চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের অপতত্পরতার কারণে পুরোদমে অপারেশনে যেতে পারছে না। সর্বশেষ গত সপ্তাহে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বন্দর কর্তৃপক্ষ সকল যন্ত্রপাতি ক্রয় করবে। এছাড়া ৩ বছরের জন্য অপারেটর নিয়োগ করা হবে। ৫টি বার্থ নিয়ে গঠিত এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই কন্টেইনার টার্মিনালটি কিভাবে অপারেশন কাজে যাবে গত প্রায় ১০ বছরেও ঠিক করা যায়নি। ২০০৩ নাগাদ এর কাজ শুরুর সময় তত্কালীন সরকার বন্দর ব্যবহারকারীদের দাবির প্রেক্ষিতে বলেছিল, এটি বেসরকারি পর্যায়ে ছেড়ে দেয়া হবে। ২০০৮ সালে এর ইয়ার্ডের কাজ শেষ হয় এবং পরবর্তীতে ব্যাকআপ সুবিধার কাজ সম্পন্ন হয়। কিন্তু এ পর্যন্ত ব্যবসায়িদের বারবার দাবির পরও এনসিটি পুরোদমে চালু করা সম্ভব হয়নি।
নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় তথা চবক থেকে প্রথমে সিদ্ধান্ত হয়, সকল যন্ত্রপাতি অপারেটর ক্রয় করে অপারেশন কাজ পরিচালনা করবে। চবক শুধুমাত্র ইয়ার্ড নির্মাণসহ ব্যাকআপ সুবিধার কাজ সম্পন্ন করে দেবে। এর জন্য আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। এক্ষেত্রে ৪টি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কারিগরি যোগ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। কিন্তু স্থানীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের দাবির প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে আরো ২টি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু পূর্ববর্তী যোগ্য ৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২টি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বন্দরের টেন্ডার রিভিউ বোর্ডে (সিপিটিইউ) আপত্তি জানায়। সিপিটিইউ শুনানী শেষে নতুনভাবে তালিকাভুক্ত ২টি প্রতিষ্ঠানকে বাতিল করার সিদ্ধান্ত দেয়। ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান দু’টি উচ্চ আদালতে মামলা করলে পুরো প্রক্রিয়া ঝুলে যায়। মামলার কারণে এনসিটি’র অপারেশন কাজ অনিশ্চিত হয়ে পড়ার প্রেক্ষিতে সরকার চবকের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রায় সাড়ে ৬০০ নতুন লোক নিয়োগের মাধ্যমে চবক কর্তৃক এনসিটি পরিচালনা করা যুক্তিযুক্ত হবে না। অপরদিকে এনসিটি পুরোদমে পরিচালনার জন্য ১৩২টি যন্ত্রপাতি ক্রয় করতে হবে। এই ১৩২টি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে প্রায় ১৬শ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
সার্বিক অবস্থা বিবেচনা না করে চবকের পক্ষ থেকে ১০টি কী গ্যান্ট্রিক্রেন ও ২টি রেল মাউন্টেড গ্যান্ট্রিক্রেন (আরএমজি) নিজস্ব অর্থায়নে ক্রয় করার সিদ্ধান্ত হয়। পুরো এনসিটি পরিচালনায় প্রয়োজনীয় ১৩২টি যন্ত্রপাতির মূল্য ১৬শ কোটি হলেও এই ১২টি ক্রেনের মূল্যই প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। চবকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাদবাকি যন্ত্রপাতি নিয়োগকৃত অপারেটর প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব অর্থায়নে সংগ্রহ করবে। চবক ওই অপারেটর প্রতিষ্ঠানকে ২৫ বছরের চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োগ করবে। এর আলোকে চবক ১২টি ক্রেন ক্রয় করার জন্য উন্নয়ন পরিকল্পনা (ডিপিপি) গ্রহণ করেছিল। কিন্তু গত সপ্তাহে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটিতে এনসিটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করা হয়। এতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সকল যন্ত্রপাতি ক্রয় করবে। চবকের নিয়োগকৃত অপারেটর প্রতিষ্ঠান বন্দরের ক্রয়কৃত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করবে। এক্ষেত্রে অপারেটর প্রতিষ্ঠানকে ৩ বছরের জন্য প্রতিযোগিতা মূল্যে নিয়োগ করবে। জানা যায়, সংসদীয় কমিটির উক্ত সুপারিশের ব্যাপারে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় এখনও কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি।
নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সদস্য শামসুল হক চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, আমরা একই প্রতিষ্ঠানকে এনসিটি অপারেশনের দায়িত্ব ২৫ বছরের জন্য দেয়ার বিপক্ষে। প্রতি ৩ বছর অন্তর অন্তর টেন্ডারের মাধ্যমে সর্বনিম্ন দরদাতাকে হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব দেয়া হবে। তিনি বলেন, এনসিটি’র জন্য জরুরি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিসমূহ পর্যায়ক্রমে ক্রয় করা হবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে এনসিটি দীর্ঘদিন ধরে পরিপূর্ণ অপারেশনে যেতে পারছে না।
