কুরআন-সুন্নাহর আলোকে শব-ই বরাত

আপডেট : ২০ জুন ২০১৩, ১৯:০৮
উসমান ইবনু আবিল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: “যখন মধ্য-শাবানের রাত আগমন করে তখন একজন আহ্বানকারী আহ্বান করতে থাকেন, কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোন যাচনাকারী আছে কি? আমি তাকে দান করব। ব্যাভিচারিণী ও শিরকে জড়িত ব্যতীত যত লোক যা কিছু চাইবে সকলকেই তাদের প্রার্থনা পূরণ করে দেয়া হবে (বায়হাকী)। আবূ উমামা (রা.)-এর সূত্রে, রাসূলুল্লাহ (স.) এর নামে বর্ণিত আছে যে: “পাঁচ রাতের দোয়া বিফল হয় না। রজব মাসের প্রথম রাত, মধ্য শাবানের রাত, জুমআর রাত, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার রাত।” কুরআন ও হাদীসে “লাইলাতুল বারাআত” পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়নি। সাহাবী-তাবিয়ীগণের যুগেও এ পরিভাষাটির ব্যবহার জানা যায় না। এ রাতটিকে হাদীস শরীফে “লাইলাতুন নিসফি মিন শা’বান” বা “মধ্য শা’বানের রজনী” বলা হয়েছে। সাহাবী তাবিয়ীগণের যুগের অনেক পরে এ রাতটিকে “লাইলাতুল বারাআত” বা “বিমুক্তির রজনী” বলে আখ্যায়িত করার প্রচলন দেখা দেয়। আমরা জানি, পরিভাষার বিষয়টি প্রশস্ত তবে মুমিনের জন্য সর্বদা কুরআন সুন্নাহ ও সাহাবীগণের ব্যবহূত পরিভাষা ব্যবহার করাই উত্তম। সাধারণ পাঠকের সহজবোধ্যতার জন্য আমরা মাঝে মাঝে “শব-ই বরাত” “লাইলাতুল বারাআত” পরিভাষা ব্যবহার করলেও সাধারণভাবে এ প্রবন্ধে “শব-ই বরাত” বুঝাতে “শাবান মাসের মধ্যম রজনী” বা “মধ্য-শাবানের রজনী” পরিভাষা ব্যবহূত হয়েছে। শব-ই বরাত বা লাইলাতুল বারা’আত পরিভাষা কুরআন কারীমে কোথাও ব্যবহূত হয়নি। “লাইলাতুন নিসফি মিন শা’বান” বা “মধ্য-শাবানের রজনী” পরিভাষাটিও হাদীসের ভাষা তবে কুরআন কারীমের একটি আয়াতের ব্যাখ্যার মুফাসিসরগণ “শব-ই বরাত” প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন: “আমি তো তা অবতীর্ণ করেছি এক মুবারক (বরকতময়) রজনীতে এবং আমি তো সতর্ককারী। এ রজনীতে প্রত্যক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয় (সূরা দুখান-৩-৪ আয়াত)। ‘মুবারক রজনী’-র ব্যাখ্যায় বিভিন্ন সাহাবী ও তাবিয়ী বলেছেন যে, এ রাতটি হলো ‘লাইলাতুল কাদ্র’ বা ‘মহিমান্বিত রজনী’। সাহাবীগণের মধ্য থেকে ইবনু আব্বাস (রা.) ও ইবনু উমার (রা.) থেকে অনুরূপ ব্যাখ্যা বর্ণিত হয়েছে। তাবেয়ীগণের মধ্যে থেকে আবু আব্দুর রহমান আল-সুলামী (৭৪ হি), মুজাহিদ বিন জাব্র (১০২ হি), হাসান বসরী (১১০ হি), ক্বাতাদা ইবনু দি’আমা (১১৭ হি) ও আব্দুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম (১৮২ হি) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁরা সকলেই বলেছেন যে, লাইলাতুম মুবারাকাহ অর্থ লাইলাতুল কাদ্র (তাবারী)। কুরআন কারীমে ‘শব-ই-বরাত’ বা ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শা’বান’ সম্পর্কে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। মধ্য শা’বানের রজনী বা শব-ই বরাত সম্পর্কে প্রচলিত হাদীসগুলোকে সেগুলোর অর্থ ও নির্দেশনার আলোকে সাত ভাগে ভাগ করা যায়: ১. সাধারণ ফযীলতের হাদীস। ২. উক্ত রাতে হায়াত মওত ও রিযক নির্ধারণ বিষয়ক হাদীস। ৩. এ রাতে দোয়া-মুনাজাত করতে উত্সাহজ্ঞাপক হাদীস। ৪. এ রাতে অনির্ধারিতভাবে সালাত আদায়ে উত্সাহজ্ঞাপক হাদীস। ৫. নির্ধারিত রাক’আত সালাত নির্ধারিত পদ্ধতিতে আদায়ে উত্সাহজ্ঞাপক হাদীস। ৬. সনদ বিহীন কিছু প্রচলিত কথা। ৭. উক্ত রাত সম্বন্ধে সাহাবা ও তাবেয়ীগণের