লোকসভা নির্বাচন ২০১৪

ভারতের রাজনীতেতে নানা হিসাব নিকাশ

আপডেট : ২৩ জুন ২০১৩, ২০:৩০
ভারতে ২০১৪ সালের ১৬তম লোকসভা নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ শুরু হয়েছে। প্রতিযোগিতা হচ্ছে জোট ভাঙ্গা-গড়ার। সমপ্রতি বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট থেকে ১৭ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করে নীতিশ কুমারের জনতা দলের (জেডইউ) বের হয়ে যাওয়া এবং বিহারে আস্থা ভোটে নীতিশকে কংগ্রেসের সমর্থন দেয়ায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেস কিংবা বিজেপিসহ সব দলই এখন আস্থার সংকটে ভুগছে। তবে কোনো দলই যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না সেটা খানিকটা হলেও স্পষ্ট। আর এসব জোট দেশের উন্নয়নের জন্য না কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার তা নিয়েও সংশয় আছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের। ২০১৪ সালের ৩১ মে বর্তমান লোকসভার মেয়াদ শেষ হবে। ১৫তম লোকসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৯ সালে এপ্রিল-মে মাসে। তবে এখন পর্যন্ত আগামী নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার আর্থিক ও রাজনৈতিক বিড়ম্বনার শিকার। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার নিম্নগামী। মূল্যস্ফীতির অঙ্ক এখনও স্বস্তি দিতে পারেনি। রুপির দাম ক্রমেই কমছে। কিন্তু দু’বারের বিজয়ী কংগ্রেস নেতৃত্ব সেটা বুঝতে পারছেন কিনা সেটাই বিষয়। কারণ বিজেপির শাসনামলে প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী এল কে আদভানি অতি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তারা মনে করেছিলেন, মানুষ আর যাই হোক কংগ্রেসকে সমর্থন দেবে না। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল তাদের এই অতি আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছিল। বর্তমানে কংগ্রেস ক্ষমতার কেন্দ্রে অনেক চাপে রয়েছে। আর বিজেপি সেই চাপের সুযোগ নিতে চাইছে। তবে সমপ্রতি তাদের জোট থেকে নীতিশ কুমারের বেরিয়ে যাওয়া এবং আস্থা ভোটে জয়লাভ বিজেপিকে একরকম অস্বস্তিতে ফেলেছে। এমনকি আদভানিও দলের সব পদ থেকে পদত্যাগ করে পরে দলের অনুরোধে আবার ফিরে আসেন। কারণ বিজেপি বলেই দিয়েছে, আগামী নির্বাচনে তাদের প্রধান মুখ গুজরাটের তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। যিনি একজন সামপ্রদায়িক ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত। এবার মোদির নেতৃত্বে বিজেপি যদি এক নতুন যুগ শুরু করে তবে গোটা দেশে তার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখার অপেক্ষায় রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। মোদি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধান মুখ হলে ফের এ দেশে ধর্মীয় রাজনৈতিক মেরুকরণ হবে কি না সেটাও দেখার। মোদি ভুল করেও রামমন্দির নির্মাণের কথা বলছেন না। কিন্তু আশঙ্কা আছে, নির্বাচনী প্রচারের সময় একদিকে কংগ্রেস সংখ্যালঘু ভোট পাওয়ার জন্য এই মেরুকরণকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার কাজে লাগাবে, আর বিজেপি মোদিকে মূলধন করে হিন্দু-জাতীয়তাবাদের প্রচারে নিয়োজিত থাকবে। ২০০৪ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ী ছিলেন বিজেপির প্রধান মুখ। সেদিন আদভানি ছিলেন কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী। এবারের লোকসভা নির্বাচনে দিল্লির মসনদ দখল করতে হলে এনডিএর প্রসার যে মুখ্য তা অনেকদিন ধরেই বলে আসছেন বিজেপির প্রবীণ নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি। নীতিশের সঙ্গে সমঝোতা করে কোনওভাবে জোট টিকিয়ে রাখার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। নীতিশের তাতে সমর্থন ছিল। মোদিপন্থীরা মনে করছেন, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীর জনপ্রিয়তায় ভয় পাচ্ছেন নীতিশ। তাই জোট ভেঙেও জোট রাখার বার্তা দিচ্ছেন। আর নীতিশের বক্তব্য, তার এনডিএতে ফেরার পথে মূল বাধা নরেন্দ্র মোদি। বিজেপিতে আদভানি গুরুত্ব ফিরে পেলে আবার জোটে ফিরতে পারে জেডিইউ। নীতিশ সমপ্রতি বলেন, যে মোদি-মোদি হাওয়া উঠেছে, তা দিবাস্বপ্ন। অচিরেই স্বপ্নভঙ্গ হবে। উন্নত এলাকার উন্নয়ন আসল নয়, পিছিয়ে পড়া এলাকার উন্নয়নই আসল উন্নয়ন। আদভানি ও নীতিশের মনোভাব বুঝে জোটের রাস্তা খোলা রাখছেন বিজেপি সভাপতি রাজনাথ সিং। তবে মোদি মনে করছেন, শরিকরা থাকুক বা না থাকুক, বিজেপিকে সর্বশক্তি দিয়ে আসন বাড়াতে হবে। বিজেপি একা দু’শ’র কাছাকাছি