উত্থানপর্ব

আপডেট : ২০ জুন ২০১৩, ১৯:০৪
ঢাকা প্রিন্টমেকার্সের দলীয় প্রদর্শনী সময়টা ১৯৯৩। সাতজন প্রিন্টমেকার যূথবদ্ধ যাত্রা শুরু করেছিল। সেই প্রদর্শনীর সাথে ছাপাই ছবির আধুনিক চিন্তা ও প্রথাগত ছাপাই ছবি নির্মাণের পথ থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। তাত্পর্যময় ওই প্রদর্শনী থেকেই আমরা জানতে পারি, বাংলাদেশ ছাপচিত্র চর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক অতিক্রম করেছে। গুরু সফিউদ্দিন আহমেদ, কিবরিয়া আমাদের ছাপচিত্রে যে পথ দেখিয়েছেন তা আরও অনেকদূর এগিয়ে নেয়ার প্রত্যয় দেখা যায় এই সাত তরুণের চোখে। বর্তমান প্রদর্শনীটিতে ৫ জনের ছাপচিত্র রয়েছে। এরা সকলেই শিল্পকলার ক্ষেত্রে বিশিষ্টজন হয়ে উঠেছেন। বিগত শতাব্দীতে বিশ্বব্যাপী নানা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে শিল্পকলা নানা মাত্রা পেয়েছে। ছাপচিত্রে এর প্রভাব লক্ষণীয়। বিষয় বাছাই করার ক্ষেত্রে শিল্পীরা যত্নবান হয়েছেন। সমাজ, ব্যক্তিক ও আত্মিক ধ্যান যুক্ত করে ছাপচিত্র শিল্পে পরিবর্তন এনেছেন। ঢাকা প্রিন্ট মেকার্সের হংকংয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় প্রদর্শনী থেকে ছাপচিত্রের উত্কর্ষতা উঁকি দিচ্ছিল। ৩য় প্রদর্শনীটির পরে একরকম স্থির হয়ে যায় এ গোষ্ঠীটি। এ বছরের উত্থানপর্বে এ পাঁচ শিল্পীর অতি সাম্প্রতিক কিছু কাজ আমরা দেখতে পাচ্ছি। এই পাঁচ শিল্পী হলেন—রোকেয়া সুলতানা, আহমেদ নাজির, রফি হক, রশীদ আমিন ও মোস্তফা জামান। প্রদর্শনীর কাজগুলোর মাধ্যমে আমরা এ পাঁচ শিল্পীর নিয়মিত কর্মনিবিষ্টতার বিষয়টি বুঝতে পারি। মাধ্যমের নিরীক্ষা, রং ও কাগজের গায়ে ছাপ দেওয়া আলংকারিক আকৃতির উপস্থাপনের মাধ্যমে দক্ষতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সৃজনকর্মে অতিসাম্প্রতিক জিজ্ঞাসার উত্তর মেলে প্রদর্শিত শিল্পকর্মে। এ প্রদর্শনীতে অগ্রজ শিল্পীর মধ্যে আছেন রোকেয়া সুলতানা। তাঁর ছাপচিত্রে আমরা নানা পরিবর্তন দেখতে পাই। গত এক দশকে তিনি ছাপচিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। জল রং ও অ্যাক্রিলিকে আকাশ, জল, হাওয়ার রূপ নির্মাণ করেছেন। স্নিগ্ধ আকাশের সাথে জলের সম্পর্কের খোঁজ মিলেছিল ওই প্রদর্শনীতে। ছাপচিত্রের মৌলিক রীতি অব্যাহত রেখে ছবির প্লেটে যুক্ত করেছেন নানা আলংকরিক আকৃতি। এক রকম ছাপের বহু রঙা ছবির খোঁজ দেয় রোকেয়া সুলতানার শিল্পকর্ম। তাঁর এ প্রদর্শনীর বিষয় ‘ফাটা মরগানা’। এর মাধ্যম ইউনিক প্রেসার প্রিন্ট। অর্থাত্ একটি প্লেট থেকে অনেক রকম ছাপাই ছবির ইমেজ তৈরি