গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম নিখোঁজ হবার ৫ দিন পর রবিবার বিকালে প্রকাশ্য জনসমক্ষে হাজির হয়েছেন। তিনি নগরীর জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খানের সমর্থনে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে দাঁড়িয়ে তার প্রতি নিজের সমর্থন ঘোষণা করে ভোট চাইলেন। তিনি বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা আমার মায়ের মতো। তার প্রতি শ্রদ্ধা-আস্থা ও বিশ্বাস রেখে এবং আমার মায়ের জন্য দোয়া চেয়ে আমি নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়িয়েছি এবং আমার দল সমর্থিত প্রার্থী আমার বড় ভাই আজমত উল্লা খানকে সমর্থন দিয়েছি।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও আজমত উল্লা খানের নির্বাচনের প্রধান সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট আকম মোজাম্মেল হক এমপি, নির্বাচনের সদস্য সচিব জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খান বক্তব্য রাখেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক সাবেক এমপি আখতারুজ্জামান, আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক শামীম, লিয়াকত সিকদার, যুবায়েদুল হক রাসেল, ইকবাল হোসেন সবুজ, ওয়াজ উদ্দীন মিয়া, আতাউল্লা মন্ডল, আ. মান্নান পাঠান, নূরুল আমীন, আমানত হোসেন খান প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার এক পর্যায়ে জাহাঙ্গীর আলম কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি বলেন, আমি মেয়র নির্বাচিত হলে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনকে একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত নগর হিসাবে গড়ে তোলার জন্য আমার যে নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল, তা বাস্তবায়নের জন্য ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থীকে অনুরোধ জানাই। তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। তিনি বলেন, আমি ও আমার মা অসুস্থ, এ কারণে আমি বিগত কয়েকদিন জনসমক্ষে আসতে পারিনি। তিনি বলেন, আমি স্বেচ্ছায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে দলের স্বার্থে আমি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারো চাপে নয়। কেউ যাতে আমাকে ভুল না বুঝেন, সকল নেতাকর্মী দলমত নির্বিশেষে কেউ যাতে সমালোচনা না করেন এজন্য তিনি সবাইকে অনুরোধ করেন। প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে গাজীপুরবাসীর চাওয়া-পাওয়া পূরণ হবে, নগরবাসীর ভাগ্যের পরিবর্তন হবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি সকল দলীয় নেতাকর্মীকে ঐক্যবদ্ধভাবে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার আহবান জানান।
আকম মোজাম্মেল হক এমপি বলেন, গাজীপুরের মাটি বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দিন আহমদের আদর্শের ঘাঁটি। দলের স্বার্থে জাহাঙ্গীর আলম নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, দলের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন, এজন্য আওয়ামী লীগ পরিবারের সকলের পক্ষ থেকে আমি ধন্যবাদ জানাই। আজমত উল্লা খান বলেন, জাহাঙ্গীর আলম দলের স্বার্থে যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, আমি নির্বাচিত হলে জাহাঙ্গীর আলম নির্বাচনে যে অঙ্গীকার করেছিলেন আমি তাকে সাথে নিয়ে সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য সচেষ্ট থাকব। তিনি একসাথে মিলেমিশে কাজ করার জন্য সকলের সহযোগিতা ও দোয়াত-কলম প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করেন।
জাহাঙ্গীর আলম গত ১৮ জুন রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে আনারস প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে টঙ্গী এলাকায় প্রচারণাকালে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার জন্য ঢাকা যান। তারপর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব গণমাধ্যমকে জানান, জাহাঙ্গীর আলম ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী আজমত উল্লা খানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তারপর থেকে গত ৫ দিন জাহাঙ্গীর এক রকম নিখোঁজ ছিলেন। গতকাল রবিবার দুপুরে তিনি রাজধানীর এপোলো হাসপাতাল থেকে সরাসরি গাজীপুরের বাসন সড়ক এলাকার বাসায় আসেন। তার আগমনের খবর পেয়ে বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থক তার বাড়িতে ভিড় জমায়। সেখানে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সংবাদকর্মীরাও ছুটে যান। কিন্তু তিনি কারো সাথেই কথা বলেননি। এক পর্যায়ে তার কর্মী-সমর্থকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে এসে জাহাঙ্গীরের আনারস প্রতীকের পক্ষে মিছিলসহ শ্লোগান দিতে থাকে এবং লিফলেট বিতরণ করে।
পরে বিকালে তিনি জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে যোগদেন। সংবাদ সম্মেলনে আসার পথে গাজীপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনের রাস্তায় জাহাঙ্গীরকে বহনকারী গাড়ীর সামনে বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ রাস্তায় শুয়ে পড়ে নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ানোর দাবি জানিয়ে শ্লোগান দেয়। দলীয় নেতাকর্মীরা তাদের রাস্তা ছাড়ার অনুরোধ জানালেও তারা শুয়ে থেকে প্রতিবাদ জানায়। এক পর্যায়ে মোজাম্মেল হক এমপি ও জাহিদ আহসান রাসেল এমপিসহ দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ গিয়ে রাস্তায় শুয়ে থাকা কর্মী-সমর্থকদের বুঝিয়ে জাহাঙ্গীর আলমকে দলীয় কার্যালয়ে নিয়ে আসেন।
