বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৬৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ক্রোড়পত্র

বাংলাদেশের রাজনৈতিক উন্নয়নে আওয়ামী লীগ

আপডেট : ২২ জুন ২০১৩, ২২:২৬
বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো ও বৃহত্ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। সেক্যুলার, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল রাজনীতির মূলধারা আওয়ামী লীগ। এ দলই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদান করে। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালির হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীনতা অর্জন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। ’৪০-এর দশকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ অভ্যন্তরীণভাবে দ্বি-ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে, যথা সোহরাওয়ার্দী-হাশিম বা প্রগতিশীল গ্রুপ বনাম খাজা বা প্রতিক্রিয়াশীল গ্রুপ। এ ছিল একদিকে মধ্যবিত্ত, অন্যদিকে অভিজাত-জমিদারি স্বার্থের দ্বন্দ্ব। অনেকে একে জনগণ বনাম প্রাসাদ দ্বন্দ্ব হিসেবে আখ্যায়িত করেন।১ প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা আকরাম খাঁ ছিলেন খাজা গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত। মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় অবাঙালি নেতৃত্বের সমর্থন-আনুকূল্যও ছিল এদের প্রতি। সোহরাওয়ার্দী-হাশিম গ্রুপের পেছনে ছিল বাঙালি মধ্যবিত্ত ও ছাত্র-তরুণদের নিয়ে গঠিত এক বিশাল কর্মী বাহিনী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এ গ্রুপের প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ নেতা। এরাই ছিলেন বাংলায় পাকিস্তান আন্দোলনের মূল শক্তি। বাংলায় মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান সংগঠক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রত্যক্ষ সমর্থন নিয়ে ১৯৪৩ সালে আবুল হাশিম বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হওয়ার পর লীগ সংগঠনকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে তিনি নিজেকে সোপর্দ করেন। তার নির্দেশেই খাজা গ্রুপের হেড কোয়ার্টার্স নামে খ্যাত ‘আহসান মঞ্জিলের’ বিপরীতে পুরাতন ঢাকার ১৫০ নম্বর মোগলটুলী পার্টি হাউজ প্রতিষ্ঠা পায়। এটিকে কেন্দ্র করে সেখানে সোহরাওয়ার্দী-হাশিম সমর্থক প্রগতিশীল লীগ কর্মীদের ওয়ার্কার্স ক্যাম্প গড়ে ওঠে। ভারত বিভাগের পর ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধু এই পার্টি হাউজে এসে ওঠেন। এই পার্টি হাউজের তরুণ নেতা-কর্মীদের উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠা পায় আওয়ামী লীগ। যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে বাঙালিরা সর্বাত্মক সমর্থন জ্ঞাপন ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছিল, ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান তাদের সেই প্রত্যাশিত রাষ্ট্র ছিল না। শুরুতেই তাদের ওপর নেমে আসে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শাসন-শোষণ, আঞ্চলিক বৈষম্য ও জাতি নিপীড়ন। রাষ্ট্রভাষা নীতি, কেন্দ্রীয় আইন সভায় বাঙালিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হ্রাসে নানা ফন্দি, মুসলিম লীগ নেতৃত্বের ‘দরজা বন্ধ নীতি’ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে অচিরেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চরিত্র উন্মোচিত হয়। পাকিস্তানকে ঘিরে বাঙালিদের স্বপ্ন দ্রুত ভেঙ্গে যায়। পাকিস্তানের স্বাধীনতাকে বঙ্গবন্ধু আখ্যায়িত করেছিলেন ‘ফাঁকির স্বাধীনতা’ বলে।২ এ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীনতা। আর সেই জাতীয় মুক্তির আন্দোলনের লক্ষ্য নিয়েই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ১ বছর ১০ মাসের মধ্যে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরাতন ঢাকার কে এম দাস লেনের ‘রোজ গার্ডেনে’ (প্রাইভেট বাড়ি) অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলনে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন এর নামকরণ করা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি, আতাউর রহমান খান, সাখাওয়াত হোসেন ও আলী আহমদ খানকে সহ-সভাপতি, শামসুল হককে (টাঙ্গাইল) সাধারণ সম্পাদক, শেখ মুজিবুর রহমান (তখন কারাবন্দী), খোন্দকার মোশতাক আহমদ ও এ কে রফিকুল হোসেনকে যুগ্ম-সম্পাদক এবং ইয়ার মোহাম্মদ খানকে কোষাধ্যক্ষ করে আওয়ামী লীগ গঠিত হয়। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার কাহিনী বঙ্গবন্ধু এভাবে বর্ণনা করেন : ...পুরানা লীগ কর্মীরা মিলে এক কর্মী সম্মেলন ডাকল ঢাকায় ভবিষ্যত্ কর্মপন্থা ঠিক করার জন্য। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন সে সভা আহ্বান করা হয়েছিল... আমরা জেলে বসে সে খবর পাই... আমরা সম্মেলনের ফলাফল সম্বন্ধে খুবই চিন্তায় দিন কাটাচ্ছিলাম। আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল আমার মত নেওয়ার জন্য। আমি খবর দিলাম, ‘আর মুসলিম লীগের পিছনে ঘুরে লাভ নাই, এ প্রতিষ্ঠান এখন গণবিচ্ছিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এরা আমাদের... নিতে চাইলেও যাওয়া উচিত হবে না। কারণ এরা কোটারি করে ফেলেছে। একে আর জনগণের প্রতিষ্ঠান বলা চলে না। এদের কোন কর্মপন্থাও নাই।’ আমাকে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আমি ছাত্র প্রতিষ্ঠান করব, না রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন হলে তাতে যোগদান করব? আমি উত্তর পাঠিয়েছিলাম, ছাত্র রাজনীতি আমি করব না, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানই করব। কারণ বিরোধী দল সৃষ্টি করতে না পারলে এ দেশে একনায়কত্ব চলবে... সকলেই একমত হয়ে নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করলেন; তার নাম দেওয়া হল, ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী [মুসলিম] লীগ।’ মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, জনাব শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং আমাকে করা হল জয়েন্ট সেক্রেটারি। খবরের কাগজে দেখলাম আমার নামের পাশে লেখা আছে ‘নিরাপত্তা বন্দি’।৩ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পাকিস্তানে বিরোধী রাজনীতির উত্থান ঘটে। আওয়ামী লীগই পাকিস্তানের প্রথম কার্যকর বিরোধী দল। আওয়ামী লীগ শুধু পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দলই ছিল না, বাঙালির স্বার্থের সত্যিকার ও আপোষহীন প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে এ দলের যাত্রা শুরু। দ্রুত বাঙালিদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। কখনো আওয়ামী লীগ সর্বপাকিস্তানভিত্তিক দল হিসেবে গড়ে ওঠেনি বা গড়ে তুলতে চেষ্টাও নেওয়া হয়নি। জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ ও অসামপ্রদায়িক আদর্শে বিশ্বাসী ছিল। নামের সঙ্গে ‘মুসলিম’ শব্দ যুক্ত করাটা ছিল কৌশলমাত্র। ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত তৃতীয় কাউন্সিল সভায় দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে সবার জন্য এর দ্বার খুলে দেয়া হয়। তখন বঙ্গবন্ধু ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক। প্রতিষ্ঠাকালে আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে ৪২ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করেন।৪ পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি, এক মাথা এক ভোট, গণতন্ত্র, শাসনতন্ত্র প্রণয়ন, সংসদীয় সরকার পদ্ধতি, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং দুই প্রদেশের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণ ইত্যাদি ছিল আওয়ামী লীগের প্রধান দাবি। পাকিস্তান রাষ্ট্রে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বাঙালিদের প্রথম বিদ্রোহ দেখা দেয়। মূলত ভাষা-বিতর্ক নিয়েই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা। পাকিস্তানের অবাঙালি শাসকগোষ্ঠীর ভাষানীতি কেবল অগণতান্ত্রিকই ছিল না, তা ছিল প্রচণ্ড জাতিবিদ্বেষী। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষা হওয়া সত্ত্বেও বাংলাকে উর্দুর পাশাপাশি পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতেও তারা সম্মত ছিল না। ১৯৪৮-৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আওয়ামী লীগ এবং এর ছাত্র সংগঠন, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ (১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত) মুখ্য ভূমিকা পালন করে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন ভাষা-আন্দোলনের প্রথম কারাবন্দিদের মধ্যে অন্যতম (১১ই মার্চ ১৯৪৮)। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার পূর্বে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনেও আওয়ামী লীগ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অন্য তিনটি বিরোধী দল যথা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক পার্টি, মৌলানা আতাহার আলীর নেতৃত্বাধীন নেজাম-ই-ইসলাম পার্টি এবং হাজী মোহাম্মদ দানেশের নেতৃত্বাধীন গণতন্ত্রী দল নিয়ে পূর্ব বাংলায় সরকার বিরোধী নির্বাচনী জোট ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করে। ২১-দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। ব্যাপক সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মসূচীর মধ্যে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন এবং পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল এই রাজনৈতিক মঞ্চের মূল নির্বাচনী বিষয়। ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি আসন লাভ করে, যুক্তফ্রন্ট লাভ করে ২২৩টি আসন। পাকিস্তানি শাসনামলের ২৪ বছরের মধ্যে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক সরকারে মাত্র ২ বছর (১৯৫৬-৫৮) ছিল এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কোয়ালিশন সরকার হিসেবে কেন্দ্রে ক্ষমতায় ছিল মাত্র ১৩ মাস (১২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৬-১১ অক্টোবর ১৯৫৭)। নির্বাচন-উত্তর এ. কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করে এবং আওয়ামী লীগ ছিল এই সরকারের প্রধান অংশীদার। কিন্তু ৫৬ দিনের মধ্যে ফজলুল হক সরকারকে ৯২(ক) ধারায় বরখাস্ত করা হয়। এর ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয় এবং ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন ঘটে। