এমটিভি কোক স্টুডিও হলো সময়োপযোগী ধোঁকাবাজি

আপডেট : ২৫ জুন ২০১৩, ২০:৪১
সুভায়ু সেন মজুমদার। উপমহাদেশের প্রখ্যাত এসরাজ বাদক হিসেবে তিনি এক নামেই পরিচিত শিল্পীদের কাছে। পাশাপাশি সংগীত পরিচালনায় কাজ করছেন নিয়মিত। তামিল, তেলেগু, হিন্দি ও টলিউডের একাধিক চলচ্চিত্রে তিনি সংগীত পরিচালনা করেছেন। কাজ করেছেন এমটিভি কোক স্টুডিও ও আনপ্লাগড শো’তে। বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত বেশ ক’বছর। সম্প্রতি বাংলাদেশের বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী লিলি ইসলামের ‘উত্তরায়ন’ নামের সংগঠনের বার্ষিক অনুষ্ঠানে ঢাকায় পারফর্ম করে গেলেন। সেই সফরের অবসরে ঢাকার সেলিব্রিটি সাউন্ডল্যাব স্টুডিওতে বসে বর্তমান বাংলা গান ও এ প্রজন্মের সংগীত চর্চা নিয়ে কথা বললেন বিনোদন প্রতিদিন-এর সাথে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন তানভীর তারেক কলকাতায় এখনকার বাংলা মিউজিকের হাওয়াটা কোনদিকে বইছে? ঠিক কোনদিকে যে বইছে, তা বোঝা মুশকিল। আমি নিজেও বলতে পারব না। তবে একটা বড় ধরনের চেঞ্জ হচ্ছে। বড় মন্দা খবর হলো কলকাতার অন্যতম সিডি বিক্রির চেইনশপ মিউজিক ওয়ার্ল্ড বন্ধ হয়ে গেছে। সিডি প্রযুক্তির এই বিদায় লগ্নে তাই সকলেই একটু অন্যরকম ভাবে ভাবছে। তবে কি সেখানেও আমাদের দেশের মতো লুপ বেজড মিউজিক শুরু হয়েছে? অ্যাকুস্টিক বাদ্যবাজনা কমে গেছে? বা ফ্রি ডাউনলোড কালচার? না ঠিক তা নয়। দেখুন। প্যাটার্নটা তো চেঞ্জ হবেই। এটা সময়ের দাবি। তবে মিউজিকের ধারা বদলেছে। আজ উষা দি (উষা উথুপ)’র যে স্টুডিওটি ছিল, সেটিও ছোট হয়ে অর্ধেক হয়ে গেছে। সেখানে আর অর্কেস্ট্রার সুযোগ নেই, বা প্রচলনও নেই। এ ছাড়া আমি নিজেও স্টুডিও ওয়ার্ক কমিয়ে দিয়েছি। নিজেই শান্তিনিকেতনে আমার রুমে একটি নুইন্ডো সেটআপ করে নিয়েছি। কেউ বাজাতে চাইলে মেইল-এ ওয়েভ পাঠিয়ে দেয়। আমি বাজিয়ে, স্কাইপিতে তাকে বুঝিয়ে আবার ফিরতি মেইল করে দিই। এখন এইসব ভাবনা তো দশ বছর আগে আমি নিজেও ভেবে রাখিনি যে এগুলো আমায় করতে হবে। কিন্তু এতে কোয়ালিটির নিশ্চয়ই কোনো হেরফের হচ্ছে না, বা পূর্ব প্রজন্ম গালমন্দ করছে না যে, এই প্রজন্ম রসাতলে গেল! এই তর্ক যুগে যুগে চলবেই। এই ব্যাপারটাই আপেক্ষিক। কেউ কেউ মনে করছেন ভালো হচ্ছে না। কেউ মনে করছেন এটা আগের থেকেও বেস্ট। আর খরচটাও তো একটা বড় বিষয়। দেখুন মাত্র কিছুদিন আগে আমার কম্পোজিশনে গাইলেন পাকিস্তানের প্রখ্যাত গায়ক শাফকাত। তাকে কলকাতায় আসার অনুরোধ করলাম। উনি নিজেই একটা বিকল্প পথ আমায় বোঝালেন। শাফকাত আমায় কম বাজেটে একটা অফার করে বললেন মিউজিক ওয়েভটা পাঠিয়ে দাও ই-মেইলে। আমি গেয়ে দিচ্ছি। এরপর আমি তাকে মিউজিকটা পাঠিয়ে দিলে তিনি স্কাইপিতে গাইবার প্যাটার্ন বুঝে নিলেন। পরদিন আমার গান আমি পেয়ে গেলাম। এখন ভাবুন তাকে যদি আমি প্লেনভাড়া, থাকা খাওয়া দিতে হতো তো কত খরচ বেড়ে যেত। এখন তো আমাদের ওখানে সনু নিগম আমেরিকা থেকে ভয়েস দিচ্ছে সব ফিল্ম মিউজিকের। কই দর্শক কি কোয়ালিটি কম পাচ্ছে? আমি নিজেও কয়েকটি হিন্দি মুভির কাজ করলাম ঘরে বসে। তাহলে এখন কি অ্যাকুস্টিক মিউজিশিয়ানদের ওখানকার অবস্থাটা আগের মতো নেই? দেখুন। সবারই একটা রিটায়ারমেন্ট টাইম আসে। এটা মেনে নেওয়াটাই আধুনিকতা। সবাইকে সময়ের সাথে বদলাতে হয়। এই বদলটা যে যেভাবে করছে সে এগিয়ে থাকছে। আমি পিছিয়ে থাকতে চাই না। বাংলাদেশের গান সম্পর্কে ধারণা কেমন? খুবই উচ্চমানের ধারণা। আমি মনে করি বাংলা গানের সবচেয়ে বড় জায়গা বাংলাদেশে। আমি তো এখানে অসংখ্য শিল্পীর সাথে বাজিয়েছি। সিনিয়র কোনো শিল্পী নেই যে তার সাথে বাজাইনি। অনেকের গানেরও কম্পোজিশন করেছি। এখনকার কাজের প্ল্যান কী? ‘রয়েল ডেস্টিনি’ নামে আমরা ৯ জনের একটা দল গড়েছি। সেটা নিয়েই কাজ চলছে। এইচএমভি স্টুডিওতে আমরা ডিজিটালি মিউজিক আর্কাইভ তৈরির জন্য কাজ করছি দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তিতে। পাশাপাশি আমরা সবাই মিলে একটা ফিউশন বেজড কনসার্টেরও পরিকল্পনা নিয়েছি। অর্থাত্ শিল্পীদের জনপ্রিয় গানের সাথে আমাদের মিউজিকের একটা নতুন কম্পোজিশন করে তা ভিন্নভাবে পরিবেশন করার একটা আলাদা চেষ্টা। তবে আপনি কি এমটিভি আনপ্লাগড বা কোক স্টুডিওর কথা বলছেন? কিন্তু সেইভাবে নিঁখুত সাউন্ড ব্যালান্স করা তো অনেক কঠিন কাজ। কীভাবে করবেন? কোন কৌশলে? দেখুন যারা সাধারণ দর্শক তারা কিন্তু এমটিভি দেখে হতবাক হয়ে যাচ্ছে। আমি নিজেও কোক স্টুডিও ও আনপ্লাগডের কয়েকটা সেশনে বাজিয়েছি। আমাকে যেদিন অফার করে নিয়ে যাওয়া হলো। সেদিন গিয়ে দেখি একটি মাঝারি সাউজের রেকর্ডিং স্টুডিওতে নিয়ে গেলেন তারা আমাকে। আমি বললাম একি আমরা কি এখানে রিহার্সেল করে তবে শুটিং ফ্লোরে যাব। তারা বললেন, না এখানে আমরা রেকর্ড করে পুরোটা ফাইনাল করব। আমি তো হতবাক। অর্থাত্ পুরোটাই তাদের সাজানো নাটক। আগে রেকর্ড করে পরে সেখানে শুটিংয়ে শুধু অভিনয়। এমটিভি কোক স্টুডিও হলো সময়োপযোগী ধোঁকাবাজি। তবে এই সময়ে এই ধরনের ধোঁকাবাজির প্রয়োজন আছে। দেখুন মানুষ এখন নতুন কিছু পছন্দ করে। এই যে ‘বিগবস’ বা ‘রোডিজ’ নামে যা আমরা দেখছি। সবই তো অনেকটা সাজানো নাটক। তবুও তো দর্শকরা মোহের দৃষ্টিতে দেখছে। সময়ের বাতাসে পাল না উড়িয়ে থাকাটা তো বোকামি। তাই মুম্বাই এগিয়ে থাকছে। আগে কলকাতা যা আজ ভাবত সেই ভাবনা পরশু ভাবত মুম্বাই। কিন্তু এখন এটা মানতেই হবে যে বিষয়টি পুরো উল্টে গেছে। তবে কি আপনারাও সেই পন্থায় নতুনত্ব দিতে চেষ্টা করছেন? না। আমাদেরটা হবে লাইভ। তবে একই সাথে দর্শকদেরও অন্য এক জগতে নিয়ে যাব। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ এই উপমহাদেশের শিল্পীদের নিয়ে আমরা নিরীক্ষাধর্মী কাজ শুরু করে দিয়েছি। বিশ্বভারতীতে আছেন একজন সংগীতের শিক্ষক হিসেবে। সেখানে বাংলাদেশের অগণিত শিক্ষার্থী আছেন। তরুণ এই প্রজন্মের ভেতরে শেখার আগ্রহটা কেমন দেখছেন? প্রচণ্ড। আর এখন তো প্রযুক্তির সুবিধায় যে কেউ যে কোনো টিউটোরিয়াল দেখতে পারছে ইউটিউব বা অন্য কোনো ওয়েবসাইটে। ফলে খুব দ্রুত ওরা নিজেদের আপডেট রাখতে পারছে। আপনি বংশীয়ভাবে পূর্ব প্রজন্মের সংগীতজ্ঞ পরিবারের। এমনকি রবীন্দ্রনাথের গানের সমকালীন কম্পোজার। এই পরিচয়ের চাপটা কতটা থাকে? চাপ ঠিক থাকে না। দেখুন পরিচয় বা ব্যাকগ্রাউন্ড প্রাথমিক সাপোর্ট দেয়। কিন্তু আমি স্টেজে বা রেকর্ডিংয়ে যদি খারাপ বাজাই। তখন তো পরিচয় দিয়ে কোনো লাভ নেই। উল্টো মুখ লুকোতে হতো। নিজের বাবা-দাদার নাম মুখেও আনতে পারতাম না। আমি অন্তত সেই সুযোগটা নিইনি। তবে হ্যাঁ। এটা ঠিক আমি যথেষ্ট চেষ্টা করি বাবা-দাদার সুনামকে অক্ষুণ্ন রাখতে। এখন এই চর্চাটা আমার ছেলে রাখবে কি না, সেটা কিন্তু আমি জানি না (স্মিত হেসে)। এ দেশে আপনার প্রিয় শিল্পী কে ? অনেকে। আলাদা করে নাম বলতে গেলে অনেকের নাম ভুলে যাব। পরে ওরা আবার আমাকে মারার জন্য তেড়ে আসতে পারে। তাই চুপ থাকাই শ্রেয় ভাবছি। (হা হা হা হা)