পক্ষ থেকে কতিপয় বক্তব্য ও আমল। আবু মুসা আশআরী (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, “মহান আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন” (ইবনু মাজাহ)। আবু সা’লাবা আল-খুশানী (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন: “যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন আল্লাহ্ তা’য়ালা তাঁর সৃষ্টি জীবের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। অতপর মুমিনদেরকে মার্জনা করে দেন। আর হিংসা-বিদ্বেষ ও পরশীকাতরতায় লিপ্তদেরকে তাদের অবস্থায় ছেড়ে দেন। আমলে সুন্নাহ-২২৩-২২৪ পৃ:। আবুবকর (রা.) বর্ণনা করেছেন, “যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন আল্লাহ্ তা’য়ালা দুনিয়ার আসমানে অবরতণ করেন। অত:পর তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে শিরকে জড়িত অথবা নিজের ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন।” এ হাদীসটি ইমাম বয্যার ও অন্যান্য মুহাদ্দিস আব্দুল মালিক ইবনু আব্দুল মালেকের সনদে আবু বাক্র (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। আল্লামা হায়সামী বলেন, এ সনদের আব্দুল মালেক ইবনু আব্দুল মালেককে ইবনু আবি হাতিম (রা.) তার ‘আল-জারহু ওয়াত তা’দীল’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন তবে তার কোনো দুর্বলতা উল্লেখ করেননি। এছাড়া সনদের রাবীগণ নির্ভরযোগ্য। কিন্তু ইমামুল মুহাদ্দিসীন ইমাম বুখারী (রা.) উক্ত আব্দুল মালেক ইবনু আব্দুল মালেক এবং তার এ সনদকে দুর্বল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বুখারী-৫/৪২৪ আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন: “মহিমান্বিত পরাক্রান্ত আল্লাহ মধ্য শা’বানের রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। অত:পর ‘কালব’ সম্প্রদায়ের মেষপালের পশমের চেয়েও অধিক সংখ্যক লোককে ক্ষমা করে দেন।” হাদীসটি ইমাম তিরমিযী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস দুর্বল সনদে বর্ণনা করেছেন। আয়শার (রা.) বলেন, মধ্য শাবানের রাতে কিছু আছে কি? “এ রাতে চলতি বছরে জন্ম-গ্রহণকারী আদম সন্তানদের নাম এবং চলতি বছরে মৃত্যুবরণকারী আদম সন্তানদের নাম লিপিবদ্ধ করা হয়। এ রাতে আদম সন্তানদের আমল উঠিয়ে নেয়া হয় এবং তাদের রিযক অবতীর্ণ হয়। (বায়হাকী) আয়শার (রা.) সূত্রে বলা হয়, “মহান আল্লাহ্ চার রাতে হায়াত, মওত ও রিয্ক লিপিবদ্ধ করেন। মধ্য শাবান, ঈদুল আযহা, ঈদুল ফিতর ও আরাফার রাতে।” এ হাদীসটি ইবনু হাজার আসক্বালানী (৮৫৫ হি) তাঁর যয়ীক রাবীদের জীবনীগ্রন্থ “লিসানুল মীযান’-এ উল্লেখ করেছেন। তিনি আহমদ ইবনু কা’ব আল ওয়াছেতী নামক ৪র্থ হিজরী শতাব্দীর একজন দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য রাবীর জীবনীতে এ হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, আহমদ ইবনু কা’ব বর্ণিত বাতিল ও মুনকার হাদীসগুলোর মধ্যে এ হাদীসটি অন্যতম। মধ্য শাবানের রজনীর ফযীলত বিষয়ে বর্ণিত তৃতীয় প্রকারের হাদীসগুলোতে এ রাত্রিতে সাধারণভাবে দোয়া করার উত্সাহ প্রদান করা হয়েছে। এ রাতে দোয়া করা, আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য আকুতি জানানো এবং জীবিত ও মৃতদের পাপরাশি ক্ষমা লাভের জন্য প্রার্থনা উত্সাহ প্রদান করা হয়েছে। উসমান ইবনু আবিল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন: “যখন মধ্য-শাবানের রাত আগমন করে তখন একজন আহ্বানকারী আহ্বান করতে থাকে, কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোন যাচনাকারী আছে কি? আমি তাকে দান করব। ব্যাভিচারিণী ও শিরকে জড়িত ব্যতীত যত লোক যা কিছু চাইবে সকলকেই তাদের প্রার্থনা পূরণ করে দেয়া হবে (বায়হাকী)। আবূ উমামা (রা.)