++ যাতায়াতে সময় সংক্ষেপের পুনঃপ্রতিশ্রুতি
++ আগের দুই দফা সার্ভিস গায়েব, এবার ‘তৃতীয় সংস্করণে’র চমক
++ এবারে নামছে চারটি, আসছে আরো চার
রাজধানী ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার জলপথে ফের চালু হতে যাচ্ছে ওয়াটার বাস সার্ভিস। চলতি বছর ৬টি ওয়াটার বাস চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সদরঘাট-গাবতলী-আমিন বাজার রুটে এসব ওয়াটার বাস চলাচল করবে।
রাজধানীর যানজট কমাতে যানজটমুক্ত পরিবেশে অল্প সময়ে, কম খরচে যাতায়াত সুবিধা দিতে গাবতলী টু সদরঘাট ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু হয় ২০১০ সালের ২৮ আগস্ট। ওয়াটার বাসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিন মাসের মধ্যে আরো ১০টি ওয়াটার বাস চালু করা হবে। ১১ মাস চালু থাকার পর ২০১১ সালের ১০ জুন বন্ধ হয়ে যায় ওয়াটার বাস সার্ভিস। এতে লোকসান হয় ৫০ লাখ টাকা। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কিছু অদক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণেই ওয়াটার বাস সার্ভিস বন্ধ হয়েছে বলে দাবি করেন নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান।
তিন বছর পর সদরঘাট থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত আবারও চালু হবে ওয়াটার বাস সার্ভিস। এই কারণে তৈরি হয়েছে চারটি নতুন ওয়াটার বাস। যাত্রীদের ওঠানামার জন্য নতুনভাবে তৈরি হচ্ছে আমিনবাজার ল্যান্ডিং স্টেশন। নির্মিত প্রতিটি ওয়াটার বাসে ৮১টি আসন রাখা হয়েছে। যাত্রী ও নৌযান-সংকট আর নৌযানে ত্রুটি, এর সঙ্গে স্টেশনগুলোর অব্যবস্থাপনায় আগের দুইবারই এই উদ্যোগ চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তবু ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ করে তৃতীয়বারের মতো রাজধানী ঢাকার নৌপথে পুনরায় চালু হচ্ছে ওয়াটার বাস সার্ভিসের তৃতীয় সংস্করণ।
নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলছেন, এবার ওয়াটার বাস চালু করে মন্ত্রী হিসেবে তিনি ‘সফলতায় পূর্ণতা’ আনতে চান। মন্ত্রীর এই ‘সাফল্য’ আনতে তিন কোটি টাকা খরচে নির্মিত নতুন চারটি ওয়াটার বাস চলবে আগের মতোই সদরঘাট থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত। এর সঙ্গে যোগ হবে তিন বছর ধরে পরিত্যক্ত আগের দুটি ওয়াটার বাস ‘এমএল তুরাগ’ ও ‘এম এল বুড়িগঙ্গা’।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালে ওয়াটার ট্যাক্সি নাম দিয়ে একটি নৌযান নামানো হয়েছিল। উদ্বোধন করেছিলেন তত্কালীন নৌমন্ত্রী আকবর হোসেন। বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মজিবর রহমান জানান, জ্বালানি (অকটেন) খরচ বেশি হওয়ায় এবং যাত্রী-সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যায় নৌযানটি। ছয় বছর পর ২০১০ সালের ২৮ আগস্ট দেড় কোটি টাকায় তৈরি ৩৫ আসনের ‘এমএল তুরাগ’ ও ‘এমএল বুড়িগঙ্গা’ নামিয়ে ওয়াটার বাস সার্ভিস উদ্বোধন করেন বর্তমান নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। তখন ৩০ টাকা ভাড়া ছিলো। কিন্তু হায়! নৌযানে যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য দেড় বছরের মধ্যেই সেই ওয়াটার বাস সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়। তিন বছর পর এবার চলতি জুন মাসের যেকোন দিন তৃতীয়বারের মতো উদ্বোধন করা হবে ওয়াটার বাস সার্ভিস।
