বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রে প্রায় ১২ ঘণ্টা গ্যাস উত্তোলন বন্ধ থাকায় গতকাল রবিবার আকস্মিক গ্যাস বিপর্যয়ে পড়ে সারাদেশ। গ্যাস ক্ষেত্রের গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় দুটি পাইপের জোড়া বা সংযোগ স্থানে (গ্যাসকেট) ছিদ্র দেখা দিলে কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে গ্যাস উত্তোলন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। বিবিয়ানা ক্ষেত্র থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। গ্যাস না থাকায় বিঘ্নিত হয় বিদ্যুত্ উত্পাদন। বন্ধ থাকে সারসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানা। সিএনজি স্টেশন বন্ধ থাকায় রাস্তায় গণপরিবহনের সংখ্যাও ছিল অন্যান্য দিনের তুলনায় কম। গ্যাস স্বল্পতায় চুলা জ্বলেনি রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতে। প্রচণ্ড গরমে গ্যাস ও বিদ্যুত্ সংকটে অসহনীয় দুর্ভোগে পড়ে রাজধানীবাসী। সকালে শুরু হওয়া ভোগান্তি বিকালের দিকে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। সূত্রমতে, গত শনিবার সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে বিবিয়ানা গ্যাস ক্ষেত্রের গ্যাস উত্পাদনের পর প্রক্রিয়াকরণ এলাকার মধ্যে দুই পাইপের সংযোগ স্থানে একটি ছিদ্র দেখা যায়। ছিদ্র দিয়ে গ্যাস বের হচ্ছিল। যেকোন মুহূর্তে এই গ্যাস থেকে বড় বিপদ হওয়ার আশঙ্কায় ক্ষেত্রটি থেকে গ্যাস উত্পাদন বন্ধ করে দেয়া হয়।
বিবিয়ানা থেকে গ্যাস উত্পাদনকারী আমেরিকান কোম্পানি শেভরন কর্তৃপক্ষ ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, বিবিয়ানা গ্যাস ক্ষেত্রের গ্যাস প্রসেস প্লান্টের ভেতর একটি ‘গ্যাসকেট’-এ ছিদ্র দেখা দিলে তা দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ ছিদ্র মেরামতের জন্য উত্তোলন পুরো বন্ধ করতে হয়। শেভরন নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সেজন্য ক্ষেত্রটি বন্ধ করতে হয়েছে। বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন হয় তার অর্ধেকই উত্তোলন করে শেভরন।
বিবিয়ানা ক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন গড়ে ৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্পাদন করা হয়। ক্ষেত্রটি বন্ধ হওয়ার আগেও ৭৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্পাদন হচ্ছিল। যা দেশে মোট সরবরাহের ৪০ শতাংশেরও বেশি। দেশে বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ২২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হোসেন মনসুর গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় দুর্ভোগের জন্য জনসাধারণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, একটি বড় সমস্যা তৈরি হওয়ার কারণে ক্ষেত্রটি বন্ধ করতে হয়েছিল। তিনি ইত্তেফাককে জানান, হঠাত্ এমন ঘটনা কেন হলো তা আরো পরীক্ষা করে দেখার উদ্যোগ নেয়া হবে। তবে যান্ত্রিক ত্রুটি যেকোন সময় হতেই পারে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই ইলাহী চৌধুরী বীর বিক্রম প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেন, বিবিয়ানার সমস্যা দ্রুততার সাথে মেরামত করা হয়েছে। সেখানে আর কোন সমস্যা নেই। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। শূন্য হয়ে যাওয়া পাইপ লাইনে পুরো মাত্রায় গ্যাসের চাপ আসতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লেগে যেতে পারে।
গ্যাসনির্ভর বেশিরভাগ শিল্প কারখানা গতকাল সকাল থেকে বন্ধ ছিল। গ্যাসের অভাবে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কম উত্পাদন হয়েছে। আশুগঞ্জ, রাউজানসহ অনেক বিদ্যুত্ কেন্দ্রে উত্পাদন কমিয়ে দেয়া হয়। সিএনজি স্টেশন বন্ধ থাকায় সিএনজি চালিত বাস চলেনি। ফলে সাধারণ মানুষের দীর্ঘসময় বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে।
গ্যাস সংকটে বন্ধ হয়ে যায় যমুনা সার কারখানা। এ কারখানায় প্রতিদিন চার কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও তিন কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। গতকাল সকাল থেকে এই গ্যাসও সরবরাহ করা যায়নি। ফলে বন্ধ করতে হয় সার উত্পাদন।
এদিকে একটি ক্ষেত্রের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় দেশের এই অচল অবস্থার বিষয়ে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, এই ধরনের বড় গ্যাস ক্ষেত্রে একক একটি বড় প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র না করে ইউনিটভিত্তিক কয়েকটি করলে এই সমস্যা হতো না। তিনি বলেন, তিতাস এবং বিবিয়ানা—দুটিই দেশের বড় ক্ষেত্র। এগুলোর একটি বন্ধ হলেই এমন পরিস্থিতি হবেই। তিনি বলেন, বিকল্প ক্ষেত্র না থাকায় সমস্যা আরো প্রকট হয়েছে। এজন্য গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর সরকারকে জোর দিতে হবে।
তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ বিদ্যুত্ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, একটি ক্ষেত্রের ওপর নির্ভরশীল থাকলে দেশের পরিস্থিতি নাজুক হতেই পারে। যেসব ক্ষেত্রে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে সেগুলোতে দ্রুত অনুসন্ধান কাজ শুরু করতে হবে। এজন্য যে টাকার প্রয়োজন সেক্ষেত্রেও বরাদ্দ দ্রুত দেয়া দরকার। সংকট থেকে উত্তোরণের জন্য সরকারকে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। নয়তো জ্বালানি খাতের সুদূরপ্রসারী ফলাফল ভাল হবে না।
আগুন ৩০-৫০ ফুট উঁচুতে উঠানামা করতে থাকে
নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) সংবাদদাতা সাইফুল জাহান চৌধুরী জানান, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের একটি পাইপলাইন-এর গাসকেট ছিদ্র হয়ে ফেটে যাওয়ায় এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। গ্যাসক্ষেত্রের দক্ষিণ প্যাড এলাকায় প্লেয়ার পাইপের মুখে আগুনের শিখা প্রায় ৩০-৫০ ফুট উঁচুতে ওঠানামা করতে থাকে। শনিবার সন্ধ্যা ৬ টা ৪০ মিনিটে হঠাত্ করে বিবিয়ানার সাউথ ও নর্থ প্যাডে সকল সিগন্যাল লাইট বন্ধ হয়ে যায়।
বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রে কর্মরত এক কর্মকর্তা বলেন, বিবিয়ানার দক্ষিণ প্যাডের একটি সেফটি পাইপ লিকেজ হওয়ার কারণে এমন হয়েছে। যদি পাইপ লাইন ফেটে যেতো তা হলে মাগুরছড়ার মতো দুর্ঘটনার আশংকা ছিল। জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, বিকাল নাগাদ সব এলাকায় গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হয়েছে।
শেভরনের মিডিয়া (ইনচার্জ) এক্সটার্নেল এ্যাফারয়ার্স বদরুদ্দোজ্জা বদর বলেন, বিষয়টি এখন স্বাভাবিক রয়েছে। শনিবার সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে পাইপলাইন-এর গ্যাসকেট ছিদ্র হয়ে ফেটে যাওয়ার ফলে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। রবিবার সকাল ৬ টা ১৫ মিনিটে আবার র্কাযক্রম স্বাভাবিক হয়।
চট্টগ্রামে সারাদিন গ্যাস সংকট
চট্টগ্রাম অফিস থেকে নিজাম উদ্দিন জানান, গ্যাস সংকটে চট্টগ্রামে শিল্প-কারখানা, বাণিজ্য ও আবাসিক গ্রাহকদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানি জানায়, গতকাল ভোর থেকে চট্টগ্রামে প্রধান সরবরাহ লাইনে গ্যাসের চাপ কমে যায়। ফলে বিদ্যুত্ কেন্দ্র ও শিল্প কারখানা চরম গ্যাস সংকটে পড়ে। চট্টগ্রামে ৬৩টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সবকটিইতেই গ্যাস বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস পাওয়া যায়নি। রাউজান বিদ্যুত্ কেন্দ্র সূত্র জানায়, শনিবার রাত ২টা থেকে গ্যাস সংকটের কবলে পড়ে দু’টি ইউনিটে উত্পাদন বন্ধ হয়ে যায়। এই দু’টি ইউনিটের উত্পাদন ক্ষমতা দৈনিক ১৮০ মেগাওয়াট। ফলে গতকাল সারাদিন চট্টগ্রামে ঘন্টার পর ঘন্টা লোডশেডিং করতে হয়েছে।
এদিকে শিল্প-কারখানা ও হোটেল-রেস্তোঁরাগুলো ও গ্যাস সংকটে পড়ে। শিল্প-কারখানায় উত্পাদন ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে রি-রোলিং মিল, লবণ ফ্যাক্টরি, গার্মেন্টস, বিদ্যুত্ কেন্দ্রসহ গ্যাসনির্ভর শিল্প কারখানায় উত্পাদনে ধস নেমেছে। এছাড়া নগরীর কিছু কিছু আবাসিক গ্রাহকরাও গ্যাস সংকটে পড়েছে বলে জানা যায়।
এ প্রসঙ্গে কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানির জিএম (অপারেশন) প্রকৌশলী শহীদ আলী ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ডে সংকটের কারণে চট্টগ্রামের গ্যাসের প্রেসার কমে গেছে। বিকাল ৩টার পর গ্যাস সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছে।’
আশুগঞ্জ বিদ্যুত্ কেন্দ্রের উত্পাদনে বিপর্যয়
আশুগঞ্জ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) সংবাদদাতা সেলিম পারভেজ জানান, শনিবার সন্ধ্যায় আশুগঞ্জ বিদ্যুত্ কেন্দ্রের চালু ৫টি ইউনিট ও কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট ৩টিসহ মোট ৮টি ইউনিটে গ্যাসের চাপ অর্ধেকে নেমে আসে। ফলে আশুগঞ্জ বিদ্যুত্ কেন্দ্রের ৫টি ইউনিটের উত্পাদন ৫৪০ মেগাওয়াটের স্থলে ৩৯০ মেগাওয়াটে ও কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্টের ৩টি ইউনিটের উত্পাদন ১৮৮ মেগাওয়াটের স্থলে ৯৩ মেগাওয়াটে নেমে আসে। এই ৮টি ইউনিটে উত্পাদন হ্রাস পায় ২৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুত্।
গ্যাস সংকটের কারণে আশুগঞ্জ বিদ্যুত্ কেন্দ্রের চালু ৮টি ইউনিটে উত্পাদন হ্রাস পেয়েছে ২৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুত্। ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ আশপাশের জেলাগুলোতে বিদ্যুতের ব্যাপক লোডশেডিং হয়। ভ্যাপসা গরমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জনজীবন।