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেও আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এই পদক্ষেপসমূহের মধ্যে রয়েছে : মারাত্মক খাদ্য ঘাটতি সমস্যা আয়ত্তে আনা, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, ভূমিহীন কৃষকদের টেস্ট রিলিফ প্রদান, ভাষা শহীদ পরিবারকে আর্থিক অনুদান প্রদান, ২১শে ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা, ১লা বৈশাখকে বাংলা নববর্ষের দিন হিসেবে উদযাপন, ময়মনসিংহে পশুচিকিত্সা কলেজ, ফেঞ্চুগঞ্জে সার কারখানা, সাভারে ডেইরি ফার্ম এবং ঢাকায় চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (এফডিসি) স্থাপন। এই সরকারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিল্প, বাণিজ্য এবং শ্রম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার কেন্দ্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এই পদক্ষেপসমূহের মধ্যে রয়েছে : পাকিস্তানের দুই প্রদেশে সকল ক্ষেত্রে সমতা আনয়ন, পাকিস্তান জাতীয় সংসদের অধিবেশন প্রথমবারের মতো ঢাকায় অনুষ্ঠান, জাতীয় সংসদে যৌথ নির্বাচন (Joint Electorates) আইন পাস (অক্টোবর ১৯৫৬), পাট বাজারজাতকরণ, অভ্যন্তরীণ জল পরিবহন সংস্থা (আইডব্লিউটিএ) এবং পানি ও বিদ্যুত্ উন্নয়ন সংস্থা (ওয়াপদা) প্রতিষ্ঠা। ১৯৫৭ সালে বৈদেশিক নীতিকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে দলটি মারাত্মক সাংগঠনিক সংকটের সম্মুখীন হয়। সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানী মূলত পাকিস্তানের বৈদেশিক নীতিকে কেন্দ্র করে ভিন্নমত পোষণ করেন। সোহরাওয়ার্দী পাশ্চাত্যের সঙ্গে বিশেষ করে আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের পক্ষপাতী হলেও ভাসানী জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের পক্ষে মত দেন। কাগমারি সম্মেলনে (টাঙ্গাইল, ৭-৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭) দলটির বিভক্তি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৮ই মার্চ মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ এবং এর সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এই পদত্যাগের ফলে দলের ওয়ার্কিং কমিটির ৩৭জন সদস্যের মধ্যে ৯ জন ভাসানীকে সমর্থন দেন। পরিণামে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নামে একটি নতুন দল জন্মলাভ করে এবং মওলানা ভাসানী এই দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ সালের ২৫-২৬শে জুলাই ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে এক কর্মী সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে দলটি আত্মপ্রকাশ করে। এই সংকটময় মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংগঠনের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। মাত্র নয় মাস মন্ত্রিত্ব করার পর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যে পূর্ণকালীন সময় দেয়ার জন্য তিনি মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন (৩১ মে ১৯৫৭)। মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগিশ দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। সংগঠনের স্বার্থে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিত্ব ত্যাগ উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা। জেনারেল আইয়ুবের স্বৈরাচারি শাসনামলে (১৯৫৮-১৯৬৯) বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত সংগ্রামের প্রধান দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। ১৯৬৩ সালে মৃত্যুর পূর্বে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল নিয়ে ‘ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ (এনডিএফ) নামে আইয়ুব-বিরোধী মোর্চা গঠন করেন। এই ফ্রন্ট গণতন্ত্র ও আইনের শাসন পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানায়। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা হন। ১৯৬৪ সালের ২৫শে জানুয়ারি তার ধানমন্ডিস্থ বাসভবনে কেন্দ্রীয় সদস্যদের সভায় তিনি আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করেন। ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে সামপ্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে আওয়ামী লীগ সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি স্থাপনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির পক্ষে প্রচারণার জন্য দলটি পূর্ব পাকিস্তান : রুখিয়া দাঁড়াও নামে একটি প্রচারপত্র মুদ্রণ করে লক্ষ লক্ষ কপি বিতরণ করে। ১৯৬৫ সালের ২রা জানুয়ারি অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জেনারেল আইয়ুবকে হটানোর লক্ষ্যে কতিপয় বিরোধী রাজনৈতিক দল নিয়ে ‘সম্মিলিত বিরোধী দল’ (কপ) নামে একটি রাজনৈতিক মোর্চা গঠন করা হয়। আওয়ামী লীগ এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিল। সম্মিলিত বিরোধী দল মিস ফাতেমা জিন্নাহকে মনোনয়নদান করে। কপ-এর দাবি ছিল, রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থার স্থলে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থায় পরোক্ষ ভোটের স্থলে সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রবর্তন। নির্বাচনের ফলাফল জনগণের ভোট দ্বারা নয়, ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রী দ্বারা নির্ধারিত হয়। ফলে বিরোধী দলীয় প্রার্থীর পরাজয় ঘটে। ১৯৬৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৭ দিনব্যাপী যুদ্ধ হয়। সে সময়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বাঙালিদের রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অনুপস্থিতির কারণে বাঙালিদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেয়। ১৯৬৬ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলসমূহের এক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা কর্মসূচি’ উপস্থাপন করেন। এই কর্মসূচীর মধ্যে ছিল: সর্বজনীন ভোটাধিকারসহ কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন; বৈদেশিক সম্পর্ক ও প্রতিরক্ষা ব্যতীত প্রাদেশিক সরকারের হাতে সকল প্রকার ক্ষমতা প্রদান; পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য স্বতন্ত্র মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন; প্রাদেশিক সরকারের হাতে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করার অধিকার প্রদান এবং সবশেষে, নিজস্ব প্রতিরক্ষার জন্য প্রদেশগুলোকে আধা-সামরিক বাহিনী গঠনের ক্ষমতা প্রদান। ছয় দফা কর্মসূচি রাজনীতিতে দ্রুত বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করে। এই কর্মসূচির প্রতি প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র এবং অনেকেই সরাসরি এই কর্মসূচীর বিরোধিতা করেন। এমনকি আওয়ামী লীগের মধ্যেও একটি অংশ ছয় দফা দাবি সমর্থন করতে দ্বিধান্বিত ছিল বা অস্বীকৃতি জানায়। অবশ্য, ১৯৬৬ সালের ১৮-১৯শে মার্চ ঢাকার ইডেন হোটেলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬-দফা কর্মসূচী অনুমোদন করিয়ে নিতে সমর্থ হন। তিনি দলের সভাপতি এবং তাজউদ্দিন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ৬-দফার প্রতি আইয়ুব সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল খুবই কঠোর। আইয়ুব খান ৬-দফা কর্মসূচিকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অপচেষ্টা’ বলে অভিহিত করেন এবং অস্ত্রের ভাষায় এই দাবি প্রতিহত করার ঘোষণা দেন। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু সারাদেশে ৩ মাসব্যাপী গণসংযোগ কর্মসূচী শুরু করেন। এ সময়ের মধ্যে তাকে আটবার গ্রেফতার করা হয় এবং অবশেষে ১৯৬৬ সালের ৮ই মে তিনি দীর্ঘ সময়ের জন্য কারাবন্দি হন। ৬ দফা কর্মসূচির প্রতি সমর্থন ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে ৭ই জুন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের আহ্বানে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। পুলিশ তেজগাঁও, টংগী ও নারায়ণগঞ্জে জনতার উপর গুলিবর্ষণ করলে ১১ জন নিহত হয়। এরপরই সারা দেশব্যাপী আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের গণহারে গ্রেফতার শুরু হলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও আমেনা বেগম যথাক্রমে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এ পর্যায়ে আইয়ুব সরকার ৬ দফা আন্দোলন দমনে চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৮ সালে কারাবন্দি অবস্থায় বঙ্গবন্ধু ও অপর ৩৪ জন বাঙালি সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে পরিচিত একটি ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দায়ের করা হয়। সরকারিভাবে এর নামকরণ হয় ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও ভারতের সহযোগিতায় সশস্ত্র পন্থায় পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। দ্রুত এই মামলার বিরুদ্ধে বাঙালিদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শুরু হয় দেশজুড়ে গণআন্দোলন, যার পরিণতি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। শীঘ্রই আইয়ুব খান ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। দেশব্যাপী গণআন্দোলন এবং আইয়ুব খানের পতনের প্রেক্ষাপটে নতুন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের অধীনে ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ বাঙালিদের জাতীয়তাবাদী মঞ্চে পরিণত হয়। দলটি এ নির্বাচনকে ৬ দফা কর্মসূচির ওপর গণভোট হিসেবে গ্রহণ করে পূর্ণশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অভূতপূর্ব বিজয় অর্জন করে। কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দকৃত ১৬২টি আঞ্চলিক আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন (৭২.৫৭% ভোট) লাভ করে। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন (৮৯% ভাগ ভোট) জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। দলটি জাতীয় পরিষদের ৭টি মহিলা আসন ও প্রাদেশিক পরিষদের ১০টি মহিলা আসনের সবগুলোতেই জয়লাভ করে। এই ফলাফলের অর্থ দাঁড়ায়, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ এবং আওয়ামী লীগ এক ও অভিন্ন সত্তায় পরিণত হয়। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলেন বাঙালি জাতির একমাত্র মুখপাত্র (Sole Spokesman)। এভাবে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের মোট ৩১৩টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে বিজয়ী হয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ট দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের আহ্বানের পরিবর্তে ইয়াহিয়া খানের সামরিক জান্তা নির্বাচনের রায় বাতিল ও বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষাকে পদদলিত করার জন্য সামরিক বাহিনী তলব করে। আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২রা মার্চ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক গণআন্দোলনের ডাক দেন এবং দেশবাসী তাঁর আহ্বানে বিপুলভাবে সাড়া দেয়। বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি ঘোষণা করেন : “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কাল রাতে ঢাকাসহ পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সশস্ত্র আক্রমণের ফলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পাকিস্তানের উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকট নিরসনের সকল পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার এবং তথাকথিত রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে বিচারের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতের পর অর্থাত্ ২৬ শে মার্চ প্রত্যুষে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি (বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি) এবং তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করেন, যা মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত। এই সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে (১৯৭২-৭৫) সরকার গঠন করে। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ সরকারকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। এ সময় সরকারকে সবকিছু শূন্য থেকে বিনির্মাণ করতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বেসামরিক লোকজনের হাতে বিপুলসংখ্যক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র থাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোর মধ্যে ছিল : মন্ত্রী পরিষদ শাসিত সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন; ১০ মাসের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংবিধান প্রণয়ন (১৯৭২); মুক্তিযোদ্ধাদের সাহাযার্থে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানো; নতুন প্রজাতন্ত্রের জন্য বিশ্বের ১৪০টি দেশের স্বীকৃতি লাভ; ভারতে আশ্রয় নেয়া এক কোটি শরণার্থী এবং যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের দোসরদের দ্বারা সম্ভ্রম হারানো প্রায় তিন লক্ষ নারীর পুনর্বাসন ইত্যাদি। স্বাধীনতালাভের ১৫ মাসের মধ্যে নতুন সংবিধান অনুসারে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান (৭ই মার্চ ১৯৭৩) ছিল আওয়ামী লীগের আরও একটি বড় অর্জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসন (৭৩.১৭% ভোট) লাভের মধ্যদিয়ে বিপুল বিজয় অর্জন করে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ছিল ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে ‘অসমাপ্ত বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বামপন্থী দলগুলো সরকারের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এদের সঙ্গে একদিকে গোপন তত্পরতায় লিপ্ত চরমপন্থী এবং অন্যদিকে স্বাধীনতা-বিরোধীরা যোগ দেয়। শুরু হয় গুপ্ত হত্যা ও নাশকতামূলক কাজ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য প্রথমে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয় (১৯৭৪)। তাতেও কাজ না হলে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে বহুদলীয় সংদীয় গণতন্ত্রের স্থলে একটি মাত্র জাতীয় দল, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করা হয়। নতুন এই ব্যবস্থার অধীনে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়। আওয়ামী লীগসহ সকল দল সরকারিভাবে বিলুপ্ত করা হয়। সরকারি সংবাদপত্র ব্যতীত অন্য সকল সংবাদপত্রের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করা হয়। বঙ্গবন্ধু একে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। যাহোক, এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু অধঃস্তন সামরিক কর্মকর্তা ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের উপস্থিত সকল সদস্যকে হত্যা করে। অচিরেই সংঘটিত হয় আরেকটি মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় আওয়ামী লীগের চার শীর্ষ জাতীয় নেতা যথা সর্বজনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে জেনারেল জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার কর্তৃক ঘোষিত ‘রাজনৈতিক দল বিধি’র অধীনে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত হওয়ার (১৯৭৬) সঙ্গে সঙ্গেই দলে ভাঙ্গন দেখা দেয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সামরিক বাহিনী কখনো প্রত্যক্ষভাবে কখনো বেসামরিক ছদ্মাবরণে ১৫ বছর বাংলাদেশ শাসন করে। রাজনৈতিক কারণে ক্ষমতা জবরদখলকারীরা বিভিন্ন উপায়ে আওয়ামী লীগকে সমূলে উত্পাটিত করতে চেয়েছে। অবশ্য আওয়ামী লীগ সকল সংকট-প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকে। আওয়ামী লীগ কখনো এককভাবে আবার কখনো সমমনা দলগুলোর সঙ্গে ঐক্যজোট গঠন করে জিয়া-সাত্তার-এরশাদের শাসনামলে আন্দোলনের পাশাপাশি সকল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। একদিকে দলকে ঐক্যবদ্ধ করা, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবেলা করা উভয় প্রয়োজনে আওয়ামী লীগ নির্বাচনকে কৌশল হিসাবে গ্রহণ করে। জিয়ার সেনা শাসন আমলে বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও আওয়ামী লীগ ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ৩০০ আসনের মধ্যে ৩৯টি আসন (২৪.