বিআইডব্লিউটিসি সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের ১০ জুন ওয়াটার বাস সার্ভিসের দ্বিতীয় সংস্করণ বন্ধের কারণগুলোর একটি নৌযান দুটির যান্ত্রিক ত্রুটি। এবার বহরে যোগ হচ্ছে চারটি ওয়াটার বাস। বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জে বেসরকারি নৌযান নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ঢাকা ডকইয়ার্ড লিমিটেডের কারখানায় নির্মিত এই চারটি নৌযানের নক্শায় ত্রুটি ধরা পড়েছে। গত এপ্রিল মাসে বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তা পরিদর্শনে গিয়ে নৌযান চারটির নক্শা পরিবর্তনের নির্দেশ দেন। এ-সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা ডকইয়ার্ড লিমিটেডের এ কৌশলী কাজী নাইমুল ইসলাম ‘ইত্তেফাক’কে বলেনঃ বিআইডব্লিউটিসির নির্দেশনায় ওয়াটার বাসগুলোর চারপাশে অ্যালুমিনিয়ামের শিট দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে। এরপর জানালা বসানো হয়েছে। ওয়াটার বাস চারটিই পুরোপুরি প্রস্তুত। ৩০৪ অশ্ব শক্তির ইঞ্জিন সম্বলিত ৮১ আসনের প্রতিটি ওয়াটার বাস আধা ঘণ্টায় সদরঘাট থেকে আমিনবাজার চলে আসবে। বিআইডব্লিউটিসির সবুজ সংকেত পেলে বুঝিয়ে দেয়া হবে এই চারটি নৌযান। নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেনঃ প্রথমে বুঝতে ভুল করায় ওয়াটার বাসগুলোর চারদিকে উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল। নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে কাঠামো পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়া হয়। জানা গেছে, আরও চারটি নতুন ওয়াটার বাস তৈরির কার্যাদেশ পেতে যাচ্ছে ঢাকা ডকইয়ার্ড। এবারে খরচ পড়বে পাঁচ কোটি টাকা।
আগের দুই বারের মতই নির্বিঘ্নে ও স্বল্প সময়ে যাতায়াতের প্রতিশ্রুতি দিয়েই এবারো ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু করা হবে। মতিঝিলে বিআইডব্লিউটিসির প্রধান কার্যালয়ে এমনই বললেন সংস্থার চেয়ারম্যান মজিবর রহমান। যাত্রী ওঠানামায় সদরঘাট থেকে আমিনবাজার যেতে নৌপথের আরও পাঁচটি স্টেশনে থামানো হবে ওয়াটার বাস। একেকটি স্টেশনে এই কাজ সারতে চলে যাবে কমপক্ষে ২০ মিনিট। সব মিলিয়ে প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা। এর সঙ্গে যোগ হবে নৌপথের আধা ঘণ্টা। একবার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে গুনতে হবে ৫০ টাকা। তবে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মজিবর রহমানের দাবি, একবার যেতে সময় সোয়া এক ঘণ্টার বেশি লাগবে না। ভাড়া আগের চেয়ে বেশি হলেও তাদের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। অবশ্য এবারে নৌযানসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় স্টেশনে যাত্রীদের অপেক্ষা করতে হবে না।
বিআইডব্লিউটিসি চেয়ারম্যান মজিবর রহমান বললেনঃ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, হংকংসহ বিশ্বের বহু উন্নত দেশে ওয়াটার বাস সার্ভিস আছে। নগরীর যানজট নিরসন ও নৌপথে পণ্য পরিবহনে গতি ফিরিয়ে আনতে সরকার এই পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। স্পিড বোটের আদলে এই ওয়াটার বাস নির্মাণ করা হয়েছে। পরবর্তী ধাপে যাত্রী সমাগম ও নদীর নাব্যতা বুঝে দ্বিতল ওয়াটার বাস সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এবার ওয়াটার বাস প্রকল্প সফল হবে বলে দাবি করেছেন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। ভালো সেবা পেতে হলে ভাড়া একটু বেশিই দিতে হয়। তবে যাত্রীদের সুবিধার জন্য ভাড়া কমানো হবে। মন্ত্রী বলেন, রাজধানীর যানজট নিরসনে এবং নৌপথকে নিরাপদ ও গণমুখী করতে বুড়িগঙ্গাসহ দেশের ৫৩টি নৌ-রুট খননের পরিকল্পনা রয়েছে। নৌপথ খননে কমপক্ষে ৫০টি ড্রেজার দরকার। সরকারের কাছে আছে মাত্র ৪টি ড্রেজার। বেসরকারি পর্যায়ে আরো ৪টি ড্রেজার সংযুক্ত হয়েছে। সরকার ১৭টি ড্রেজার কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তিনি বেসরকারি সংস্থাসমূহকে নদীখননে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ এমপি বলেন, রাজধানীতে ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু একদিকে দূষণের কবল থেকে পরিবেশ রক্ষা পাবে, অন্যদিকে যাতায়াত খরচ ও সময় কমে আসবে। প্রকল্পের মাধ্যমে নদী নাব্যতা ফিরে পাবে। ঢাকার চারপাশে নদীগুলোর দূষণের মাত্রা কমবে।
