ঢাকায় হয়ে গেল দশম কমনওয়েলথ নারীবিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ১৭ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। কমনওয়েলথভুক্ত ৫৪টি দেশের মধ্যে ২৭টি দেশ তিন দিনের এ সম্মেলনে অংশ নেয়। ১৯৮৫ সাল থেকে প্রতি তিন বছর পর পর বিভিন্ন দেশে এ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘উইমেনস লিডারশিপ ফর এন্টারপ্রাইজ’। নারীর সার্বিক ক্ষমতায়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করে ঢাকা ঘোষণার মাধ্যমে শেষ হয় এই সম্মেলন। এই সম্মেলনের বিষয়বস্তু নিয়ে আমাদের এই প্রতিবেদনটি লিখেছেন— রাবেয়া বেবী এবং মেহেদী হাসান
নারীর ক্ষমতায়নকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার চালিকাশক্তি হিসাবে রূপান্তরের ঘোষণার মাধ্যমে শেষ হয় দশম কমনওয়েলথ নারীবিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের এই সম্মেলন। আর এই লক্ষ্যে অঙ্গিকারাবদ্ধ হন এই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশসমূহের নেতৃবৃন্দ। বাংলাদেশের মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি নারীর ক্ষমতায়ন, নেতৃত্বদান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে অর্জিত সিদ্ধান্ত করণীয় বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নারীর সার্বিক ক্ষমতায়ন ও নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বর্তমানে কমনওয়েলথ সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। এই সম্মেলনের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘উইমেনস লিডারশিপ ফর এন্টারপ্রাইজ’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সদস্য দেশসমূহের শিল্প-ব্যবসা বাণিজ্যে নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই সম্মেলন। এই ঘোষণায় অর্থনৈতিক বিষয়ে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণকে উত্সাহিত করা হয়েছে। মেহের আফরোজ চুমকি আরও বলেন প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক এবং গ্লোবাল মার্কেটে নারীর অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি দেশের নারীর ক্ষমতায়নের বাধা দূর করতে দুটি বিষয়ের উপর সরকারের কার্যক্রম উল্লেখ করে। তিনি বলেন দারিদ্র্যবিমোচন ও শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করছে বাংলাদেশ। বাল্যবিবাহ দূর করতে জন্মনিবন্ধন এবং শিক্ষা গ্রহণে সরকারের নানা কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। ভারতের দিল্লিতে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল প্ল্যাটফরম ফর অ্যাকশনের ‘উইমেন ভেন্ডরস এক্সিবিশন অ্যান্ড ফোরাম’ শীর্ষক সম্মেলন যা আগামী ১৯ থেকে ২১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে। এই সম্মেলনে ৭০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল অর্জনে বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তদের প্রস্তুতি চলছে। জুলি কলিন্স বাংলাদেশের আতিথেয়তার প্রশংসা করে বলেন, নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ এগিয়েছে। এখন ঐক্যবদ্ধভাবে পথ চলে আরও এগিয়ে যেতে হবে। যে সব দেশ এমডিজি লক্ষ্যমাত্র অর্জনে পিছিয়ে আছে তাদের নিয়ে এক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গিকার করা হয়েছে।
বক্তারা বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে পাইওনিয়ার হতে চাই আমরা। এক প্রশ্নের জবাবে জেনিফার ওয়েবস্টার বলেন, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেনসহ দু’-একটি উন্নতদেশ ছাড়া সকল দেশের সমস্যা প্রায় একই রকম। তাই একই ইস্যুতে দেশগুলো কাজ করবে। এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তরে উন্নয়ন অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করা হবে।
দশম কমনওয়েলথ নারী বিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশসহ অংশগ্রহণকারী নারী উদ্যোক্তাদের বিশাল সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছে অংশগ্রহণকারী নেতৃবৃন্দ। ফলে নারী নেতৃত্ব লক্ষ্যে আয়োজিত এই সম্মেলন সফল বলেও তারা উল্লেখ করেন। গত ১৭ জুন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সম্মেলন উদ্বোধন করেন। কমনওয়েলথভুক্ত ৫৪টি দেশের মধ্যে ২৭টি দেশ এ সম্মেলনে অংশ নেয়।