-এর সূত্রে, রাসূলুল্লাহ এর নামে কথিত আছে যে: “পাঁচ রাতের দোয়া বিফল হয় না। রজব মাসের প্রথম রাত, মধ্য শাবানের রাত, জুমআর রাত, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার রাত।” আয়শা (রা:) বলেন, “রাসূলুল্লাহ আমার ঘরে প্রবেশ করলেন এবং তাঁর পোশাকটি খুলে রাখলেন। কিন্তু তত্ক্ষণাত্ আবার তা পরিধান করলেন। এতে আমার মনে কঠিন ক্রোধের উদ্রেক হয়। কারণ আমার মনে হলো যে, তিনি আমার কোন সতীনের নিকট গমন করেছেন। তখন আমি বেরিয়ে তাঁকে অনুসরণ করলাম এবং দেখতে পেলাম যে, তিনি বাক্বী গোরস্থানে মুমিন নরনারী ও শহীদদের পাপ মার্জনার জন্য দোয়া করছেন। আমি (মনে মনে) বললাম, আমার পিতা মাতা আপনার জন্য কুরবানী হউন, আমি আমার জাগতিক প্রয়োজন নিয়ে ব্যস্ত আর আপনি আপনার রবের কাছে ব্যস্ত। অত:পর আমি ফিরে গিয়ে আমার কক্ষে প্রবেশ করলাম, তখন আমি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে হাঁপাচ্ছিলাম। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স.) আমার নিকট আগমন করে বললেন, আয়শা, তুমি এভাবে হাঁপাচ্ছ কেন? আয়শা বললেন, আমার পিতা মাতা আপনার জন্য কুরবানী হউন, আপনি আমার কাছে আসলেন এবং কাপড় খুলতে শুরু করে তা আবার পরিধান করলেন। ব্যাপারটি আমাকে খুব আহত করল। কারণ আমি ধারণা করেছিলাম যে, আপনি আমার কোন সতীনের সংস্পর্শে গিয়েছেন। পরে আপনাকে বাক্বী’তে দোয়া করতে দেখলাম। তিনি বললেন, হে আয়েশা, তুমি কি আশংকা করেছিলে যে, আল্লাহ ও তদীয় রাসুল তোমার উপর অবিচার করবেন? বরং আমার কাছে জিবরাঈল (আ.) আসলেন এবং বললেন, এ রাত্রটি মধ্য শাবানের রাত। আল্লাহ তা’য়ালা এ রাতে ‘কালব’ সম্পদায়ের মেষপালের পশমের চাইতে অধিক সংখ্যককে ক্ষমা করেন। তবে তিনি শিরকে লিপ্ত, বিদ্বেষী, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, কাপড় ঝুলিয়ে (টাখনু আবৃত করে) পরিধানকারী, পিতা মাতার অবাধ্য সন্তান ও মদ্যপায়ীদের প্রতি দৃষ্টি দেন না। অত:পর তিনি কাপড় খুললেন এবং আমাকে বললেন, হে আয়শা, আমাকে কি এ রাতে ইবাদত করার অনুমতি দিবে? আমি বললাম, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উত্সর্গিত হোন! অবশ্যই। অত:পর তিনি সালাত আদায় করতে লাগলেন এবং এমন দীর্ঘ সিজদা করলেন আমার মনে হলো যে, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। অত:পর আমি (অন্ধকার ঘরে) তাকে খুঁজলাম এবং তাঁর পদদ্বয়ের তালুতে হাত রাখলাম। তখন তিনি নড়াচড়া করলেন। ফলে দুশ্চিন্তা-মুক্ত হলাম। আমি শুনলাম, তিনি সিজদারত অবস্থায় বলছেন: ‘আমি আপনার কাছে শাস্তির পরিবর্তে ক্ষমা চাই, অসন্তুষ্টির পরিবর্তে সন্তুষ্টি চাই। আপনার কাছে আপনার (আজাব ও গজব) থেকে আশ্রয় চাই। আপনি সুমহান। আপনার প্রশংসা করে আমি শেষ করতে পারি না। আপনি তেমনই যেমন আপনি আপনার প্রসংশা করেছেন। আয়শা (রা.) বলেন, সকালে আমি এ দোয়াটি তাঁর কাছে উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, হে আয়শা, তুমি কি এগুলো শিখেছ? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, হে আয়শা তুমি এগুলো ভাল করে শিখ এবং অন্যকে শিক্ষা দাও। জিবরাঈল (আ.) আমাকে এগুলো শিক্ষা দিয়েছেন এবং সিজদার ভিতরে বারবার বলতে বলেছেন। (বায়হাকীর শুয়াবুল ইমান ২/৩৮৩)।