৫৫% ভোট) লাভ করে। নির্বাচনের পর জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৫-১৯৭৯ পর্যন্ত তার সামরিক শাসনকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করলে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদের ভেতরে ও বাইরে এর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অবস্থান গ্রহণ করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে ছয় বছর নির্বাসনে কাটাতে হয়। অত:পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে এসে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। এর পূর্বে বিদেশে অবস্থানকালে তিনি দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ১৯৮৩ সালের প্রথমদিকে ১৫ দলীয় ঐক্যজোট গঠন করে। এই ঐক্যজোট ৫ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে, যার উল্লেখযোগ্য দাবি হচ্ছে: সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা এবং অন্য কোনো নির্বাচনের পূর্বে সর্বাগ্রে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান। এই কঠিন ও সংকটময় মুহূর্তে আওয়ামী লীগ পুনরায় ভাঙ্গনের সম্মুখীন হয়। ১৯৮৩ সালে আওয়ামী লীগ দু’টি দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের (বাকশাল) আদর্শে বিশ্বাসী ও এর প্রতি অনুগত বহুসংখ্যক দলীয় নেতা ও কর্মী দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাকের (সমপ্রতি প্রয়াত) নেতৃত্বে পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গিয়ে ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেন এবং বাকশালের আদর্শ সমুন্নত রাখার সংকল্প ঘোষণা করেন। কিন্তু দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা-কর্মী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন। অবশ্য ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে বাকশালের নেতা-কর্মীরা আওয়ামী লীগের মূলধারায় ফিরে আসেন। এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে বেগবান করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি জাতীয় কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। অবিরাম আন্দোলনের ধারায় স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে অনেক হরতাল পালিত হয়। একের পর এক সভা-সমাবেশ, প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কে আন্দোলনের সহযোগী হিসাবে নিতেও সম্মত হয়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট এরশাদ বিরোধী দলের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে ১৯৮৬ সালের ৭ মে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। স্বৈরশাসনের অবসানের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ নির্বাচনকে কৌশল হিসাবে গ্রহণ করে। কিন্তু নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে ১৫ দলীয় ঐক্যজোটে ভাঙ্গন দেখা দেয়। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল পরিচালিত ৭ দলীয় ঐক্যজোট রাজপথের আন্দোলনের উপর গুরুত্ব আরোপ করে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী দলসমূহ এই সিদ্ধান্তকে অবিবেচনাপ্রসূত মনে করে। অবশেষে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮ দলীয় ঐক্যজোট ৭ মে’র সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও সমমনা দল ৩০০ আসনের মধ্যে ৯৭টি আসন লাভ করে এবং ভোট পায় ৩১.২১% ভাগ (আওয়ামী লীগ এককভাবে ৭৬টি আসন এবং ২৬.১৫% ভোট পায়)। রাজপথে আন্দোলনের পাশাপাশি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে এরশাদ কর্তৃক জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে। ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ এরশাদ আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রহণ করে, কিন্তু আওয়ামী লীগসহ দেশের প্রধান দলগুলো সেই নির্বাচন বর্জন করে। সরকার-বিরোধী তীব্র আন্দোলনের চাপে এরশাদ ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নতুন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে (৩০০টি আসনের মধ্যে ১৪০টি এবং ৩০.৮১% ভোট) সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী দলগুলো বেশি ভোট পেলেও (৩৪.২৯% ভাগ), আসন লাভ করে কম (১০০টি)। আওয়ামী লীগ এককভাবে ৮৮টি আসন এবং ৩০.