মধ্যপ্রাচের সরকার বিরোধী বিক্ষোভের ঢেউ এখন আছড়ে পড়ছে দেশে দেশে। বিশ্বের সকল রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং সকল প্রকারের শাসকরা এখন সতর্ক রয়েছে বলা যায়। যে কোন সময় তাদের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ হতে পারে। যে কোন ইস্যুতেই গণবিক্ষোভে ফেটে পড়তে পারে দেশের সাধারণ মানুষ। এমন অবস্থার তৈরি হতে পারে যা কেউ কখনো চিন্তা করেনি। রাষ্ট্রনায়কদের সুনাম, দেশের সুনাম হুমকির মুখে পড়তে পারে। পতন হতে পারে সরকারের। প্রাণ যেতে পারে অগণিত মানুষের। বর্তমানে বিক্ষোভ থেকে জন্ম নেয়া গৃহযুদ্ধ চলছে সিরিয়ায়। তুরস্কের তুমুল জনপ্রিয় এরদোয়ান সরকারও এখন চরম হুমকিতে। বিক্ষোভ দমাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ব্রাজিলের সরকার প্রধানকে। বিক্ষোভ দমাতে গিয়ে দেশ দু’টির সরকার চরম সমালোচনার মুখে পড়েছে।
বিক্ষোভকারী হটাতে তুরস্ক বলপ্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে। যে কারণে তুরস্কে চার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। একই অবস্থার দিকে এগোচ্ছে ব্রাজিলও। দেশটির ১০০টির বেশি শহরে ১০ লাখের বেশি লোক জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেছে। এসব পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, আমরা প্রতিবাদ-বিক্ষোভের একযুগে প্রবেশ করেছি। যেখানে সাধারণ মানুষে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত।
তুরস্কে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে। গেজি পার্কের ৬০০ গাছ কেটে একটি বিপণিকেন্দ্র নির্মাণের সরকারি পরিকল্পনার প্রতিবাদে গত ৩১ মে সেখানে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। গেজি পার্কে বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘পুলিশি নির্যাতনের’ প্রতিবাদে দু’টি প্রধান শ্রমিক সংগঠন গত সপ্তাহের মাঝামাঝিতে সারা দেশে ধর্মঘট পালন করে। কর্মসূচি চলাকালে সংগঠন দু’টির হাজারো কর্মী ইস্তাম্বুল, আঙ্কারাসহ কয়েকটি শহরে প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করে। মূলত ছোট বিক্ষোভে পুলিশী অভিযান চালানোর পর তা পুরো জাতিকে আঘাত করেছে। যে কারণে গত কয়েক দশকের মধ্যে দেশটিতে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ হয়েছে। গত ১০ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছেন এরদোয়ান। আত্মবিশ্বাসের কোনো কমতি নেই তার মধ্যে কিন্তু বিক্ষোভকারীদের উপর চড়াও হওয়ায় তিক্ত সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তুরস্ককে সমৃদ্ধি ও এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে এসেছে এরদোয়ানের সরকার।
একই চিত্র এখন ব্রাজিলেও। লাতিন আমেরিকার এ দেশটি দারিদ্র্য থেকে উঠে এসেছে। যেখানে বাম ঘেঁষা রাজনৈতিক দলটি সামাজিক কর্মসূচি ও বাজারবান্ধব নীতি গ্রহণ করে চরম দরিদ্রতা দূর করেছে। হঠাত্ বিক্ষোভে সেসব সফলতা যেন হারিয়ে গেছে। ৬৪ বছর পর ২০১৬ সালে ফুটবল বিশ্বকাপের স্বাগতিক হচ্ছে ব্রাজিল। এর আগে কনফেডারেশন কাপ হবে আর বিশ্বকাপের দু’বছর পর অলিম্পিক। যে ব্রাজিলের মেতে ওঠার কথা ক্রীড়া উত্সবের আমেজে, সেখানে চলছে ধ্বংসযজ্ঞ, লুটপাট। বিশ্বকাপের জন্য স্টেডিয়াম তৈরি আর সংস্কারের কাজে সরকার যে অর্থ ব্যয় করেছে, তাতে নাকি দুর্নীতি হয়েছে অনেক। সঙ্গে জনসেবার বেহাল দশা ও পুলিশের সহিংসতা মিলিয়ে ক’দিন ধরেই ফুঁসছিল ব্রাজিল।
