এমন তো প্রায়ই হয়—খুঁজতে খুঁজতে হঠাত্ কী খুঁজছিলাম সেটাই ভুলে যাই। তবু হাতড়ে বেড়ানো জীবনের মতো—গন্তব্যবিভ্রমে ঘুরতে থাকা আর ঘুরতে থাকা । যদিও বালকের আগ্রাসী হাতে ছুঁড়ে দেয়া ঘূর্ণত লাটিম প্রতিবারই বিদ্ধ করে মাটির কোমল বুক। কিন্তু সে-ও কি সত্যিকারের কোনো গন্তব্য? পৃথিবী আর মহাকালের এইসব গন্তব্য আর গতিকে অমীমাংসার দোলাচলে রেখে বহুদিন পর ফিরে আসে তোমার প্লেনে ওড়ার আগের রাত, তোমার ফিরে যাবার দিন—এ যেন সমুদ্রস্নান শেষে মোটেলে ফিরে আসা পর্যটকের সেই বিকেল, যে বিকেলে তাকে দিয়ে আসতে হয় সমস্ত সঞ্চয় নিজেকে শূন্য করে ফেনিল তরঙ্গের ভাঁজে ভাঁজে। যার আর কোনো অতীত নেই বর্তমান নেই ভবিষ্যতও নেই সময়ের কোনো কণিকায়, সে এমনই নিঃস্বতা। এক শুষ্ক পাথর-মানুষ, এক ভাষাহীন হূদয়—মড়া-পোড়ানো শ্মশানের আহাজারি-শোক গোঙানো সন্ধ্যার পরই সে রাত। মাটি থেকে তোমাকে ছিন্ন করতে হয় শিকড়। পারা কি যায়, তবু চোখের নুন শাড়ির আঁচলে ঘষে ঘষে করে যেতে হয় নতুন করে ডালপালা ছড়ানোর ছল...
এরপর প্রতিদিন সময়কে গিলে ফেলা দিন, প্রতিদিন কত ছল, প্রতিদিন কত চাতুরির নিপুণতা, প্রতিদিন মেলে ধরে গোপনতার কারেন্ট জাল নিজেকে আড়াল করা, প্রতিদিন চাপা শীত্কারে ভেঙে ফেলতে চাওয়া সংসার নামের আটপৌরে চিড়িয়াখানা। প্রতিদিনের ফিসফিসে চাপা পড়েও পড়ে না সে রাতের রক্তস্রোতের জমাট খণ্ড খণ্ড বোবা দৃশ্যপট... স্মৃতিকে বন্দী করে ফেলতে চাওয়া কাচের বোতলে!
তবু পূর্ণ আর তলের স্পন্দন ছুঁতে পারা দৃষ্টিতে চোখটাকে যদি মেলতে পারো, দেখবে বনসাইয়ের কোঁচকানো বাকলে, কিম্ভূত পাতায় অরণ্যের কতটা আকুতি। আমাদের রক্তে বইছে কুরুক্ষেত্রের মারণবিষ, আমাদের সামনে এখনো অনেক যুদ্ধ, একদিন খুনি হয়ে উঠব আমরা অমোঘ নিয়তিতে। তবু আমাদের বাঁচিয়ে রাখে কোনো এক মায়াবি টান, সুন্দর বারবার ফিরে আসো তুমি প্রদীপশিখায় ধূলিজমা স্মৃতিকে সরিয়ে জীবনের রূপকথা শোনাতে...