আসন নিয়ে এলে শরিক এমনিতেই জুটে যাবে। অন্যদিকে বিহারের বিধানসভায় আস্থা ভোটে নীতিশ কুমারের পক্ষে ভোট দিয়েছে কংগ্রেস। নীতিশ এনডিএ জোট ছাড়ার পর প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তাকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে আখ্যায়িত করেছেন। নীতিশও প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের প্রশংসা করেছেন। বন্ধুত্বের এই প্রস্তাবকে চূড়ান্ত জোট সম্পর্কে রূপ দিতে এখন নীতিশের পক্ষ থেকেও প্রতিদান আশা করছেন সোনিয়া ও রাহুল গান্ধী। অনেকের মতে, লোকসভা ভোটে নীতিশকে যে কোনও একটি জাতীয় দলের সঙ্গে থাকতেই হবে। তা সে বিজেপি কিংবা কংগ্রেস যেটাই হোক। নীতিশ জানেন, লালু-রামবিলাস এখন কেন্দ্রীয় সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিচ্ছেন। আগামী লোকসভা ভোটেও যদি তারা কেন্দ্রের পাশে থাকেন এবং নীতিশ যদি একা চলেন, সে ক্ষেত্রে তারই লোকসান। কংগ্রেস বলেছে, আস্থা ভোটে সমর্থন দেয়া মানেই জোট হয়ে গেছে এমন নয়। এর অর্থ লালুর সঙ্গে জোটের বিকল্প পথও খোলা রাখছে কংগ্রেস। তবে সন্দেহ নেই যে শেষ পর্যন্ত নীতিশের সঙ্গে জোট হলেই খুশি হবেন সোনিয়া ও রাহুল। কারণ সে ক্ষেত্রে ভোটের পরেও লালু অন্তত বিজেপির দিকে ঝুঁকতে পারবেন না। আর নীতিশ যেভাবে নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নে বিরোধিতা করছেন তাতে তার পাশে দাঁড়িয়ে লাভই দেখছে কংগ্রেস। লোকসভা ভোটে মোদিই কংগ্রেসের প্রধান প্রতিপক্ষ। কাজেই কংগ্রেস নেতৃত্ব মনে করছে, বিহারে নীতিশের পক্ষে ভোট দিয়ে দেশজুড়ে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি তথা সংখ্যালঘুদের কাছে ইতিবাচক বার্তা পাঠানো সম্ভব হয়েছে। এছাড়া নীতিশ থাকলে মুলায়েম সিং যাদবকেও বশে রাখা যাবে। তথাকথিত ফেডারেল ফ্রন্টের কুশীলবদেরও চাপে ফেলা যাবে বলে আশা করছে কংগ্রেস। মমতার স্বপ্নভঙ্গ! অনেক আশা করে ভারতের জাতীয় স্তরে নেতা হতে ফেডারেল ফ্রন্ট গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। কিন্তু শুরুতেই তার স্বপ্নভঙ্গ হলো। সেজন্য ভূমিকা রয়েছে সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টের! বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ভেঙ্গে বেড়িয়ে আসা বিহারের জনতা দলকে (ইউনাইটেড) সরকার বাঁচাতে সাহায্য করে নিজেদের কাছে টেনে নিয়েছে তারা। একই সঙ্গে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের আগে ফের একবার সিপিএম তথা বামফ্রন্ট ভারতের জাতীয় স্তরে তৃতীয় ফ্রন্ট গঠনের সম্ভাবনা গড়ে তুলে নিজেদের গুরুত্ব বাড়িয়ে ফেলেছে। সমপ্রতি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে প্রধানমন্ত্রী পদে তুলে ধরেছে বিজেপি। আর সেই কারণে মুসলিম ভোট ব্যাঙ্ক বাঁচাতে ১৭ বছরের সম্পর্ক ছেদ করে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের জনতা দল (ইউনাইটেড)। উল্লেখ্য, বিহারে জনসংখ্যার ১৬.৪ শতাংশ মুসলিম। এই সুযোগে ফেডারেল ফ্রন্ট গঠন করতে জনতা দল (ইউনাইটেড) এবং উড়িশা রাজ্যের জনতা দলের (বিজু) সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন মমতা ব্যানার্জী। বিহারের আরেক রাজনৈতিক দল লালু প্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সঙ্গেও যোগাযোগ শুরু করেন। এনডিএ জোটের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদের কারণে ২৪৩ আসন বিশিষ্ট বিহার বিধানসভায় সংখ্যালঘু হয়ে পরে জনতা দল (ইউনাইটেড)। সরকার বাঁচাতে ম্যাজিক নাম্বার ‘১২২’। আর তার দলের ছিল ১১৭ জন এমএলএ। অন্যদিকে বিজেপির ৯১ জন এমএলএ। এই কঠিন সময়ে তাদের পাশে দাঁড়ান বামফ্রন্টের শরিক দল সিপিআইর একজন বিধায়ক। সঙ্গে নিয়ে আসেন ৪ জন স্বতন্ত্র বিধায়ককেও। আর তাতেই ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছে যায় নীতিশ কুমারের জনতা দল (ইউনাইটেড)। শেষ পর্যন্ত জাতীয় কংগ্রেসের আরো ৪ বিধায়ক তাদের সমর্থন দেন। এরপরই গত বুধবার রাতে জনতা দলের (ইউনাইটেড) সাধারণ সম্পাদক অরুণ কুমার মিশ্র কলকাতায় এসে জানিয়ে দেন, ভারতের জাতীয় স্তরে বামফ্রন্ট তথা সিপিএম ছাড়া তৃতীয় ফ্রন্ট অসম্ভব। পাশাপাশি তামিলনাড়ু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতাও এই পরিস্থিতিতে সিপিএম তথা বামফ্রন্টের পাশে দাঁড়িয়েছেন। রাজ্যসভা নির্বাচনে সিপিআই প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন। এগিয়ে এসেছে বিহারের আরেক রাজনৈতিক দল লালু প্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দলও। তারাও বামফ্রন্টের পাশে থাকবে বলে জানিয়েছে। তারিক হাসান