সিলেট ও কুষ্টিয়া জেলার প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (পিটিআই) কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হলেও তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ল্যাব পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল নিয়োগ করা হয়নি। সরবরাহকৃত ইউপিএস অকেজো। প্রকল্পের সময় শেষ হয়ে গেলেও স্থাপন করা হয়নি মাল্টিমিডিয়া স্ক্রিন। নেই ইন্টারনেট সংযোগ।
খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলায় দক্ষিণডিহি বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ে শিক্ষা উপকরণসমূহ বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে প্রদর্শন না করে আলমারির ভেতর দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (২) বাস্তবায়ন শেষ হলেও অনেকক্ষেত্রে এর সুফল মিলছে না। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে এমন তথ্য ফুটে উঠেছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে উন্নীত না হওয়ারও অভিযোগ করা হয়েছে। গত মার্চ মাসে পরিদর্শন প্রতিবেদনটি তৈরি হলেও গত সপ্তাহে কর্মসূচির চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করে আইএমইডি। পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে বিদ্যালয়গুলোতে স্থাপিত নলকূপের অধিকাংশ ইতিমধ্যে অকেজো হয়ে গেছে। সিলেট অঞ্চলের স্থাপিত নলকূপগুলোর অধিকাংশ অকেজো। নির্ধারিত গভীরতার চেয়ে কম গভীরতায় নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। কুষ্টিয়া সদর উপজেলা রিসোর্স সেন্টারে ২২০ ফুট গভীরতায় নলকূপ স্থাপন করার কথা থাকলেও ১৩০ ফুট গভীরতায় স্থাপন করা হয়েছে। পরিদর্শিত বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-ছাত্রী উপস্থিতির হার অনেক কম। বিশেষ করে উপজাতি ও দরিদ্র শ্রেণির শিশুদের উপস্থিতির হার কম।
বিদ্যালয়গুলোর শ্রেণির অনেকগুলোর নির্মাণকাজের মান ভাল হয়নি। রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি (দিনাজপুর) মাত্র এক বছর আগে হাস্তান্তর করা হলেও এরই মধ্যে জরাজীর্ণ অবস্থায় পৌঁছে গেছে। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে গৃহীত কর্মসূচিতে (২) ডোনার ফান্ডের কত টাকা ব্যয় করা হয়েছে তার কোন হদিস নেই।
এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক শ্যামল কান্তি বিশ্বাসের কাছে জানতে চাইলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন:তৃতীয় পর্যায়ের কাজ চলমান রয়েছে। ১১টি দাতাসংস্থা ও সরকারের সমন্বয়ে এত বিশাল একটি কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার ৯৮ শতাংশ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবকাঠামো নির্মাণে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও পরে তা স্থানীয় সরকারের সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
মানব উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের প্রধান উপাদান শিক্ষার আনুষ্ঠানিক ভিত তথা প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়ন ও বৃদ্ধির জন্য দেশে স্বাধীনতার পর হতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এসব কার্যক্রম আশানুরূপ ফললাভে সক্ষম হয়নি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ‘প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি’ শীর্ষক প্রাথমিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। উল্লিখিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকারি ও উন্নয়ন সহযোগীর যৌথ উদ্যোগে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের প্রয়োজন হয়। সে লক্ষ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক (তত্কালীন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ) একাধিক (তিনটি বিশেষ প্রকল্প) প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পসমূহের অধিকাংশ জুলাই ১৯৯৬ হতে জুন, ২০০৪ সময় বাস্তবায়িত হয়। ‘প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি’ শীর্ষক ১ম পরিকল্পনার আওতায় প্রণীত প্রকল্পসমূহের বাস্তবায়ন শেষে প্রকল্পসমূহের অনুরূপ কাজ এবং বাস্তবায়িত কর্মসূচির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার স্বার্থে একটি নতুন পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য ২০০২-২০০৩ সালে স্বল্পকালীন কারিগরি সহায়তা প্রকল্প গ্রহণ করা হয় যার মাধ্যমে ‘প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি-২’ শীর্ষক পরিকল্পনা করা হয়। পরে প্রকল্পটি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বাস্তবায়ন আরম্ভ হয়। ২০১১ সালে আট বছর মেয়াদি সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। শেষে আইএমইডি পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরি করে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, পরিদর্শিত বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতির হার অনেক কম। বিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশতেই স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন নেই এবং ছাত্র-ছাত্রী অনুপাতে ল্যাট্রিনের সংখ্যা কম। যেসব ল্যাট্রিন করা হয়েছে তা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। বিদ্যালয়গুলোর আসবাবপত্রের মান সন্তোষজনক নয়। কম্পিউটার ল্যাবগুলোর ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। মডেল স্কুলে ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরগুলো অব্যবহূত রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে আলাদা ডিজাইন ও প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ না করে প্রকল্পের পরিকল্পনা করার ফলে অন্যান্য এলাকার মত হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চল এবং সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে বিদ্যালয় নির্মাণে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। প্রকল্পের যানবাহন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও এর অংগ অফিসসমূহে ব্যবহূত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় কতগুলো যানবাহন ক্রয় বা সংগ্রহ করা হয়েছে তার প্রকৃত পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
প্রকল্পের আওতায় শিক্ষকদের (সি-ইন-এড) ট্রেনিংসহ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু এ প্রশিক্ষণসমূহ ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাদানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। পিইডিপি-২ এর আওতায় ছাত্র ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণমূলক পাঠদান ব্যবস্থা অনুসরণ করা হচ্ছে না। পিইডিপি-২ এর আওতায় গ্রুপ ডিসকাশন-এর ভিত্তিতে সিটিং ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী আসবাবপত্র সরবরাহ করা হয়েছে। কিন্তু পরিদর্শনকালে কোন বিদ্যালয়ে এ সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট পরিলক্ষিত হয়নি। নিয়মানুযায়ী সুপারিশের আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক তা আইএমইডিকে অবহিত করার কথা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক আইএমইডি-এর প্রেরিত প্রকল্পের পরিদর্শন প্রতিবেদনের আলোকে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কিনা বা হলে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে তা এ বিভাগকে জানানো হয়নি।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক শ্যামল কান্তি বিশ্বাস জানান, প্রতিবেদনে কিছু প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি-বিচ্যুতি উঠে আসলেও সামগ্রিক কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। বর্তমানে তৃতীয় পর্যায়ে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে পূর্বের ত্রুটিগুলো আরো সংশোধিত আকারে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