ব্রাজিল সরকার চলমান বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশটির পাঁচটি বড় শহরে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক্ষেত্রে অবশ্য এরদোয়ানের দমন নীতির পথে হাঁটেননি রুসেফ। গত বুধবারই তার সরকার ঘোষণা করে দু’টি বড় শহরে বাসের ভাড়া বাড়ানো হবে না। শুক্রবার তিনি দুর্নীতি দমন, পরিবহন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই সামাজিক যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততার যুগে ছোট অভিযোগ বিস্ফোরকের মতো কাজ করতে পারে। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো প্রচারণা কৌশলের মাধ্যমে সফলতা দেখাতে পারে। বাণিজ্য ও বৈশ্বিক পর্যায়ে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এরদোয়ান যে সফলতা দেখিয়েছেন বিক্ষোভকারীদের দমনে তা পারেননি। পানির কামান, কাঁদানে গ্যাস সাময়িকভাবে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পারে। কিন্তু স্মার্টফোনের এক ক্লিকে ধারণ করা একটি ছবি বা ভিডিও ফুটেজ হাজারো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। বড় বিক্ষোভের জন্য লোক জড়ো করতে পারে। এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে যদি তাদের সমস্যাকে অবহেলা করা হয়, বিশেষত পুলিশ যদি সহিংস আচরণ করে। যদিও জনগণের যৌক্তিক চাহিদার প্রতি যৌক্তিকভাবে সাড়া দেয়া এবং তার বৈধতা এ দু’টি বিষয়ে ভারসাম্য আনা একটি গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে স্বৈরশাসক ও গণতান্ত্রিক শাসকের পার্থক্যটা বোঝা যায়। মিসর ও সিরিয়ার বিক্ষোভ দমন আর ২০০৯ সালে ইরান ও গতবছর রাশিয়ায় বিক্ষোভ দমনের ভিন্নতা সহজেই চোখে পড়ে।
আসলে এসব বিক্ষোভের জন্ম হয় ছোট-খাটো ইস্যুতে। যেখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তন বা সরকারের পরিবর্তন মুখ্য ছিলো না। কিন্তু সরকারের রূঢ় আচরণে তা সরকার পতনের আন্দোলনে পরিণত হয়। কিছুদিন আগেও যখন বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো এআইএফ আর বিশ্বব্যাংককে নিয়ে বৈঠকে বসছিলো তখন বিভিন্ন দেশে বিশ্বায়ন বিরোধী বিক্ষোভের জন্ম হয়েছিলো। এখন এ ধরনের উদ্বেগ অনেকটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা জি-৮ সম্মেলনের জন্য যখন আয়ারল্যান্ডে এসে পৌঁছান তখন সেখানে বিক্ষোভকারীদের চেয়ে পুলিশের সংখ্যাই বেশি ছিলো। বিক্ষোভের কারণ আর ধরন দুটোই এখন পাল্টে গেছে। জনগণের ই-মেইল, মোবাইল ফোনের কথাবার্তা শোনার ক্ষমতা সরকারগুলোর আছে। কিন্তু এর বাইরেও যে তথ্য ছড়িয়ে যাচ্ছে সেটা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তাদের নেই। সাধারণ মানুষের নজর ঘুরিয়ে দেয়ারও ক্ষমতা হারাচ্ছে সরকারগুলো। নতুন প্রযুক্তির কারণে জনগণের চিন্তা-ভাবনার বিষয়টি হয়তো সরকারগুলো বুঝতে পারে। কিন্তু তাদের বিশ্বাস সম্পর্কে নাও জানতে পারে। এটা নতুন যুগ। তাই সরকারগুলোকে সতর্ক হওয়া উচিত।