দশম কমনওয়েলথ নারী বিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বিশাল সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছে অংশগ্রহণ কারী নেতৃবৃন্দ। বক্তারা এ অঞ্চেলের নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য বাজারজাতকরণের জন্য কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুযোগের কথা বর্ণনা করেন। এতে বিশ্ববাজারে পণ্য বাজারজাতকরণের সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে নেতৃত্ব দেয়ার দক্ষতা গড়ে উঠবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন। ফ্রিডা মিরিক্লিস পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটিশ নারী নেতৃত্বে কথা উল্লেখ করে বলেন, নারীরা অনেক এগিয়ে গেছে। এ সম্মেলনে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে তা আমরা কাজে লাগিয়ে আরও এগিয়ে যাবো। নারীরা জাতিসংঘের সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) পূরণের দিকে এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়টিকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ফলে অর্থনৈতিক ভাবে অনেক ক্ষতি হয়েছে। এই দিকে যত্নশীল হলে অনেক এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ কমনওয়েল পৃষ্ঠপোষকতা করবে। নারীর সম-অধিকার নিশ্চিত করতে দেশের ভেতরে ও বাইরে সর্বত্র সবাইকে সোচ্চার হওয়ার জন্য কমনওয়েলথ দেশগুলোর আহবান জানান ভিক্টোরিয়া হোল্ডসওয়ার্থ।
বক্তারা বলেন বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও ক্ষুদ্র শিল্পে নারীর ক্ষমতায়ন সারা বিশ্বে নতুন দৃষ্টান্তের সূচনা করেছে। এবং এই ক্ষমতায়ন বিশ্বে জনগণের জন্য একটি নতুন অভিজ্ঞতা বলে উল্লেখ করা হয় এই সম্মেলনে।
কমনওয়েলথ সেক্রেটারি জেনারেল কমলেশ শর্মা নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করে বলেন, নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সকলকে কাজ করতে হবে। এই সম্মেলনের মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। এবং নতুন কর্মপরিকল্পনার গ্রহণ ও সে লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে আহবান করেন তিনি। তিনি নারী নেতৃত্বে গণমাধ্যমের ভূমিকা উল্লেখ করেন।
মূল সম্মেলনের আগে ১৫ জুন কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর স্পীকার এবং নারী সাংসদদেরকে নিয়ে বসে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন বিষয়ক কর্মশালা। এই কর্মশালায় বক্তারা বলেন, ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে নারীদের যোগ্যতা বাড়াতে হবে। কমনওয়েলথ উইমেন্স পার্লামেন্টারিয়ানস-এর চেয়ারপারসন এবং ডমেনিকা সংসদের স্পিকার এলেক্স বয়েড নাইটস ওই কর্মশালার সভাপতিত্ব করেন।
পশ্চিম আফ্রিকার অনেক দেশে এখনও নারীরা ঘর-গৃহস্থালির কাজকে নারীর ক্ষমতায়নের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। এই এলাকায় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান আছে বলে জানান হয়। সেনেগাল, সিয়েরালিওয়ন প্রভৃতি এলাকায় নারীরা একটু এগিয়ে এলেও সমস্যা অছে। সেসকল সমস্যা দূর করতে পুরুষকেই পুরুষের মানসিকতা পরিবর্তনের শিক্ষা দিতে হবে বলে মনে করে এলাকার সুশীল সমাজ। তিনি উল্লেখ, করেন পশ্চিম আফ্রিকার এই এলাকায় প্রান্তিক নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সরকারকে নারীদের উত্সাহিত করতে হবে।
নারীদের সমান অংশগ্রহণ নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পূর্বশর্ত বলে মনে করেন রেবেকা কাডাগা। তার দেশের নারীদের মাতৃত্বকালীন মৃত্যু, দারিদ্র্য, এইচআইভি সংক্রমণ প্রভৃতির কথা বর্ণনা করেন তিনি। সাগুফতা ইয়াসমিন বলেন, এদেশে সরকার ও বিরোধীদলীয় নেতৃত্বে দীর্ঘদিন যাবত্ নারীর নিয়ন্ত্রণে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নারী এবং সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন ও স্থানীয় পর্যায়ে নারী প্রতিনিধিদের অবস্থান আছে। নারীরা সরাসরি ও সংরক্ষিত আসনের জন্য নির্বাচন করতে পারে। বাংলাদেশ সরকার রাজনীতিতে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ করার লক্ষ্যে কাজ করছে।