০৮% ভোট পায়। নির্বাচনের পর পর আওয়ামী লীগ মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করে। জাতীয় সংসদে সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট এ লক্ষ্যে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী আইন পাস হয়। অবশ্য সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এরূপ সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ঢাকার মিরপুর (১৯৯৩) এবং যশোরের মাগুরার (১৯৯৪) উপ-নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অচিরেই এদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। উভয় উপ-নির্বাচনে সরকার দলীয় অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও অ-জনপ্রিয় প্রার্থীর জয়লাভ এবং নির্বাচন কমিশনের নতজানু ভূমিকা বিরোধী দলকে এই বিশ্বাসে উপনীত করে যে, দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনই অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। এভাবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য বিরোধী দল সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ গঠনের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলে। এই আন্দোলনের অংশ হিসাবে আওয়ামী লীগ প্রথমে জাতীয় সংসদ বর্জন (মার্চ-ডিসেম্বর ১৯৯৪), পরবর্তীকালে সংসদ থেকে গণপদত্যাগ (২৮ ডিসেম্বর ১৯৯৪) এবং ক্রমাগত হরতাল আহ্বান করে। বিএনপি সরকার বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি উপেক্ষা করে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে অগ্রসর হয়, যা ‘মধ্য ফেব্রুয়ারির নির্বাচন’ নামে খ্যাত। আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী দলসমূহ এই নির্বাচন সর্বতোভাবে প্রত্যাখ্যান করে। প্রায় ভোটারবিহীনভাবে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এভাবে সৃষ্ট জাতীয় সংসদ মাত্র ৪ দিন স্থায়ী হয়। জনগণের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া অবশেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি স্বীকার করে নেন। তিনি সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে (২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬) তাতে আওয়ামী লীগ প্রস্তাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা অন্তর্ভুক্ত করেন। জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ তাঁর সরকার পদত্যাগ করে। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে (৩০০টির মধ্যে ১৪৬টি আসন এবং প্রদত্ত ভোটের ৩৭.৫৩% ভাগ) জয়লাভ করে। বঙ্গবন্ধু হত্যার ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। তাঁর সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এর মধ্যে রয়েছে: সংসদীয় কমিটিসমূহ গঠনের মাধ্যমে জাতীয় সংসদকে শক্তিশালী করা (মন্ত্রীদের পরিবর্তে জাতীয় সংসদের সদস্যদের কমিটির সভাপতি নির্বাচন); প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব প্রবর্তন; বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারে বাধা ‘ইনডেমনিটি আইন’ বাতিল (২ নভেম্বর ১৯৯৬) এবং হত্যাকারীদের বিচারের পথ উন্মুক্ত করা; ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর (১২ ডিসেম্বর ১৯৯৬); পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদন (২ ডিসেম্বর ১৯৯৭) করে ঐ অঞ্চলের দুই দশকের সশস্ত্র সংঘাতের অবসান; ইউনিয়ন পরিষদ এবং অন্যান্য স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে মহিলাদের প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থাসহ নারীর ক্ষমতায়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ; দারিদ্র্য হ্রাস এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণে পদক্ষেপ গ্রহণ; বয়স্ক, তালাকপ্রাপ্ত ও বিধবা মহিলাদের সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা; সুবিধা বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতা প্রদান; খাদ্য উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পদক্ষেপ ইত্যাদি। শেখ হাসিনার সরকারের সময়ই বাঙালির গৌরবময় ভাষা আন্দোলন (২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২) ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত চারদলীয় জোটের কাছে আওয়ামী লীগের পরাজয় ঘটে। আওয়ামী লীগ মাত্র ৬২টি আসন এবং ৪০.১৩% ভাগ ভোট পায়, অন্যদিকে বিএনপি পায় ১৯৩টি আসন এবং ৪০.৯৭% ভাগ ভোট (চারদলীয় জোট ২১৬ আসনে জয়লাভ করে এবং ভোট পায় ৪৭.০৫%)। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী বিপর্যয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলকে বিস্মিত করে। নির্বাচনের পর বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসন আমলে (২০০১-২০০৬) আওয়ামী লীগ ও এর সমর্থকদের ওপর চরম নির্যাতন-নিষ্পেষণ নেমে আসে। অপরদিকে, দেশে ধর্মীয় জঙ্গী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। সরকারের মেয়াদান্তে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে নিজেদের পক্ষে প্রভাবান্বিত করার উদ্দেশ্যে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার নানা কূটকৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করে। ফলে দেশে চরম সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। এর এক পর্যায়ে জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ-এর নেতৃত্বে রাজনীতিতে সেনা হস্তক্ষেপ ঘটে। সেনা সমর্থিত ড. ফকরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে (২০০৭-২০০৮) আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই প্রধান দলের দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর বা নির্বাসনে প্রেরণ করে সেনা নিয়ন্ত্রণ-কর্তৃত্ব স্থায়ী করার পরিকল্পনা করা হয়। দুই নেত্রীর গ্রেফতার; দুর্নীতির অভিযোগে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার অনুষ্ঠান; রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, ছাত্র, শিক্ষক, পেশাজীবী নির্বিশেষে সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার; শাসক দল (প্রোগ্রেসিভ ডেমোক্রেটিক পার্টি) গঠনের চেষ্টা ইত্যাদি পদক্ষেপ এরই অংশ হিসেবে ছিল। কিন্তু বন্দি অবস্থায়ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সাহসী ও দৃঢ় ভূমিকার কারণে প্রধানত ঐ নীল-নক্শা কার্যকর হতে পারেনি। বস্তুত দু’বছরের ব্যবধানে সরকারকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিতে বাধ্য করার মাধ্যমে সেনা দখল থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে শেখ হাসিনা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও সমমনা দল নিয়ে গঠিত মহাজোট বিপুল বিজয় অর্জন করে। মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২৬২টি আসন এবং প্রদত্ত ভোটের ৫৫.৮৫% ভোট লাভ করে (এককভাবে আওয়ামী লীগ ৪৮.২৯% ভোটসহ ২৩০টি আসন লাভ করে)। উল্লেখ্য নির্বাচন উপলক্ষে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দেশবাসীর উদ্দেশে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত তথ্য-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নির্ভর একটি সুবিস্তৃত ‘দিন বদলের সনদ’ বা ‘ভিশন ২০২১’ কর্মসূচি পেশ করেন। নির্বাচনী ফলাফল নির্ধারণে এই কর্মসূচির ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন উত্তর ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠিত হয়। নতুন সরকারকে শুরুতেই যে মহা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয় তা হচ্ছে-রক্তক্ষয়ী বিডিআর বিদ্রোহ, যা সরকার গঠনের তিন সপ্তাহের মধ্যে সংঘটিত হয়। শেখ হাসিনার দৃঢ়, স্থির ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্বের কারণে নতুন এই সরকারের পক্ষে উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এনে গণতন্ত্রের নবযাত্রাকে অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন এই সরকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো হচ্ছে : শুরুতেই সংসদীয় কমিটি গঠন করে সংসদ সদস্যদের কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা; বিচার বিভাগের চূড়ান্ত রায় অনুসারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাঁচ হত্যাকারীর বিচার সম্পন্ন করে ফাঁসির রায় কার্যকর করা; ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা; ধর্মীয় জঙ্গিসহ অন্যান্য জঙ্গিদের কঠোর হস্তে দমন করা; সর্বজন গ্রহণযোগ্য জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়ণ; উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূলধারা পুনরুজ্জীবিত ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান বাতিল করা ইত্যাদি। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা থেকে আজ পর্যন্ত ৬৪ বছরের বাংলাদেশের রাজনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাস আওয়ামী লীগের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আমাদের জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীনতা দিয়েছে, স্বাধীন দেশের সংবিধান দিয়েছে। আর বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সেনা শাসন থেকে দেশকে উদ্ধার করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশ পরিচালনার নীতি পুন:প্রতিষ্ঠা করেছেন; মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার ধারায় দেশ ও জনগণকে ফিরিয়ে এনেছেন; জাতিকে উন্নয়নের ভিশন দেখিয়েছেন; দেশে ও বিদেশে একটি দ্রুত উন্নয়নগামী, ডেমোক্রেটিক, সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন। দেশের নেতৃত্বদানে তিনি এখন অনেক অভিজ্ঞ, সমৃদ্ধ, ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। দ্বিতীয় দফায় সরকার গঠনের পর পর (জানুয়ারি ২০০৯) রক্তক্ষয়ী বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণ, সমপ্রতি সাভারে ধসে পড়া রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে গার্মেন্টস কর্মীদের উদ্ধার ও সর্বশেষ, শাপলা চত্বর থেকে সেখানে অবস্থানরত কয়েক হাজার হেফাজত নেতা-কর্মীকে, বলা যায়, বিনা রক্তপাত ও প্রাণহানিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্যে সরানো ইত্যাদি পরিস্থিতি মোকাবেলায় তিনি নেতৃত্বের ধৈর্য ও বিচক্ষণতার যে পরিচয় দিয়েছেন, তা দেশ-বিদেশে সর্বত্র প্রশংসিত। ভবিষ্যতেও সুযোগ পেলে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দেশেকে উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রায় বহুদূর এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে, সন্দেহ নাই। লেখক: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর