর্ধনা।’ সংবর্ধনার উত্তরে তিনি প্রথমেই বলেন, ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাটির প্রকৃত নাম হওয়া উচিত ইসলামাবাদ ষড়যন্ত্র মামলা।’ তাঁর ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমরা রেডিও-টিভিতে নিয়মিত রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে চাই। রবীন্দ্রনাথ আমাদের গর্ব। তিনি বিশ্বকবি। তাঁর গান আমাদের গান। এই গান কেউ বন্ধ করতে পারবে না।’ ওই দিনই ওই সভাতে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ‘চরম নাটকীয় সংঘাতের উত্তুঙ্গ চূড়া স্পর্শ করে শেখ মুজিব যখন মুক্তি লাভ করেন, তখন শুধু পূর্ব পাকিস্তানে নয়, পশ্চিম পাকিস্তানেও আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।’ অতঃপর আইয়ুব খান কর্তৃক আয়োজিত লাহোরে গোলটেবিল বৈঠক। লাহোর যাওয়ার পথে ঢাকা বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধু বলেন যে, কমিউনিস্ট পার্টিকে প্রকাশ্য রাজনীতি করার অধিকার দেওয়া উচিত। আইয়ুব খান ২৪ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে রাজনীতির মঞ্চ থেকে অবতরণ করেন। সারা দেশে সামরিক আইন জারি করা হয়। এভাবে নির্মলেন্দু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ও ছাত্রসমাজের বহু রক্তদানে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জাতীয়তাবাদের অমোঘ অভ্যুত্থানের উত্তাল তরঙ্গমালার অত্যন্ত জীবন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশদ ও বিশ্বস্ত বিবরণ দিয়েছেন। আইয়ুব খানের অবতরণের পর নির্মলেন্দু সংঘবদ্ধ আন্দোলন থেকে অপসারন করে ফিরে গেছেন নিজের কাছে। ‘আন্দোলনের উন্মত্ততার মধ্যে আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম, গ্রামে আমার একটি বাড়ি আছে। বাড়িতে আমার বাবা-মা-ভাই-বোনেরা আছে। আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখলেও তারা আছে। তারা আমাকে নিয়ে ভাবে। তারা আমার জন্য দুশ্চিন্তা ভোগ করে।’ অতঃপর গ্রামে প্রত্যাবর্তন। তখন বাবা তাঁকে একান্ত অনুরোধ করে সে যেন গ্র্যাজুয়েট হওয়ার জন্য পরীক্ষা দেয়। একদা আবুল হাসানের সঙ্গে পরীক্ষা না দেওয়ার চুক্তি করেছিলেন, তবু নির্মলেন্দু বাবার অনুরোধে প্রাইভেটে বিএ পরীক্ষা দিয়ে তাঁর সার্টিফিকেটটা গ্রামে বাবার কাছে পাঠিয়ে দেন। ‘বাবার আনন্দবর্ধন করা ছাড়া আমার আর কোনও কাজে আসবে না।’ ঊনসত্তরের প্রথম দিকে ঢাকা রেডিও ষাট দশকের পাঁচজন কবিকে নিয়ে কবিতা পাঠের আয়োজন করে। ওই আসরে নির্মলেন্দুও কবিতা পাঠ করেন। ছেলের রেডিওতে কবিতা পাঠ সম্পর্কে বাবার প্রতিক্রিয়া ছিল বিচিত্র। তিনি লিখলেন যে, যে দিন জসীমউদ্দিন, সুফিয়া কামাল প্রমুখ কবিদের সঙ্গে নির্মলেন্দু কবিতা পড়ার সুযোগ পাবে সে দিন ছেলেকে বড় কবি বলে স্বীকার করবেন। ‘পূর্ব বাংলার কাদামাটির দেশে