করা। একুশ বছর পরে একজন পরিপূর্ণ শিল্পীর নিরীক্ষা আমাদের প্রাণবন্ত জীবনের আহ্বান জানায়। রোকেয়া সুলতানার কাজ প্রকৃতির কোমলতা ও স্নিগ্ধ রূপ আস্বাদনের সন্ধান দেয়। আহমেদ নাজির, শিল্পগুরু বাবা সফিউদ্দিন আহমেদের ছাপাই ছবির মৌলিক পথ থেকে শুরু করেছেন নিরীক্ষা। নিরীক্ষার ফলে বর্তমান প্রদর্শনীর ছবিগুলোতে গ্রাফিক্যাল ইমেজের সঙ্গে প্রযুক্তির সংশ্লিষ্টতায় নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে। এবারের প্রদর্শনীতে শিল্পী আহমেদ নাজির শিল্পী বাবার প্রতিকৃতি যুক্ত করে সাদাকালো রংয়ে সিরিজ এঁকেছেন। বিষয়—‘জার্নি অব অ্যা গ্রান্ড মাস্টার’। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে ছাপচিত্রের আদল অক্ষুণ্ন রেখে তিনি চিত্রতলে বিষয়কে নির্মাণ করেছেন। রফি হক ছাপচিত্রে পরিবর্তন এনেছেন ছবির প্লেটে ভারী জ্যামিতিক আকৃতি যোগ করে। কোলাজধর্মী ছবির জমিনে যুক্ত করা মুদ্রিত কাগজের পৃষ্ঠা ছবির বক্তব্য ধারণ করেছে। রফি হক এ ছবির মাধ্যম হিসেবে কাগজে তেল রং বেছে নিয়েছেন। কাগজ মাধ্যমে তেলরং প্রয়োগের ফলে রংয়ের প্রলেপ চুপসে যাওয়ার অভ্যেস বদলে দিয়েছেন। রফি হকের বিষয়ে আমরা নতুন এক বার্তা খুঁজে পাই। এবারের ছবিগুলোতে ‘শূন্য শব্দমালার অভিযাত্রা’ বোঝা যায় রং, রেখা ও করণশৈলীতে। রশীদ আমিন ছাপচিত্র বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন সুদূর চীন থেকে। চীনের ছাপচিত্র করণপদ্ধতিতে আধুনিকীকরণের ঝোঁক বোঝা যায় রশীদ আমীনের কাজ দেখে। বছর দুই আগে তিনি ঢাকায় গবেষণা শিক্ষা শেষে কাজে মনোযোগী হন। এ প্রদর্শনীর এচিং অ্যাকুয়াটিন্টের কাজে সূক্ষ্ম ও স্থূল আকৃতির অবস্থান চিত্রতলে জেঁকে বসেছে। এ শক্তির জন্যে রশীদ আমিনের ছাপচিত্র দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে। গতি আর আকৃতির দ্রুত লয়ই রশীদ আমিনের ‘ইন সার্চ অব ইনফিনিটি’ ছবির শক্তি। মোস্তফা জামান ছাপচিত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়েছেন আশির দশকের শেষার্ধে। ছাপচিত্র মাধ্যমে কাজের ধরনে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন প্রযুক্তির সাথে। প্রযুক্তির সাথে রেখাচিত্র, মানুষ ও পশুর অবয়ব যুক্ত করে তাঁর কাজের মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন ‘সি-প্রিন্ট’। বৃত্তের ঘূর্ণনের মাঝে অবস্থানরত মানুষ-পশুর যুক্ততা আমাদের কাছে এক নতুন অধ্যায়ের ঘোষণা দেয়। বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে গত ৮ জুন শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি শেষ হয়েছে গত ১৯ জুন।