জন্মগ্রহণ করলেও, কী কারণে জানি না, আমার রক্তের মধ্যে লুকানো ছিল পশ্চিমের বিট বংশের বীজ। জীবনের বিধ্বংসী প্রবণতাকে প্রকাশ করার জন্য যেরূপ প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন, আমার চারপাশের বিবেচিত বড় কবিদের মধ্যে ছিল তার প্রচণ্ড অভাব। আমাদের অধিকাংশ কবির বেলাতেই কণ্ঠস্বর বর্ণিত “গৃহপালিত” অভিধাটি প্রযোজ্য ছিল। এমতাবস্থায়, মার্কিন বিট কবিদের কাছে মুক্ত, স্বাধীন ও বিধ্বংসী জীবনযাপনের পক্ষে সমর্থন লাভ করে আমি খুবই উপকৃত বোধ করেছিলাম।’ নির্মলেন্দু যতই নিজেকে উড়নচণ্ডী ও বিধ্বংসী রূপে উপস্থাপনের চেষ্টা করুন না কেন, তিনি যে বাংলা ভাষাগোষ্ঠীর বিগত অর্ধ শতাব্দীর এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্বের প্রত্যক্ষ দর্শনের ভিত্তিতে ইতিহাস ও এক অসাধারণ মানবিক দলিল হিসেবে এমন একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন এটাই প্রমাণ করে দেয় তাঁর নির্মাণ ও সংরক্ষণপ্রবণতা। অবশ্যই বিদ্যা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি প্রশংসনীয় মেধার অধিকারী, কিন্তু পাশাপাশি জুয়া নেশা ইত্যাদির অধীনতা তিনি যেভাবে সানন্দে স্বীকার করেছেন তা তাঁর স্বাধীনতার জন্য দুর্বার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে কী করে মেলে বোঝা কঠিন, কবিতা তাঁর চোখের মতো, আত্মার মতো, রক্তের মতো প্রিয় আবার তেমনই তাঁর রাজনীতি ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আবার ওই দায়বদ্ধতার পাশাপাশি গুণগ্রাহী গ্রন্থবিক্রেতার দোকান থেকে নির্দ্বিধায় পাশ্চাত্য কাব্যসংকলন চুরি করা, উদ্দাম বোহেমিয়ানার গভীরে অন্তর্লীন আত্মীয়-স্বজন ও স্বগ্রামের প্রতি মমতা প্রভৃতি পরস্পরবিরোধী বৈশিষ্ট্যের সহাবস্থান নির্মলেন্দুর চরিত্রকে বিশেষ আকর্ষণীয়, কৌতূহলোদ্দীপক, জটিল ও বর্ণাঢ্য করেছে। পড়তে পড়তে বারবার প্রশ্ন জাগে, একজন মানুষের মধ্যে এ রকম অসংগতির ধারণাগুলো এমন ঘোর অসামঞ্জস্য হয় কী করে! প্রকৃতপক্ষে সবমিলিয়ে ‘আমার কণ্ঠস্বর’ যুগ ও দেশের সম্বন্ধে এক মূল্যবান মানবিক দলিল পাঠের অভিজ্ঞতার অতিরিক্ত কিছু দেয়—ওই কিছুটা হলো মানবমনের গহন জটিল রহস্যময় অরণ্যে প্রবেশ ও পর্যটনের রোমাঞ্চ। ‘আমার কণ্ঠস্বর’ আত্মস্মৃতিমূলক বাংলা সাহিত্যে এক সম্পূর্ণ অভিনব কণ্ঠস্বর—আন্তরিক, আদর্শের ও প্রবৃত্তির দ্বন্দ্বে উদ্ভ্রান্ত্ম, শক্তিশালী ও সাহসী, সত্ ও সংরক্ত। বহু দিক থেকেই নির্মলেন্দু গুণের ‘আমার কণ্ঠস্বর’ অষ্টাদশ শতাব্দীর ফরাসি দার্শনিক জাঁ জাক রুশোর লেখা ‘স্বীকারোক্তি’ নামক বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থের সঙ্গে তুলনীয়। স্বাধীনতার স্বপ্নে উদ্বেলিত, কিন্তু প্রবৃত্তির নাগপাশে জর্জরিত। এ গ্রন্থ মানবিক অস্তিত্বের এমন এক বহুমাত্রিক প্রকাশ, যা একাধারে নাটকীয় ও মর্মস্পর্শী।